নীরব বিপ্লবের স্থপতি: শচীন্দ্রনাথ সান্যালের সংগ্রামী জীবনগাথা

সোমালিয়া ওয়েব নিউজঃ ভারতবর্ষের সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অথচ প্রচারবিমুখ নক্ষত্র হলেন শচীন্দ্রনাথ সান্যাল। ভগৎ সিং বা চন্দ্রশেখর আজাদের মতো বিপ্লবীদের তিনি ছিলেন রাজনৈতিক গুরু এবং পথপ্রদর্শক। তার জীবন ছিল এক ত্যাগের মহাকাব্য।

ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস কেবল সভা-সমাবেশ বা অহিংসার ইতিহাস নয়, বরং এর পরতে পরতে মিশে আছে এমন কিছু বিপ্লবীর নাম, যারা পর্দার আড়ালে থেকে তৈরি করেছিলেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত কাঁপানো এক সশস্ত্র বাহিনী। শচীন্দ্রনাথ সান্যাল ছিলেন সেই বিপ্লবের মূল কারিগর।

বিপ্লবের হাতেখড়ি ও অনুশীলন সমিতি

১৮৯৩ সালে  ৩ এপ্রিল বারাণসীতে জন্মগ্রহণ করেন শচীন্দ্রনাথ। তাঁর আদি নিবাস ছিল পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলায়। অর্থাৎ তাঁর পারিবারিক শিকড় বাংলার হুগলিতে প্রোথিত। কিশোর বয়সেই তার হৃদয়ে দেশপ্রেমের আগুন জ্বলে ওঠে। ১৯০৮ সালে তিনি বারাণসীতে ‘অনুশীলন সমিতি’-র শাখা প্রতিষ্ঠা করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি রাসবিহারী বসুর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোগী হয়ে ওঠেন।

১৯১৫-র সশস্ত্র অভ্যুত্থান পরিকল্পনা

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় রাসবিহারী বসু এবং শচীন্দ্রনাথ সান্যাল সারা ভারত জুড়ে একযোগে ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করেছিলেন। যদিও বিশ্বাসঘাতকতার কারণে সেই পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়, তবুও শচীন্দ্রনাথ দমে যাননি। গদর পার্টির সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে তিনি উত্তর ভারতে বৈপ্লবিক কার্যক্রমকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান।

HRA-র প্রতিষ্ঠা ও উত্তরসূরি সৃষ্টি

শচীন্দ্রনাথ সান্যালের সবথেকে বড় অবদান হলো ‘হিন্দুস্তান রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন’ (HRA) প্রতিষ্ঠা। ১৯২৪ সালে তিনি এই সংগঠনটি তৈরি করেন। তার লেখা ইশতেহার ‘দ্য রিভোলিউশনারি’ ব্রিটিশ সরকারের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল।

  • শিক্ষক ও মেন্টর: তিনি কেবল সংগঠনের প্রধান ছিলেন না, তিনি ছিলেন ভগৎ সিং, চন্দ্রশেখর আজাদ এবং রামপ্রসাদ বিসমিলের মতো বিপ্লবীদের আদর্শিক শিক্ষক।
  • সশস্ত্র বিপ্লবের মগজ: কাকোরি ট্রেন ডাকাতি থেকে শুরু করে লালা লাজপত রায়ের মৃত্যুর বদলা—প্রতিটি বড় পদক্ষেপের মূলে ছিল তার দেওয়া রাজনৈতিক শিক্ষা।

অমানবিক কারাদণ্ড ও ‘বন্দী জীবন’

শচীন্দ্রনাথ সান্যালই ছিলেন একমাত্র বিপ্লবী যাকে ব্রিটিশ সরকার দুইবার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড (কালোপানি) দিয়েছিল। আন্দামানের সেলুলার জেলে বন্দি থাকা অবস্থায় তিনি যে অবর্ণনীয় কষ্টের মুখোমুখি হয়েছিলেন, তা লিখে রেখে গেছেন তার অমর সৃষ্টি ‘বন্দী জীবন’ বইটিতে।

“বন্দী জীবন কেবল একটি বই নয়, এটি ছিল তৎকালীন বিপ্লবীদের কাছে সংগ্রামের গীতা।”

শেষ দিন ও উত্তরাধিকার

দীর্ঘ কারাবাস এবং ব্রিটিশদের অমানুষিক অত্যাচারে তার শরীর ভেঙে পড়েছিল। ১৯৪২ সালে যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয়ে ভারতের এই মহাবিপ্লবী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

আজকের স্বাধীন ভারতে শচীন্দ্রনাথ সান্যাল হয়তো পাঠ্যবইয়ের পাতায় খুব বেশি পরিচিত নাম নন, কিন্তু ভারতীয় বিপ্লবের ইতিহাসে তিনি চিরকাল ‘বিপ্লবীদের কারিগর’ হিসেবেই অমর হয়ে থাকবেন। তার জীবন আমাদের শেখায় যে, বিপ্লব কেবল হুজুগ নয়, বরং তা এক গভীর সাধনা ও ত্যাগের নিরবচ্ছিন্ন পথ।

Loading