সোমালিয়া ওয়েব নিউজ: জীবনের সব গল্প জয়ের গল্প নয়। কিছু গল্প আছে যেখানে হার, অপমান, অনিশ্চয়তা আর দীর্ঘ প্রতীক্ষা মিলেমিশে একদিন নতুন অধ্যায়ের জন্ম দেয়। প্রাক্তন আইপিএস অফিসার দেবাশীষ ধরের জীবনকাহিনী যেন ঠিক তেমনই এক অধ্যায়। ২০২১ সালের শীতলকুচি ঘটনার পর পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে যখন উত্তেজনা চরমে, তখন সবচেয়ে বড় ধাক্কাগুলির একটি নেমে আসে দেবাশীষ ধরের জীবনে। অভিযোগ ওঠে, প্রশ্ন ওঠে, বিতর্ক শুরু হয়। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম যে প্রশাসনিক পদক্ষেপগুলির একটি নেন, তার মধ্যে ছিল দেবাশীষ ধরের সাসপেনশন অর্ডারে স্বাক্ষর। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার সেই সাসপেনশন অনুমোদন করেনি। ফলে আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতার মধ্যে ঝুলে যায় তাঁর কর্মজীবন। শেষপর্যন্ত সাসপেনশন কার্যকর না হলেও কার্যত তাঁকে “কম্পালসারি ওয়েটিং”-এ রাখা হয়। সাসপেনশন কার্যকর না হলেও প্রশাসনিকভাবে তাঁকে “কম্পালসারি ওয়েটিং”-এ রাখা হয়। সাধারণ নিয়মে এই অবস্থায় নির্দিষ্ট ভাতা (Allowance) চালু হওয়ার কথা থাকলেও,কোনও এক অদৃশ্য কারণে সেই প্রক্রিয়াও বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে তাঁর পরিস্থিতি এমন হয়ে দাঁড়ায় যে, “হাতে কোনও কাজ নেই, অথচ পকেটেও তেমন টাকা নেই”।একদিকে কর্মজীবনের অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে আর্থিক সংকট—দুইয়ের চাপে দীর্ঘ সময় ধরে মানসিক লড়াই চালিয়ে যেতে হয়েছে তাঁকে। একজন কর্মক্ষম ও দায়িত্বশীল পুলিশ আধিকারিকের কাছে এই সময়টা ছিল অত্যন্ত কঠিন এবং যন্ত্রণাময়। প্রশাসনের সক্রিয় দায়িত্ব থেকে দূরে সরে গিয়ে তিনি যেন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের অপেক্ষায় দিন গুনছিলেন। নেই কোনও দায়িত্ব, নেই কোনও কাজ, নেই কোনও ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা। একজন কর্মঠ পুলিশ অফিসারের কাছে এর চেয়ে বড় মানসিক যন্ত্রণা আর কী হতে পারে? ২০২১ থেকে ২০২৪—এই তিনটি বছর যেন এক দীর্ঘ নির্বাসন। কখনও হরিদ্বারের কোনও আশ্রমে, কখনও বেনারসের ঘাটে, কখনও আবার হৃষিকেশের নির্জনতায় কাটতে থাকে সময়। প্রশাসনের কোলাহল থেকে দূরে, ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে বহু দূরে, তিনি যেন খুঁজে বেড়িয়েছেন নিজের অস্তিত্বের অর্থ। যে মানুষ একসময় প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের অংশ ছিলেন, তিনি তখন শুধুই এক অপেক্ষমান মানুষ। অপেক্ষা—কোনও এক নতুন সূর্যোদয়ের। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন ঘোষণার পর হঠাৎই বদলে যায় দৃশ্যপট। একদিন দিল্লি থেকে ফোন আসে। প্রশ্ন ছিল সংক্ষিপ্ত—”বিজেপির টিকিটে নির্বাচন লড়তে চান?” ভাবার জন্য সময় দেওয়া হয়েছিল মাত্র আধঘণ্টা। সেই সময় তাঁর অবস্থা এমনই ছিল যে, না বলার সুযোগ ছিল না। কিন্তু সম্মতি দেওয়ার আগে এক নির্মম সত্যি জানিয়ে দিয়েছিলেন তিনি—”আমি ভোটে দাঁড়াতে পারি, কিন্তু আমার পকেটে একশো টাকাও নেই।” কথাগুলো শুধু আর্থিক অবস্থার বর্ণনা নয়; এগুলো ছিল একজন মানুষের জীবনের কঠিন বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। ভাগ্য আবারও পরীক্ষা নেয়। প্রয়োজনীয় একটি সরকারি নথি নির্দিষ্ট সময়ে জমা দিতে না পারায় তাঁর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়ে যায়। স্বপ্ন আবার থমকে দাঁড়ায়। আবার অপেক্ষা। আবার অনিশ্চয়তা। কিন্তু সব অপেক্ষারই একদিন শেষ হয়। ২০২৬ সালে বিধানসভা নির্বাচনে সোনারপুর উত্তর কেন্দ্র থেকে বিজেপির প্রার্থী হিসেবে সুযোগ পান দেবাশীষ ধর। এবার আর কোনও ভুল হয়নি। মানুষের সমর্থনে তিনি জয়ী হন এবং বিধায়ক হিসেবে নতুন জীবনের সূচনা করেন। তবে এই জয়ের মধ্যেও তাঁর কথায় ফুটে ওঠে এক ভিন্ন দর্শন। তিনি বলেছেন, ভবিষ্যতে যদি আবার প্রার্থী হন, তাহলে যেন বাড়ি বাড়ি গিয়ে হাতজোড় করে ভোট চাইতে না হয়। মানুষ যেন তাঁর কাজ দেখে, তাঁর কর্মদক্ষতা দেখে ভোট দেন। এই বক্তব্যে যেন ফুটে ওঠে এক প্রশাসনিক মানসিকতা—যেখানে প্রচারের চেয়ে কাজের গুরুত্ব বেশি। আইপিএস হওয়ার আগে তিনি তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। প্রযুক্তির প্রতি সেই আগ্রহ আজও অটুট। ওড়িশায় কর্মরত অবস্থায় প্রযুক্তিনির্ভর একাধিক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এখন তাঁর স্বপ্ন, রাজপুর-সোনারপুর অঞ্চলে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা, প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়নের মাধ্যমে এলাকাকে একটি আধুনিক “মাস্টার সিটি” হিসেবে গড়ে তোলা। আজ তাঁর সামনে নতুন দায়িত্ব, নতুন চ্যালেঞ্জ। পেছনে ফিরে তাকালে দেখা যায় এক দীর্ঘ পথ—অভিযোগ, সাসপেনশনের আশঙ্কা, প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা, আশ্রমে কাটানো নিঃসঙ্গ দিন, আর্থিক সংকট, বাতিল হওয়া মনোনয়ন এবং অবশেষে মানুষের রায়ে জয়। পরিবারের বড় কোনও রাজনৈতিক ঐতিহ্য নয়, ক্ষমতার কোনও উত্তরাধিকার নয়, বরং জীবনের কঠিনতম সময়ের সঙ্গে লড়াই করেই উঠে এসেছেন তিনি। দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া একজন মানুষের গল্প এটি। যে মানুষটি হার মানেননি। আজ তিনি বিধায়ক। আগামী দিনে তিনি কতটা সফল হবেন, তাঁর স্বপ্ন কতটা বাস্তব হবে, তা বলবে সময়। তবে এটুকু নিশ্চিত—দেবাশীষ ধরের জীবনের এই অধ্যায় প্রমাণ করে, প্রতিকূলতা কখনও কখনও মানুষকে ভেঙে দেয় না, বরং আরও শক্তিশালী করে তোলে।


![]()

More Stories
হরবোলা সুরের জাদুকর আর নেই, প্রয়াত পদ্মশ্রী মঙ্গলা কান্ত রায়
নবান্নে সেনসাস সম্মেলন: ১ আগস্ট থেকে জনগণনার সূচনা ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর
পশ্চিমবঙ্গে শুরু হতে চলেছে ‘হোয়াইট রেভলিউশন’, ৬৫০ কোটি টাকার মেগা বিনিয়োগ আমুলের