সোমালিয়া ওয়েব নিউজ: ভারতের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে “আপ্ত সহায়ক” শব্দটি শুধু একজন ব্যক্তিগত সহকারী বা অফিস কর্মচারীর পরিচয় নয়; বাস্তবে তাঁরা বহু সময় রাজনৈতিক নেতার ছায়াসঙ্গী, বিশ্বস্ত তথ্যবাহক, সাংগঠনিক সমন্বয়কারী, আর্থিক ও প্রশাসনিক যোগাযোগের মধ্যস্থতাকারী এবং অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক কৌশলেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠেন। ফলে কোনো জনপ্রতিনিধি—বিশেষত সাংসদ, বিধায়ক, মন্ত্রী বা বিরোধী নেতার উপর আক্রমণের পরিকল্পনা হলে বহু সময় সেই নেতার ঘনিষ্ঠ আপ্ত সহায়কেরাও হামলাকারীদের নিশানায় চলে আসেন। ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে দেখা গিয়েছে, বহু ক্ষেত্রে মূল নেতার পরিবর্তে তাঁর ব্যক্তিগত সচিব, নিরাপত্তারক্ষী, গাড়িচালক বা আপ্ত সহায়কই প্রথম হামলার শিকার হয়েছেন। গতকাল রাত্রে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর দীর্ঘদিনের আপ্ত সহায়ক চন্দ্রনাথ রথের হত্যাকাণ্ড। বিধানসভা নির্বাচনের অব্যবহিত পরে উত্তর ২৪ পরগনার মধ্যমগ্রাম এলাকায় খুব কাছ থেকে রাত্রি সাড়ে দশটার সময় তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। ঘটনাটি রাজনৈতিক মহলে তীব্র চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে এবং প্রশ্ন তোলে—ভারতে রাজনৈতিক নেতাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা কতটা নিরাপদ? ভারতীয় রাজনীতিতে এই ধরনের ঘটনা নতুন নয়। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই ভিআইপি নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে নতুনভাবে ভাবনা শুরু হয়েছিল। যদিও সেই ঘটনায় হামলাকারীরা ছিলেন তাঁর নিজের নিরাপত্তারক্ষী, তবুও পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের ঘনিষ্ঠ বলয়ের নিরাপত্তা নিয়ে বিশেষ নজর দেওয়া হয়। আবার প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী হত্যাকাণ্ডে আত্মঘাতী বিস্ফোরণে শুধু তিনিই নন, তাঁর সঙ্গে থাকা নিরাপত্তাকর্মী ও ঘনিষ্ঠ সহযোগীরাও প্রাণ হারান। এর ফলে পরিষ্কার হয়ে যায় যে রাজনৈতিক সহিংসতার লক্ষ্য অনেক সময় কেবল নেতা নন, তাঁর পুরো নিরাপত্তা ও সহায়ক বলয়। বিজেপির প্রভাবশালী নেতা দিলীপ ঘোষের ঘনিষ্ঠ সহকর্মী বা নিরাপত্তারক্ষীদের ঘিরেও অতীতে হামলার অভিযোগ সামনে এসেছে। উত্তরবঙ্গ ও কোচবিহারে রাজনৈতিক সংঘর্ষের আবহে বহুবার দলীয় সহযোগীদের নিশানা করার অভিযোগ উঠেছে। যদিও সব ক্ষেত্রেই “আপ্ত সহায়ক খুন” হিসেবে সরকারি ভাবে চিহ্নিত হয়নি, তবে রাজনৈতিকভাবে ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের ওপর আক্রমণের প্রবণতা স্পষ্ট হয়েছে। ২০০৬ সালের বহুল আলোচিত প্রমোদ মহাজন হত্যাকাণ্ডও এই প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। বিজেপি নেতা প্রমোদ মহাজন তাঁর ভাই প্রবীণ মহাজনের গুলিতে আহত হয়ে মারা যান। এই ঘটনার পরে তাঁর ব্যক্তিগত সচিব বিবেক মৈত্রর রহস্যজনক মৃত্যু দেশজুড়ে তীব্র জল্পনা তৈরি করেছিল। রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছিল—নেতাদের ব্যক্তিগত সহকারীরা কি এমন অনেক গোপন তথ্য জানেন, যা তাঁদেরও ঝুঁকির মুখে ফেলে? উত্তরপ্রদেশ ও বিহারের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই চিত্র আরও প্রকট। বাহুবলী রাজনীতি, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব ও অপরাধচক্রের সঙ্গে যুক্ত বহু ঘটনায় দেখা গিয়েছে যে নেতার গাড়িবহর, ব্যক্তিগত সহকারী বা নিরাপত্তারক্ষীরা হামলার প্রথম শিকার হন। রাজু পাল হত্যাকাণ্ডে বিধায়কের পাশাপাশি তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের ওপরও প্রাণঘাতী হামলা হয়েছিল। একইভাবে বিভিন্ন “জেড ক্যাটাগরি” নিরাপত্তাপ্রাপ্ত নেতার ক্ষেত্রেও দেখা যায়, মূল লক্ষ্য নেতাকে ঘিরে থাকা বিশ্বস্ত বলয়কে দুর্বল করা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আপ্ত সহায়কদের ওপর হামলার পিছনে সাধারণত কয়েকটি বড় কারণ কাজ করে। প্রথমত, রাজনৈতিক শত্রুতা—নেতার সবচেয়ে বিশ্বস্ত মানুষকে সরিয়ে দিয়ে তাঁকে সাংগঠনিক ও মানসিকভাবে দুর্বল করার চেষ্টা। দ্বিতীয়ত, তথ্য লোপাট—অনেক আপ্ত সহায়ক নেতার আর্থিক, প্রশাসনিক বা ব্যক্তিগত গোপন তথ্য জানেন; ফলে তাঁরা অপরাধচক্র বা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠতে পারেন। তৃতীয়ত, ভুলবশত লক্ষ্যবস্তু হওয়া—অনেক সময় নেতার গাড়িতে থাকা সহকারী বা ড্রাইভারই হামলায় নিহত হন। এছাড়াও নির্বাচনী হিংসা, স্থানীয় দখলদারি, তোলাবাজি, আর্থিক দ্বন্দ্ব এবং রাজনৈতিক মেরুকরণও এই ধরনের ঘটনার বড় কারণ। এই পরিস্থিতিতে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসছে—শুধু রাজনৈতিক নেতাদের নয়, তাঁদের আপ্ত সহায়কদেরও কি বিশেষ নিরাপত্তা দেওয়া উচিত? বর্তমানে ভারতে এসপিজি, জেড প্লাস, জেড, ওয়াই ও এক্স ক্যাটাগরির নিরাপত্তা মূলত জনপ্রতিনিধি বা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের জন্য নির্ধারিত। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, নেতার ঘনিষ্ঠ সহযোগীরাও সমান ঝুঁকির মুখে থাকেন। ফলে অনেকের মতে, গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের দীর্ঘদিনের আপ্ত সহায়ক, ব্যক্তিগত সচিব বা নিরাপত্তা সমন্বয়কারীদের জন্যও বিশেষ নিরাপত্তা প্রটোকল থাকা প্রয়োজন। তাঁদের জন্য বুলেটপ্রুফ গাড়ি, প্রশিক্ষিত নিরাপত্তারক্ষী, রুট স্যানিটাইজেশন, ডিজিটাল নজরদারি, জরুরি যোগাযোগ ব্যবস্থা, অস্ত্রধারী এসকর্ট, নিরাপদ আবাসন এবং গোয়েন্দা পর্যবেক্ষণের মতো ব্যবস্থাও বিবেচনা করা যেতে পারে। বিশেষত যাঁরা দীর্ঘদিন রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন, তাঁদের নিরাপত্তা কেবল ব্যক্তিগত বিষয় নয়; এটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক কাঠামোর সুরক্ষার সঙ্গেও জড়িত। ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, ক্ষমতার লড়াইয়ে শুধু নেতা নন, তাঁর সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযোগীরাও হয়ে উঠতে পারেন সহিংসতার শিকার। তাই ভবিষ্যতে রাজনৈতিক নিরাপত্তা নীতিতে আপ্ত সহায়কদের নিরাপত্তাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়ার দাবি আরও জোরালো হওয়াই স্বাভাবিক।
![]()

More Stories
দেশের সেবক থেকে রাজনৈতিক সহযোদ্ধা: গুলিতে থামল চন্দ্রনাথের পথচলা
মধ্যমগ্রামে গুলি, খুন শুভেন্দু অধিকারীর আপ্তসহায়ক—চাঞ্চল্য ছড়াল রাজ্যে
বিস্ব বাংলা কনভেনশন সেন্টারে বিজেপির নবনির্বাচিত বিধায়কদের সংবর্ধনা, উপস্থিত থাকবেন অমিত শাহ