অদেখা লড়াই থেকে দৃশ্যমান জয়: গোঘাটে বিজেপি মহিলা মোর্চার নীরব সংগ্রামের কাহিনি

সোমালিয়া ওয়েব নিউজ: পুরুষতান্ত্রিক সমাজে রাজনৈতিক লড়াইয়ের মঞ্চে প্রায়শই সামনে থাকে পুরুষদের মুখ, কিন্তু সেই মঞ্চের আড়ালে যে অগণিত নারীর নীরব সংগ্রাম, ত্যাগ আর সাহস লুকিয়ে থাকে—সেটি খুব কমই আলোচনায় আসে। পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক নির্বাচনী ফলাফলের পর আমরা পৌঁছে গিয়েছিলাম বিজেপির মহিলা মোর্চার কাছে, বিশেষ করে গোঘাটে জানতে—এই বড় জয়ের পেছনে তাঁদের ভূমিকা কতটা এবং কীভাবে তাঁরা ধীরে ধীরে সংগঠনকে শক্তিশালী করেছেন। সেখানে উঠে এসেছে একের পর এক বেদনাদায়ক, কিন্তু একইসঙ্গে অনুপ্রেরণাদায়ক অভিজ্ঞতার কথা। দিনের পর দিন চলেছে অত্যাচার, ঘরবাড়ি ভাঙচুর, কাজ করতে বাধা, এমনকি নিজের বাড়িতে ঢুকতেও বাধা—এই সব প্রতিকূলতার মধ্যেও থেমে থাকেননি এই মহিলারা। বিভিন্ন ভাতা বা সুবিধার প্রলোভনকে উপেক্ষা করে তাঁরা নিজেদের অবস্থানে অনড় থেকেছেন এবং এলাকার অন্য মহিলাদেরও সঙ্গে নিয়ে তাঁদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়েছেন। এই দীর্ঘ লড়াই শুধু রাজনৈতিক ছিল না—এটি ছিল সামাজিক ও মানসিক পরিবর্তনের এক গভীর প্রক্রিয়া। গোঘাট বিধানসভায় সংগঠন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে যাঁরা অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছেন তাঁদের মধ্যে রয়েছেন জেলা সম্পাদিকা দোলন দাস, বিস্তারক সুষমা বারিক, মহিলা মোর্চার সভাপতি অঞ্জলি ঘড়ুই, পঞ্চায়েত সদস্যা ও নেত্রী সোমাশ্রী বাগ, পঞ্চায়েত সমিতির সদস্যা কৃষ্ণা রায় এবং শক্তি কেন্দ্র ইনচার্জ মমতা ভূঁইয়া। প্রত্যেকেই বছরের পর বছর কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন, কিন্তু সংগঠন ছাড়েননি। সোমাশ্রী বাগ জানিয়েছেন, পঞ্চায়েত সদস্যা হয়েও তিনি কখনও পঞ্চায়েতের কাজে অংশ নিতে পারেননি; অন্যদিকে কৃষ্ণা রায়ের অভিজ্ঞতা আরও কষ্টদায়ক—পঞ্চায়েত সমিতির সদস্যা হয়েও অফিসে বসার ঘর তালাবদ্ধ করে রাখা হতো, দিনের পর দিন অবজ্ঞা আর অপমান সহ্য করতে হয়েছে। অঞ্জলি ঘড়ুই, যিনি অন্যের বাড়িতে কাজ করে সংসার চালাতেন, তিনিও বাধার মুখে পড়েছেন—কোথাও কাজ করতে দেওয়া হতো না, তবুও তিনি ভেঙে পড়েননি। তাঁর চোখে জল নিয়ে বলা কথাগুলো যেন এই সংগ্রামেরই প্রতিচ্ছবি—জয়ের খবর শুনেও তিনি আবির মাখেননি, শুধু কেঁদেছেন। এই সমস্ত অভিজ্ঞতা শুধু ব্যক্তিগত কষ্টের নয়, বরং একটি বৃহত্তর লড়াইয়ের অংশ। নিজের বাড়ির অর্থ খরচ করে, দিনরাত পরিশ্রম করে তাঁরা সংগঠন গড়ে তুলেছেন। বাড়ি বাড়ি গিয়ে জনসংযোগ করেছেন, মহিলাদের সঙ্গে কথা বলেছেন, তাঁদের বোঝানোর চেষ্টা করেছেন পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা। সুষমা বারিক জানান, নারীদের সুরক্ষার বিষয়ে দল যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তাতে তিনি আশাবাদী। অন্যদিকে কৃষ্ণা রায় বলেন, জয়ের আনন্দে তাঁরা যেন “ঘটি-হারা”—কারণ এখন এলাকার মহিলাদের প্রত্যাশা তাঁদের ওপর আরও বেড়ে গেছে। মমতা ভূঁইয়া জানান, এই জয়ের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন—আনন্দে নাচতে ইচ্ছে করছে। তবে এত কিছুর পরেও তাঁদের অবস্থান স্পষ্ট—প্রতিহিংসার রাজনীতি নয়, তাঁরা চান শান্তি, আইনশৃঙ্খলা, নারীদের নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, উন্নত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা। তাঁরা জানিয়েছেন, আগামী দিনেও সাধারণ মানুষের পাশে থাকবেন, বিশেষ করে এলাকার মহিলাদের সমস্যার কথা শুনে তা সমাধানের চেষ্টা করবেন। আমাদের এই প্রতিবেদন স্পষ্ট করে দেয়—গোঘাটের মাটিতে যে পরিবর্তনের গল্প লেখা হয়েছে, তা শুধুমাত্র রাজনৈতিক নয়; এটি নারীদের অদম্য সাহস, সহনশীলতা এবং নীরব সংগ্রামের এক জীবন্ত দলিল। এই জয় যতটা দৃশ্যমান, তার চেয়েও বেশি গভীর সেই অদেখা লড়াই, যা এই মহিলারা বছরের পর বছর ধরে লড়ে গেছেন।

Loading