দেশের সেবক থেকে রাজনৈতিক সহযোদ্ধা: গুলিতে থামল চন্দ্রনাথের পথচলা

সোমালিয়া ওয়েব নিউজ: চন্দ্রনাথ রথ— নামটা আজ শুধুই একটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের শিরোনাম নয়, বরং এক বিশ্বস্ত সহযোদ্ধা, এক শৃঙ্খলাবদ্ধ সৈনিক এবং এক নিবেদিতপ্রাণ মানুষের অসমাপ্ত জীবনের গল্প। পূর্ব মেদিনীপুরের চণ্ডীপুরের মাটি থেকেই তাঁর জীবনের শেকড় গাঁথা। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, শান্ত স্বভাবের এবং নিয়মানুবর্তী এক ছাত্র। এলাকার মানুষ স্মরণ করছেন সেই ভদ্র, মার্জিত ছেলেটিকে, যার চোখে ছিল বড় হওয়ার স্বপ্ন এবং দেশের জন্য কিছু করার এক অদম্য ইচ্ছা।

২০০০ সালে উত্তর ২৪ পরগনার ঐতিহ্যবাহী রহড়া রামকৃষ্ণ মিশন থেকে অত্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে মাধ্যমিক পাশ করেন চন্দ্রনাথ রথ। রহড়া মিশনের কঠোর শৃঙ্খলা, মানবিক শিক্ষা ও আদর্শ তাঁর চরিত্রকে গড়ে তুলেছিল দৃঢ় ভিতের উপর। সহপাঠী ও শিক্ষকদের কাছে তিনি ছিলেন নির্ভরযোগ্য, পরিশ্রমী এবং আত্মবিশ্বাসী এক ছাত্র। মিশনের শিক্ষা তাঁকে শুধু পড়াশোনায় নয়, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ও কর্তব্যবোধের মূল্য শিখিয়েছিল। সেই আদর্শই পরবর্তীকালে তাঁকে দেশের সেবায় আত্মনিয়োগ করতে উদ্বুদ্ধ করে। উচ্চশিক্ষা সম্পূর্ণ করার পর তিনি যোগ দেন ভারতীয় বায়ুসেনায়। শর্ট সার্ভিস কমিশনের অফিসার হিসেবে দেশের সুরক্ষার গুরুদায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন তিনি। সামরিক জীবনের কঠোর নিয়ম, কর্তব্যনিষ্ঠা এবং সময়ানুবর্তিতা তাঁকে আরও দৃঢ় ও পরিণত করে তোলে। সহকর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন একজন দক্ষ ও সৎ অফিসার। দেশের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল নিঃস্বার্থ। বহু বছর ভারতীয় বায়ুসেনায় কর্মরত থাকার পর তিনি অবসর নেন, কিন্তু সৈনিকসুলভ মানসিকতা কোনোদিন তাঁকে ছেড়ে যায়নি।

বায়ুসেনা থেকে ফিরে তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন রাজনীতির সঙ্গে। কিন্তু তিনি ছিলেন না প্রচারের আলোয় থাকা মানুষদের একজন। বরং পর্দার আড়ালে থেকে সংগঠনকে শক্তিশালী করাই ছিল তাঁর কাজ। শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল শুধু রাজনৈতিক নয়—তা ছিল বিশ্বাস, আস্থা এবং নির্ভরতার এক গভীর বন্ধন। শুভেন্দুর রাজনৈতিক জীবনের বহু গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে চন্দ্রনাথ রথ ছিলেন নীরব অথচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারিগর।তাঁর রাজনৈতিক চেতনার ভিতও তৈরি হয়েছিল পরিবার থেকেই। তাঁর মা চণ্ডীপুর পঞ্চায়েত সমিতির সদস্যা ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই রাজনৈতিক ও সামাজিক কাজের পরিবেশ দেখেই বড় হয়েছিলেন তিনি। ফলে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং জনসংযোগ তাঁর স্বভাবের মধ্যেই ছিল।

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে যখন শুভেন্দু অধিকারী বিজেপিতে যোগদান করেন, তখন চন্দ্রনাথ রথ তাঁর অন্যতম প্রধান সহযোদ্ধা হয়ে ওঠেন। ভবানীপুর উপনির্বাচন হোক বা নন্দীগ্রামের ঐতিহাসিক ভোটযুদ্ধ—প্রতিটি রাজনৈতিক কর্মসূচির নেপথ্যে ছিল তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম। শুভেন্দুর দৈনন্দিন সূচি নির্ধারণ, সভা-মিছিলের পরিকল্পনা, সংগঠনের সঙ্গে সমন্বয়, রাজনৈতিক কৌশল তৈরি—সব ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন এক নীরব কিন্তু অপরিহার্য উপস্থিতি। দলের বহু কর্মীর কাছে তিনি ছিলেন “চন্দ্রনাথ দা”—একজন সহজ, হাসিখুশি, কিন্তু অত্যন্ত দৃঢ়চেতা মানুষ। কিন্তু সেই মানুষটির জীবন থেমে গেল এক রক্তাক্ত রাতে। মধ্যমগ্রামের দোহরিয়া এলাকায় যশোর রোডের উপর চলন্ত গাড়িকে লক্ষ্য করে হামলা চালায় দুষ্কৃতীরা। বাইকে আসা চারজন আততায়ী পরপর গুলি চালায় তাঁর দিকে। মাথা, বুক ও পেটে গুলি লাগে। গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। তাঁর গাড়ির চালকও গুরুতর আহত হন। মুহূর্তের মধ্যে স্তব্ধ হয়ে যায় এক পরিবারের জীবন, ভেঙে পড়ে তাঁর সহকর্মী ও অনুগামীদের মন।

চন্দ্রনাথ রথ শুধু একজন পিএ বা ব্যক্তিগত সচিব ছিলেন না। তিনি ছিলেন এক বিশ্বস্ত বন্ধু, এক নির্ভীক সংগঠক, এক শৃঙ্খলাবদ্ধ প্রাক্তন সেনা অফিসার এবং এমন একজন মানুষ, যিনি নিঃশব্দে নিজের দায়িত্ব পালন করে গিয়েছেন। রাজনৈতিক মঞ্চের সামনে নয়, তিনি কাজ করতেন আড়ালে থেকে; কিন্তু সেই আড়ালের মানুষটিই অনেকের কাছে ছিলেন সবচেয়ে বড় ভরসা। আজ তাঁর মৃত্যু শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়—এটি এক আদর্শবাদী, কর্তব্যপরায়ণ এবং বিশ্বস্ত মানুষের অসময়ে ঝরে পড়ার বেদনা। তাঁর জীবনের গল্প মনে করিয়ে দেয়, রাজনীতির আলোয় যাঁদের আমরা দেখি, তাঁদের পিছনেও থাকেন কিছু নীরব সৈনিক—যাঁদের ত্যাগ, পরিশ্রম ও আনুগত্য অনেক সময় ইতিহাসের পাতায় লেখা না থাকলেও মানুষের স্মৃতিতে অমর হয়ে থাকে।

Loading