সোমালিয়া ওয়েব নিউজ: হুগলির তারকেশ্বর শুধুমাত্র একটি প্রসিদ্ধ শিবক্ষেত্র বা তীর্থস্থান নয়, বাংলার সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গেও এই জনপদের সম্পর্ক গভীর। সারা বছর দেশ-বিদেশ থেকে অগণিত ভক্ত বাবা তারকনাথের দর্শনে আসেন। “বাবা তারকেশ্বরের চরণে সেবা লাগে” ধ্বনিতে মুখরিত থাকে এই পুণ্যভূমি। তবে ধর্মীয় গুরুত্বের পাশাপাশি স্বাধীনতার প্রাক্কালে বাংলার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ক্ষেত্রেও তারকেশ্বর এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিল বলে উল্লেখ করেন ইতিহাসের গবেষক ও স্থানীয় ঐতিহ্য অনুরাগীরা। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর পশ্চিমবঙ্গ দিবস পালন উপলক্ষে তারকেশ্বর সফরকে ঘিরে এই জনপদ আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে। এরই প্রেক্ষিতে সামনে এসেছে ভারতকেশরী ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এবং তারকেশ্বরের ঐতিহাসিক সম্পর্কের প্রসঙ্গ।
শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদ ও জাতীয় নেতা
১৯০১ সালে জন্মগ্রহণকারী ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের পুত্র। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি ও বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে কৃতিত্বের সঙ্গে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন। পরবর্তীকালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বকনিষ্ঠ উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রাজনীতিতে যোগ দিয়ে অবিভক্ত বাংলার ফজলুল হক মন্ত্রিসভায় অর্থমন্ত্রী হিসেবে কাজ করেন। স্বাধীনতার পরে জওহরলাল নেহরুর প্রথম মন্ত্রিসভায় শিল্পমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও নেহরু-লিয়াকত চুক্তির বিরোধিতা করে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। পরবর্তীকালে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের সহযোগিতায় ভারতীয় জনসঙ্ঘ প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তীকালে ভারতীয় জনতা পার্টির ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
তারকেশ্বর সম্মেলন ও পৃথক পশ্চিমবঙ্গের দাবি
ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের একাংশের মতে, ১৯৪৭ সালের ৪ থেকে ৬ এপ্রিল তারকেশ্বরের রাজবাড়ির মাঠে অনুষ্ঠিত অখিল ভারতীয় হিন্দু মহাসভার সম্মেলন ছিল বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। সে সময় হিন্দু মহাসভার সভাপতি ছিলেন ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। সম্মেলনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার প্রতিনিধি ও সমর্থক যোগ দিয়েছিলেন। রেল কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত ট্রেনের ব্যবস্থাও করেছিল বলে সমসাময়িক সংবাদপত্রে উল্লেখ রয়েছে। সম্মেলনের সভাপতিত্ব করেন বর্ষীয়ান নেতা নির্মলচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। রাজেন্দ্রলাল রায়ের স্মৃতিতে সম্মেলনস্থলের নামকরণ করা হয় “রাজেন্দ্রনগর”। সুসজ্জিত শোভাযাত্রা, স্বেচ্ছাসেবকদের সামরিক কায়দায় অভ্যর্থনা এবং বিশাল জনসমাবেশ সেই সময়ের অন্যতম উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক ঘটনার সাক্ষী হয়ে ওঠে। গবেষকদের মতে, এই সম্মেলনেই ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি হিন্দুদের স্বার্থরক্ষার জন্য পৃথক পশ্চিমবঙ্গ গঠনের দাবি জোরালোভাবে উত্থাপন করেন। পরবর্তীকালে সাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রমথনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরাও এই দাবির প্রতি সমর্থন জানান।
ভারত সেবাশ্রম সংঘ ও স্বামী প্রণবানন্দের প্রভাব
ডঃ শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে ভারত সেবাশ্রম সংঘের প্রতিষ্ঠাতা স্বামী প্রণবানন্দজীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, ১৯৪০ সালে কাশীতে তাঁদের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎ হয়, যেখানে স্বামী প্রণবানন্দ বাঙালি হিন্দু সমাজের দায়িত্ব গ্রহণের আহ্বান জানান। পরবর্তীকালে এই ভাবধারা তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ও সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছিল বলে অনেক গবেষক মনে করেন।
পশ্চিমবঙ্গের জন্ম ও শ্যামাপ্রসাদের ভূমিকা
১৯৪৭ সালের ২০ জুন বাংলাভাগের প্রশ্নে বিধানসভায় ভোটাভুটিতে পশ্চিমবঙ্গ গঠনের প্রস্তাব গৃহীত হয়। ইতিহাসবিদদের একাংশ মনে করেন, এই প্রক্রিয়ায় ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। যদিও পশ্চিমবঙ্গের সৃষ্টি ছিল বহু রাজনৈতিক, সামাজিক ও ঐতিহাসিক কারণের সম্মিলিত ফল, তবুও শ্যামাপ্রসাদের রাজনৈতিক উদ্যোগ এবং সংগঠিত আন্দোলন এই প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলেছিল বলে বহু গবেষক মত প্রকাশ করেছেন।
ইতিহাস চর্চায় বিতর্ক ও পুনর্মূল্যায়নের দাবি
ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ভূমিকা নিয়ে ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক মহলে নানা মত রয়েছে। একাংশের মতে, তাঁর অবদান পাঠ্যপুস্তকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায়নি এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী ইতিহাস চর্চায় তাঁর ভূমিকা আড়ালে থেকে গিয়েছে। অন্যদিকে অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, দেশভাগ ও পশ্চিমবঙ্গ গঠনের ইতিহাস বহু ব্যক্তি, সংগঠন এবং জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতির সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে, তাই কোনও একক ব্যক্তির অবদান দিয়ে সেই ইতিহাসকে ব্যাখ্যা করা যায় না।
তারকেশ্বর: ধর্মক্ষেত্র থেকে ইতিহাসের সাক্ষী
আজও তারকেশ্বর মূলত একটি পবিত্র তীর্থস্থান হিসেবেই পরিচিত। কিন্তু ধর্মীয় আবহের পাশাপাশি স্বাধীনতার প্রাক্কালে বাংলার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সাক্ষী হিসেবেও তারকেশ্বরের নাম ইতিহাসের পাতায় উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে। ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে এই জনপদের সম্পর্ক সেই ইতিহাসেরই এক উল্লেখযোগ্য অংশ, যা নিয়ে এখনও গবেষণা, আলোচনা এবং পুনর্মূল্যায়ন অব্যাহত রয়েছে।

![]()

More Stories
রাজ্য পুলিশের দক্ষতা বৃদ্ধিতে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেবে রাষ্ট্রীয় রক্ষা বিশ্ববিদ্যালয়, স্বাক্ষরিত হল মৌ চুক্তি
ছয় মাসের নীরবতার পর শেষ হল নাসার ম্যাভেন মিশন
শুধু বায়োমেট্রিক হাজিরা নয়, প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ও স্বচ্ছ প্রশাসনিক ব্যবস্থা