August 16, 2026

হুল দিবস: আদিবাসী আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনতার সংগ্রামের স্মারক

সোমালিয়া ওয়েব নিউজ: প্রতি বছর ৩০ জুন ‘হুল দিবস’ পালন করা হয়। ১৮৫৫ সালের এই দিনেই বর্তমান ঝাড়খণ্ডের ভাগনাডিহ (ভোগনাডিহ) গ্রাম থেকে ব্রিটিশ শাসন, জমিদারি প্রথা এবং মহাজনী শোষণের বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক বিদ্রোহের সূচনা করেছিলেন সাঁওতাল সম্প্রদায়ের চার ভাই—সিধু মুর্মু, কানহু মুর্মু, চাঁদ মুর্মু এবং ভৈরব মুর্মু। তাঁদের সঙ্গে নেতৃত্বে ছিলেন দুই বোন ফুলো মুর্মু ও ঝানো মুর্মু। সাঁওতালি ভাষায় “হুল” শব্দের অর্থ বিদ্রোহ, গণঅভ্যুত্থান বা মুক্তির ডাক। ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজস্বনীতি, জমিদার ও মহাজনদের অত্যাচার এবং আদিবাসীদের জমি দখলের ফলে সাঁওতালদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। ঋণের ফাঁদ, অন্যায্য খাজনা এবং সামাজিক শোষণের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ক্রমশ বিস্ফোরণের রূপ নেয়। এরই পরিণতি ছিল ১৮৫৫ সালের সাঁওতাল হুল, যা ভারতের অন্যতম বৃহৎ আদিবাসী বিদ্রোহ হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। হাজার হাজার সাঁওতাল এই আন্দোলনে অংশ নেন। যদিও ব্রিটিশ বাহিনী নির্মমভাবে বিদ্রোহ দমন করে এবং অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারান, তবুও এই আন্দোলন ব্রিটিশ শাসনের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল। পরবর্তীকালে প্রশাসনিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় এবং সাঁওতালদের জন্য পৃথক প্রশাসনিক ব্যবস্থার পথও সুগম হয়। অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের আগেই সাঁওতাল হুল ব্রিটিশবিরোধী গণআন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ পূর্বসূরি ছিল। তাই হুল দিবস কেবল একটি আদিবাসী উৎসব নয়, এটি শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, আত্মমর্যাদা রক্ষা এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার এক ঐতিহাসিক প্রতীক।

তাঁদের পরিণতি সংক্ষেপে—

সিধু মুর্মু: ব্রিটিশদের হাতে ধরা পড়েন। ১৮৫৫ সালের আগস্ট মাসে তাঁকে ফাঁসি দেওয়া হয় বলে অধিকাংশ ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।

কানহু মুর্মু: বিদ্রোহ দমনের পর গ্রেপ্তার হন। পরবর্তীতে তাঁকেও ব্রিটিশরা মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে।

চাঁদ মুর্মু: বিদ্রোহ চলাকালীন ব্রিটিশ বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে নিহত হন। ভৈরব মুর্মু: তিনিও যুদ্ধে শহিদ হন।

ফুলো মুর্মু ও ঝানো মুর্মু: লোককথা ও সাঁওতাল ঐতিহ্য অনুযায়ী তাঁরা সাহসিকতার সঙ্গে ব্রিটিশ সেনাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেন এবং বহু শত্রুকে পরাস্ত করেন। পরে যুদ্ধক্ষেত্রেই তাঁরা শহিদ হন। তাঁদের বীরত্ব আজও সাঁওতাল সমাজে বিশেষভাবে স্মরণ করা হয়। তবে তাঁদের মৃত্যুর বিষয়ে সমসাময়িক সরকারি নথি সীমিত; অধিকাংশ তথ্য মৌখিক ইতিহাস ও সাঁওতাল ঐতিহ্য থেকে এসেছে।

আজকের দিনে হুল দিবস পালন করা হয় সিধু, কানহু, চাঁদ, ভৈরব, ফুলো ও ঝানোসহ সকল শহিদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এবং আদিবাসী সমাজের ইতিহাস, সংস্কৃতি, অধিকার ও অবদানকে স্মরণ করার উদ্দেশ্যে। বিভিন্ন স্থানে শোভাযাত্রা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোচনা সভা এবং শহিদদের প্রতি মাল্যদান কর্মসূচির মাধ্যমে দিনটি উদযাপিত হয়। হুল দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—স্বাধীনতা, ন্যায় এবং মর্যাদার জন্য মানুষের সংগ্রাম কখনও বৃথা যায় না। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে সাঁওতাল হুল এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়, যা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

Loading