বাংলা সাহিত্যের নবজাগরণের অগ্রদূত মাইকেল মধুসূদন দত্তের আজ প্রয়াণ দিবস

সোমালিয়া ওয়েব নিউজ:

হে বঙ্গ, ভাণ্ডারে তব বিবিধ রতন,
তা সবে, অবোধ আমি! অবহেলা করি,
পরধন-লোভে মত্ত, করিনু ভ্রমণ,
পরদেশে, ভিক্ষাবৃত্তি কুক্ষণে আচরি।

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এই কয়েকটি পংক্তি আজও বাঙালির আত্মপরিচয়ের এক অনন্য দলিল। বাংলা ভাষার নবজাগরণের অন্যতম পুরোধা, আধুনিক বাংলা কাব্যের পথিকৃৎ, মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের প্রয়াণ দিবসে তাঁকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছে সমগ্র বাংলা।

১৮৭৩ সালের ২৯ জুন কলকাতার জেনারেল হাসপাতালে মাত্র ৪৯ বছর বয়সে জীবনাবসান হয় এই অসামান্য প্রতিভার। কিন্তু স্বল্পায়ু জীবনেও তিনি বাংলা সাহিত্যকে এমন এক উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিলেন, যা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও অনুপ্রেরণার উৎস।

১৮২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি যশোর জেলার সাগরদাঁড়িতে তাঁর জন্ম। ছোটবেলা থেকেই ইংরেজি সাহিত্য ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রতি গভীর আকর্ষণ ছিল। পরবর্তীকালে বাংলা ভাষার শক্তি ও সৌন্দর্য উপলব্ধি করে তিনি সৃষ্টি করেন একের পর এক অমর সাহিত্যকীর্তি।

বাংলা কাব্যে অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তন, পাশ্চাত্য মহাকাব্যের রীতিকে বাংলা সাহিত্যে সফলভাবে প্রয়োগ এবং পৌরাণিক চরিত্রকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে উপস্থাপন—এই সব কিছুর মধ্য দিয়ে তিনি বাংলা সাহিত্যে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা করেন।

তাঁর শ্রেষ্ঠ কাব্য ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য সৃষ্টি। এছাড়াও ‘বীরাঙ্গনা’, ‘ব্রজাঙ্গনা’, ‘তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য’, ‘কৃষ্ণকুমারী’, ‘শর্মিষ্ঠা’, ‘একেই কি বলে সভ্যতা’ এবং ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’-এর মতো অসংখ্য অমর রচনা বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে।

জীবনের শেষ পর্বে আর্থিক অনটন, অসুস্থতা এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তাঁর সাহিত্যসাধনা থেমে থাকেনি। নিজের সমাধিলিপিতে তিনি লিখে গিয়েছিলেন—

“দাঁড়াও পথিক-বর, জন্ম যদি তব বঙ্গে!
তিষ্ঠ ক্ষণকাল! এ সমাধিস্থলে…”

এই আহ্বান আজও প্রতিটি বাঙালিকে থমকে দাঁড়াতে শেখায়—নিজের ভাষা, সংস্কৃতি ও সাহিত্যকে নতুন করে চিনতে শেখায়।

মাইকেল মধুসূদন দত্ত কেবল একজন কবি নন; তিনি ছিলেন নবজাগরণের এক সাহসী চিন্তক, ভাষার নব নির্মাতা এবং আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম স্থপতি। তাঁর সাহিত্যকীর্তি আজও বাংলা ভাষার অহংকার, আর তাঁর সৃষ্টিশীলতা আগামী প্রজন্মের কাছে চিরকাল প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

Loading