বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্র থেকে জেলেদের জালে উঠল ৫০০ বছরের প্রাচীন দেবমূর্তি! রহস্য ঘিরে তুমুল চাঞ্চল্য

সোমালিয়া ওয়েব নিউজঃ বঙ্গোপসাগরের গভীর জল থেকে মাছ ধরার জালে উঠে এসেছে একটি কারুকার্যময় পাথরের দেবমূর্তি, যা ঘিরে শুরু হয়েছে ইতিহাসবিদ, প্রত্নতত্ত্ববিদ এবং সাধারণ মানুষের ব্যাপক কৌতূহল। প্রাথমিকভাবে বিশেষজ্ঞদের ধারণা, মূর্তিটির বয়স প্রায় ৫০০ বছর হতে পারে। তবে এর প্রকৃত পরিচয়, নির্মাণকাল এবং কীভাবে এটি সমুদ্রের তলদেশে পৌঁছল, তা জানতে শুরু হয়েছে বিস্তারিত তদন্ত।

পুদুচেরির কারাইকাল মৎস্যবন্দর থেকে ২ জুলাই ২০২৬ তারিখে ১৬ জন জেলেকে নিয়ে একটি যান্ত্রিক মাছ ধরার নৌকা সমুদ্রে রওনা দেয়। কয়েক দিন মাছ ধরার পর ১০ জুলাই গভীর রাতে তামিলনাড়ুর মহাবলীপুরম উপকূলের কাছাকাছি বঙ্গোপসাগরে জাল ফেলতেই সেটি অস্বাভাবিক ভারী হয়ে যায়। প্রথমে জেলেরা মনে করেছিলেন, জালটি হয়তো সমুদ্রতলের কোনও পাথর বা ধ্বংসাবশেষে আটকে গেছে। কিন্তু দীর্ঘ চেষ্টার পর জাল টেনে তোলার সময় দেখা যায়, তার মধ্যে রয়েছে একটি বড় আকারের পাথরের দেবমূর্তি।

মূর্তিটির গায়ে জমে ছিল শামুকের খোলস, সামুদ্রিক শ্যাওলা এবং দীর্ঘদিন জলের নিচে থাকার স্পষ্ট চিহ্ন। ১১ জুলাই কারাইকাল মৎস্যবন্দরে ফিরে জেলেরা মূর্তিটি নিজেদের কাছে না রেখে প্রশাসনের হাতে তুলে দেন। পরে এটি সরকারি হেফাজতে সংরক্ষণ করা হয়।

প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে প্রত্নতত্ত্ববিদদের ধারণা, এটি দক্ষিণ ভারতের মধ্যযুগীয় মন্দির শিল্পরীতির একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। মূর্তিটির মাথায় অলংকৃত উঁচু মুকুট, গলায় ও দেহে সূক্ষ্ম অলংকার, সুস্পষ্ট পোশাকের নকশা এবং পেছনে খোদাই করা বৃত্তাকার প্রভামণ্ডল রয়েছে। একটি হাত আশীর্বাদের ভঙ্গিতে উঁচু করা, যা দক্ষিণ ভারতীয় মন্দির ভাস্কর্যের পরিচিত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মিল খুঁজে দেয়। তবে এটি কোন দেবতার মূর্তি, কোন রাজবংশের আমলে নির্মিত এবং প্রকৃত বয়স কত—সে বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাননি বিশেষজ্ঞরা।

মহাবলীপুরম ও তার আশপাশের উপকূল ভারতের সামুদ্রিক ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পল্লব, চোল, পাণ্ড্য ও বিজয়নগর সাম্রাজ্যের সময় এই অঞ্চল ছিল বাণিজ্য ও নৌযাত্রার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই পথ দিয়ে পাথরের ভাস্কর্য, ব্রোঞ্জের মূর্তি, মশলা, বস্ত্রসহ নানা মূল্যবান সামগ্রী পরিবাহিত হয়েছে। এর আগে তামিলনাড়ুর পুম্পুহার উপকূলেও জলের নিচে প্রাচীন স্থাপত্য ও বন্দর এলাকার ধ্বংসাবশেষের সন্ধান মিলেছিল।

মূর্তিটি সমুদ্রে কীভাবে পৌঁছেছে, তা নিয়ে একাধিক সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, উপকূল ক্ষয়ের ফলে কোনও প্রাচীন মন্দির থেকে এটি সমুদ্রে ভেসে যেতে পারে। আবার প্রবল ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাসে মন্দিরের অংশ ভেঙে সমুদ্রে তলিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। পাশাপাশি অতীতের কোনও জাহাজডুবির সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটিও তদন্ত করা হচ্ছে।

তদন্তকারীরা আরেকটি সম্ভাবনাও বিবেচনা করছেন—মন্দির থেকে চুরি হওয়া কোনও প্রত্নসম্পদ পাচারের সময় ধরা পড়ার আশঙ্কায় অপরাধীরা সেটি সমুদ্রে ফেলে দিয়েছিল কি না। তবে এই সম্ভাবনাগুলির কোনওটিই এখনও সরকারি ভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।

এখন প্রত্নতত্ত্ববিদেরা মূর্তিটির গায়ে জমে থাকা সামুদ্রিক আস্তরণ বৈজ্ঞানিকভাবে পরিষ্কার করে পাথরের ধরন, খোদাইয়ের রীতি, শিল্পশৈলী এবং নির্মাণকাল বিশ্লেষণ করবেন। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন মন্দির থেকে নিখোঁজ হওয়া দেবমূর্তির তালিকার সঙ্গেও এর মিলিয়ে দেখা হবে। সেই পরীক্ষার ফলই জানাবে, এই পাথরের দেবমূর্তিটির প্রকৃত ইতিহাস কী এবং কীভাবে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এটি বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্রের তলদেশে লুকিয়ে ছিল।

Loading