সোমালিয়া ওয়েব নিউজ: ফুটবল বিশ্বকাপে স্পেনের দুর্দান্ত সাফল্যে যখন উচ্ছ্বসিত গোটা বিশ্বের ফুটবলপ্রেমীরা, তখন বাংলার ফুটবল নিয়েও নতুন করে শুরু হয়েছে আলোচনা। একসময় যে বাংলা ভারতীয় ফুটবলের প্রাণকেন্দ্র ছিল, যে মাটি থেকে উঠে এসেছিলেন শৈলেন মান্না, চুনী গোস্বামী, পি. কে. বন্দ্যোপাধ্যায়, সুরজিৎ সেনগুপ্ত, গৌতম সরকার-সহ অসংখ্য কিংবদন্তি ফুটবলার, আজ সেই বাংলা থেকে আন্তর্জাতিক বা জাতীয় পর্যায়ে নতুন তারকা খুব কমই উঠে আসছেন। কেন এই পরিস্থিতি? কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে বাংলার ফুটবল সংস্কৃতি? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে এক বছর আগে আমরা কথা বলেছিলাম হুগলির গোঘাটের কামারপুকুরের বিশিষ্ট ক্রীড়াবিদ, প্রাক্তন ফুটবলার ও প্রশিক্ষক মধুসূদন নন্দী-র সঙ্গে। মধুসূদন নন্দীর ফুটবল যাত্রা শুরু হয় ছোটবেলায়, মাত্র চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময়। ১৯৭৮ সালে কামারপুকুর রামকৃষ্ণ মিশন স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর ফুটবলের প্রতি তাঁর ভালোবাসা আরও গভীর হয়। প্রতিদিন দূরবর্তী দশঘড়া গ্রাম থেকে স্কুলে যাতায়াত ছিল অত্যন্ত কষ্টকর। কিন্তু মাঠে তাঁর অসাধারণ ফুটবল প্রতিভা দেখে মিশনের মহারাজ এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, তাঁর জন্য হোস্টেলে থাকা-খাওয়ার বিশেষ ব্যবস্থা করে দেন। সেই সুযোগই বদলে দেয় তাঁর জীবন। স্কুলজীবনেই একাধিকবার কামারপুকুর রামকৃষ্ণ মিশনকে চ্যাম্পিয়ন করেন তিনি। সেখান থেকেই খুলে যায় কলকাতার ময়দানে খেলার দরজা। তৎকালীন আইএফএ-র সঙ্গে যুক্ত এবং এরিয়ান ক্লাবের কর্তা অশোক মিত্রের সহযোগিতায় মিশনের মহারাজ তাঁকে কলকাতায় খেলার সুযোগ করে দেন। ১৯৮৪ সালে পায়ে সাধারণ হাওয়াই চটি পরে কলকাতায় এসেছিলেন মধুসূদন নন্দী। তখন একটি ভালো ফুটবল বুট কেনার সামর্থ্যও ছিল না। সেই সংগ্রামের দিনগুলোর কথা স্মরণ করতে গিয়ে আজও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। তাঁর জীবনের একটি ঘটনা আজও তাঁকে কষ্ট দেয়। তিনি জানান, যে বছর মিশন স্কুলকে চ্যাম্পিয়ন করেছিলেন, তখন তাঁর ফুটবল বুটের জন্য কোনও টাকা নেওয়া হয়নি। কিন্তু পরের বছর স্কুলকে চ্যাম্পিয়ন করাতে না পারায় পরীক্ষার ফল নিতে গেলে তাঁকে বলা হয়েছিল, “তোমার রেজাল্ট তো বুটের মধ্যে আটকে আছে।” সেই অপমানের স্মৃতি আজও তাঁর মনে গভীর দাগ কেটে রয়েছে। ১৯৮৪ সালে কলকাতার ঐতিহ্যবাহী এরিয়ান ক্লাব-এর হয়ে খেলতে শুরু করেন মধুসূদন নন্দী। খেলেছেন অমিত ভদ্র, অচিন্ত্য, সুমিত মুখার্জি, মাধব পান, সন্দীপ মুন্সি, পার্থ দে-র মতো তৎকালীন খ্যাতনামা ফুটবলারদের সঙ্গে। ১৯৮৫ সালে টালিগঞ্জ অগ্রগামীর বিরুদ্ধে প্রথম ডিভিশন লিগে অভিষেক হয় তাঁর। সেই সময় তাঁর খেলার প্রশংসা প্রকাশিত হয় দৈনিক বসুমতী ও বর্তমান পত্রিকায়। জীবনের প্রথম কোচ ছিলেন দয়াল সরণ বাগ। পরে অমিয় সরকার, চিত্তরঞ্জন চক্রবর্তী ও অশোক নাগের মতো অভিজ্ঞ কোচদের কাছে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। ১৯৮২ সালে কামারপুকুর রামকৃষ্ণ মিশনের বর্ষসেরা ক্রীড়াবিদ নির্বাচিত হন এবং কিংবদন্তি ফুটবলার সুরজিৎ সেনগুপ্ত-র হাত থেকে সেই সম্মান গ্রহণ করেন। তিনি বলেন, সেই সময় কলকাতার ময়দানে সুযোগ পাওয়া খুবই কঠিন ছিল। শুধু প্রতিভা থাকলেই হতো না, প্রয়োজন ছিল সঠিক মানুষের নজরে পড়ার। তবুও কঠোর পরিশ্রম এবং নিষ্ঠার জোরেই তিনি নিজের জায়গা তৈরি করেছিলেন। ১৯৯৫ সালে উচালন মাঠে খেলতে গিয়ে গুরুতর হাতে চোট পান। অস্ত্রোপচার হলেও হাত আর পুরোপুরি সুস্থ হয়নি। এরপর প্রতিযোগিতামূলক ফুটবল ছেড়ে কোচিংয়ের কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন। এখনও ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের ফুটবলের প্রশিক্ষণ দেন এবং বিভিন্ন টুর্নামেন্টে ধারাভাষ্যকার হিসেবেও নিয়মিত আমন্ত্রণ পান। বর্তমান ফুটবল পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মধুসূদন নন্দী বলেন, আজকের যুবসমাজ ক্রমশ মাঠ ছেড়ে মোবাইল ফোন ও ডিজিটাল বিনোদনের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। ফলে খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ কমছে। তাঁর মতে, গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চল ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে অসাধারণ প্রতিভা রয়েছে। কিন্তু উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, পুষ্টি, আর্থিক সহায়তা ও সুযোগের অভাবে সেই প্রতিভার বিকাশ হচ্ছে না। প্রশাসন, সরকার, ক্রীড়া সংগঠন এবং সমাজকে একসঙ্গে এগিয়ে এসে এই প্রতিভাবান ফুটবলারদের পাশে দাঁড়াতে হবে। নতুন প্রজন্মের উদ্দেশে তাঁর বার্তা, “শরীরচর্চা করো, নিয়মিত মাঠে নামো, কঠোর পরিশ্রম করো এবং কখনও হাল ছেড়ো না। ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়, এটি শৃঙ্খলা, দলগত মনোভাব, আত্মবিশ্বাস এবং জীবনের লড়াই শেখায়। “স্পেনের বিশ্বজয়ের আনন্দের মধ্যেও মধুসূদন নন্দীর মতো অভিজ্ঞ ক্রীড়াবিদদের বক্তব্য যেন বাংলার ফুটবলের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবতে শেখায়। ফুটবলের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে হলে প্রতিভা খুঁজে বের করা, তৃণমূল স্তরে পরিকাঠামো গড়ে তোলা এবং খেলোয়াড়দের যথাযথ সম্মান ও সহায়তা দেওয়াই হতে পারে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

![]()

More Stories
আই সি সি র স্বাধীন চেয়ারম্যান নির্বাচিত
তৃতীয় বারের জন্য চ্যাম্পিয়ন কলকাতা! দেখে নেওয়া যাক কে কোন পুরস্কার জিতলেন
হায়দরাবাদের বাঁহাতি ওপেনার ভেঙে দিয়েছেন, কোহলির ৮ বছরের পুরনো নজির!