September 2, 2026

আজাদ হিন্দ ফৌজ: ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়

সোমালিয়া ওয়েব নিউজ: নানা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে আজ ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠনের বার্ষিকী স্মরণ করা হচ্ছে। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে আজাদ হিন্দ ফৌজ বা ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি (INA)-এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪২ সালে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভারতীয় যুদ্ধবন্দিদের নিয়ে ক্যাপ্টেন মোহন সিং-এর উদ্যোগে প্রথম আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৪৩ সালে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পৌঁছে এই বাহিনীকে নতুনভাবে সংগঠিত ও শক্তিশালী করেন। তাঁর নেতৃত্বে আজাদ হিন্দ ফৌজের মূল লক্ষ্য হয়ে ওঠে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসন থেকে ভারতকে মুক্ত করা। নেতাজির বিখ্যাত আহ্বান—“তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব”—হাজার হাজার ভারতীয়কে স্বাধীনতার লড়াইয়ে উদ্বুদ্ধ করেছিল। ধর্ম, ভাষা ও জাতিগত বিভেদ ভুলে হিন্দু, মুসলিম, শিখ-সহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ভারতীয়রা এই বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। ১৯৪৩ সালের ২১ অক্টোবর সিঙ্গাপুরে নেতাজি আজাদ হিন্দের অস্থায়ী সরকার প্রতিষ্ঠার ঘোষণা করেন এবং তিনি রাষ্ট্রপ্রধান, প্রধানমন্ত্রী, যুদ্ধ ও পররাষ্ট্র দফতরের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। জাপান-সহ কয়েকটি দেশ এই সরকারকে স্বীকৃতি দেয়। পরবর্তীতে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণও আজাদ হিন্দ সরকারের হাতে তুলে দেওয়া হয় এবং নেতাজি দ্বীপ দুটির নাম রাখেন ‘শহীদ’ ও ‘স্বরাজ’। আজাদ হিন্দ ফৌজের আরেকটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় ছিল নারীদের সক্রিয় সামরিক অংশগ্রহণ। ক্যাপ্টেন লক্ষ্মী সাহগলের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে রানি ঝাঁসি রেজিমেন্ট, যা ভারতীয় নারীদের সামরিক ভূমিকার এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে। ১৯৪৪ সালে জাপানি বাহিনীর সঙ্গে যৌথভাবে আজাদ হিন্দ ফৌজ উত্তর-পূর্ব ভারতের দিকে অগ্রসর হয় এবং মণিপুরের মোইরাংয়ে আজাদ হিন্দ ফৌজের পতাকা উত্তোলন করা হয়। তবে পরবর্তীতে জাপানের পরাজয়, রসদ ও অস্ত্রের ঘাটতি, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং মিত্রবাহিনীর পাল্টা আক্রমণের কারণে তাদের অগ্রযাত্রা থেমে যায়। ১৯৪৫ সালে জাপানের আত্মসমর্পণের পর আজাদ হিন্দ ফৌজের সামরিক অভিযান কার্যত শেষ হয়ে যায়। এরপর নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যুর খবর সামনে এলেও তাঁর মৃত্যু নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। আজাদ হিন্দ ফৌজের সদস্যদের বিরুদ্ধে দিল্লির লালকেল্লায় বিচার শুরু হলে গোটা দেশে ব্যাপক জনআন্দোলন তৈরি হয়। শাহনওয়াজ খান, প্রেমকুমার সেহগল এবং গুরবখশ সিং ধিল্লনের বিচার ভারতীয় জনমনে প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং রাজনৈতিক মতপার্থক্য ভুলে বহু মানুষ তাঁদের সমর্থনে এগিয়ে আসেন। সামরিকভাবে আজাদ হিন্দ ফৌজ ব্রিটিশদের পরাজিত করে ভারতকে স্বাধীন করতে না পারলেও ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে তাদের রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ছিল অত্যন্ত গভীর। বিশেষ করে আজাদ হিন্দ ফৌজের বিচার এবং তার পরবর্তী জনআন্দোলন ব্রিটিশ শাসনের শেষ পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছিল। তাই আজাদ হিন্দ ফৌজের ইতিহাস শুধুমাত্র একটি সামরিক বাহিনীর ইতিহাস নয়, বরং দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ, ঐক্য এবং স্বাধীনতার অদম্য আকাঙ্ক্ষার এক অনন্য অধ্যায়।

Loading