সোমালিয়া ওয়েব নিউজ: কিছু মানুষ কেবল সময়ের অংশ হয়ে থাকেন না, তাঁরা হয়ে ওঠেন সময়ের প্রতীক। তাঁদের চলে যাওয়ার পরও তাঁদের উপস্থিতি অনুভব করা যায় স্মৃতিতে, সংস্কৃতিতে, মানুষের আবেগে। বাঙালির কাছে তেমনই এক চিরন্তন নাম—উত্তমকুমার। আজ তাঁর জন্মশতবর্ষ। একশো বছর আগে এই দিনেই জন্ম নিয়েছিলেন অরুণকুমার চট্টোপাধ্যায়। পরবর্তীকালে যিনি কোটি বাঙালির ভালোবাসায় হয়ে উঠেছিলেন ‘মহানায়ক’ উত্তমকুমার।
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে বহু অভিনেতা এসেছেন, অনেকে জনপ্রিয় হয়েছেন, কেউ কেউ কিংবদন্তিও হয়েছেন। কিন্তু উত্তমকুমার যেন তাঁদের সকলের থেকে আলাদা। তিনি শুধু একজন সফল অভিনেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাঙালির আবেগের সঙ্গে মিশে থাকা এক অনন্য অধ্যায়। তাঁর নাম উচ্চারণ করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সাদা-কালো পর্দা, মায়াবী হাসি, গভীর চোখের দৃষ্টি আর এক অদ্ভুত স্বাভাবিক অভিনয়ের জাদু।
কিন্তু এই মহানায়কের পথচলা শুরু হয়েছিল মোটেই মসৃণ পথে নয়। চলচ্চিত্রে আসার পর প্রথমদিকে একের পর এক ছবি ব্যর্থ হয়েছিল। কটাক্ষ, হতাশা, ব্যর্থতা—সবই তাঁকে সহ্য করতে হয়েছে। তবু থেমে যাননি তিনি। অভিনয়ের প্রতি অদম্য ভালোবাসা এবং নিজের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করার জেদ তাঁকে ধীরে ধীরে পৌঁছে দেয় সাফল্যের শিখরে।
তারপর এল সেই সময়, যখন বাংলা সিনেমার পর্দায় উত্তমকুমার মানেই ছিল এক অন্যরকম আকর্ষণ। ‘সাড়ে চুয়াত্তর’, ‘হারানো সুর’, ‘সপ্তপদী’, ‘নায়ক’, ‘চিড়িয়াখানা’, ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’—একের পর এক ছবিতে তিনি প্রমাণ করেছেন, জনপ্রিয় নায়ক হওয়ার পাশাপাশি তিনি ছিলেন অসাধারণ এক অভিনেতা।
বিশেষ করে সুচিত্রা সেনের সঙ্গে তাঁর জুটি বাংলা চলচ্চিত্রে তৈরি করেছিল এক স্বর্ণযুগ। তাঁদের পর্দার প্রেম, অভিমান, বিরহ কিংবা নীরবতা—সবকিছুই দর্শকের মনে এমনভাবে জায়গা করে নিয়েছিল যে, বহু বছর পরেও সেই জুটি বাঙালির নস্টালজিয়ার অন্যতম পরিচয় হয়ে আছে।
তবে উত্তমকুমারকে শুধুমাত্র রোম্যান্টিক নায়ক হিসেবে দেখলে তাঁর শিল্পীসত্তার প্রতি অবিচার করা হবে। ‘নায়ক’-এর অরিন্দম মুখোপাধ্যায় থেকে ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’-র চরিত্র—বিভিন্ন ভূমিকায় তিনি দেখিয়েছেন তাঁর অভিনয়ের বিস্তার কতটা গভীর ও বহুমাত্রিক। চরিত্রের হাসি-কান্না, দ্বন্দ্ব-সংকট, ভালোবাসা ও যন্ত্রণা—সবকিছুকেই তিনি নিজের মধ্যে ধারণ করতে পারতেন।
আর সেখানেই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি। তিনি অভিনয় করতেন, কিন্তু দর্শকের মনে হতো—পর্দায় যেন অভিনয় করছেন না, জীবনটাকেই বাঁচছেন।
১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই তাঁর আকস্মিক প্রয়াণে বাংলা চলচ্চিত্র জগতে নেমে এসেছিল গভীর শোক। অসংখ্য মানুষ বিশ্বাসই করতে পারেননি যে তাঁদের প্রিয় মহানায়ক আর কখনও নতুন কোনও ছবিতে পর্দায় ফিরবেন না। কিন্তু একজন শিল্পীর মৃত্যু তাঁর শিল্পকে শেষ করতে পারে না। উত্তমকুমারের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।
সময়ের সঙ্গে বদলেছে সিনেমা। বদলেছে প্রযুক্তি, বদলেছে অভিনয়ের ধরন, বদলেছে দর্শকের রুচি। এসেছে নতুন প্রজন্মের অভিনেতা, নতুন গল্প, নতুন ভাষা। তবুও উত্তমকুমার থেকে গিয়েছেন নিজের জায়গায়—অমলিন, অনন্য।
আজকের প্রজন্ম হয়তো তাঁর সময়ের সিনেমা হলে বসে দেখেনি। কিন্তু কোনও এক অলস বিকেলে টেলিভিশনের পর্দায় ‘সপ্তপদী’ কিংবা ‘হারানো সুর’ চললে এখনও অনেকের চোখ আটকে যায়। পুরনো সংলাপ শুনলে ফিরে আসে শৈশবের স্মৃতি। তাঁর হাসি দেখলে মনে পড়ে যায় এক হারিয়ে যাওয়া সময়ের কথা।
কারণ উত্তমকুমার কেবল সিনেমার নায়ক ছিলেন না। তিনি ছিলেন বাঙালির স্বপ্নের নায়ক, ভালোবাসার নায়ক, আবেগের নায়ক।
তাঁর জন্মশতবর্ষে তাই তাঁকে ফিরে দেখা মানে শুধু একজন অভিনেতার জীবনকে স্মরণ করা নয়। বরং ফিরে দেখা বাংলা সংস্কৃতির সেই সোনালি অধ্যায়কে, যখন সিনেমা ছিল মানুষের বিনোদনের পাশাপাশি আবেগেরও এক বিশাল জগৎ।
একশো বছর পেরিয়ে গেছে তাঁর জন্মের। তাঁর চলে যাওয়ারও পেরিয়ে গেছে চার দশকের বেশি সময়। তবু সময় তাঁকে মুছে দিতে পারেনি।
বরং যত সময় যাচ্ছে, ততই যেন স্পষ্ট হচ্ছে তাঁর মহত্ত্ব।
পর্দার আলো নিভে গেছে বহুদিন। ক্যামেরা থেমে গেছে। নতুন কোনও চরিত্রে আর দেখা যাবে না তাঁকে। কিন্তু বাঙালির হৃদয়ের পর্দায় তাঁর ছবি এখনও চলছে—একই রকম উজ্জ্বল, একই রকম আপন।
তাই উত্তমকুমার কোনও অতীতের নাম নন। তিনি বাঙালির স্মৃতিতে বেঁচে থাকা এক চিরন্তন অনুভূতি—একজন সত্যিকারের মহানায়ক।

![]()

More Stories
সপ্তম বেতন কমিশনের কাছে দাবি-পরামর্শ জানাতে চালু ওয়েবসাইট, ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত মতামত
উত্তরবঙ্গের যোগাযোগে বড় বদল! ২,০৭৭ কোটি টাকায় চার লেন হচ্ছে বাগডোগরা–গলগালিয়া সড়ক
দেশপ্রেম ও ধর্মীয় আস্থার প্রশ্নে কঠোর অবস্থানের আহ্বান মুখ্যমন্ত্রীর