সোমালিয়া ওয়েব নিউজ: শরতের আকাশে যখন সাদা মেঘের ভেলা, মাঠে কাশফুলের দোলা, আর উৎসবের আগমনী সুরে মুখরিত চারপাশ—তখনই আসে আশ্বিনের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী। এই তিথিকে ঘিরেই বাংলার বহু অঞ্চলে পালিত হয় জিতাষ্টমী বা জিতা ব্রত। সন্তানের দীর্ঘায়ু, সুস্বাস্থ্য ও অমঙ্গল থেকে রক্ষার প্রার্থনায় মায়েরা এই ব্রত পালন করেন। রাঢ় বাংলার বহু এলাকায় এই ব্রত ‘বড়ষষ্ঠী’ নামেও পরিচিত।
লোকপ্রচলিত ব্রতকথার একটি ধারায় জীমূতবাহনকে ত্যাগ ও আত্মদানের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। কথিত আছে, একসময় নাগলোকের উপর নেমে এসেছিল ভয়াবহ বিপদ। গরুড়ের সঙ্গে নাগদের এক চুক্তি অনুযায়ী প্রতিদিন একটি করে নাগকে তাঁর আহার হতে হতো। একদিন সেই মৃত্যুর পালা এসে পড়ে এক নাগমাতার সন্তানের উপর।
সন্তানকে হারানোর আশঙ্কায় অসহায় হয়ে কাঁদছিলেন মা। সেই কান্না শুনতে পান জীমূতবাহন। তিনি বুঝতে পারেন, একজন মায়ের কাছে সন্তানের চেয়ে মূল্যবান আর কিছুই নেই। তাই নিজের জীবনকে তুচ্ছ করে তিনি সিদ্ধান্ত নেন—নাগবালকের পরিবর্তে তিনিই মৃত্যুর মুখে যাবেন।
লাল বস্ত্র পরিধান করে জীমূতবাহন নিজেকে গরুড়ের সামনে সমর্পণ করেন। গরুড় তাঁকে তুলে নিয়ে গেলেও তাঁর আচরণে বিস্মিত হন। যাঁকে মৃত্যুর মুখে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তাঁর চোখে নেই ভয়, নেই নিজের প্রাণ বাঁচানোর আকুতি। রয়েছে অন্য এক প্রাণকে বাঁচানোর দৃঢ় সংকল্প।
শেষ পর্যন্ত জীমূতবাহনের পরিচয় প্রকাশ পায়। তাঁর আত্মত্যাগ ও পরোপকারে গরুড়ও বিচলিত হন। কথিত আছে, তাঁর প্রাণ ফিরিয়ে দেওয়া হয় এবং নাগদের উপর সেই মৃত্যুর অভিশাপেরও অবসান ঘটে। এই কাহিনিতেই জীমূতবাহন হয়ে ওঠেন জীবনরক্ষার প্রতীক—একজনের প্রাণ বাঁচাতে নিজের জীবন উৎসর্গ করার প্রতীক।
আর সেই কারণেই জিতাষ্টমীর ব্রতকথার কেন্দ্রে রয়েছে সন্তানের মঙ্গল ও দীর্ঘজীবনের প্রার্থনা। মায়ের কাছে সন্তান শুধু পরিবারের সদস্য নয়—সন্তান তাঁর আশা, তাঁর ভবিষ্যৎ, তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় প্রার্থনা। তাই সারাদিন উপবাস, সংযম ও ভক্তির মাধ্যমে জীমূতবাহনের কাছে প্রার্থনা করেন ব্রতিনীরা।
জিতাষ্টমীর আচারেও রয়েছে বাংলার মাটির গন্ধ। অঞ্চলভেদে উঠোনে ছোট্ট পুকুর তৈরি করে তার মধ্যে কলা ও বেলগাছ স্থাপন করা হয়। ফল, ভেজানো ছোলা, মটরসহ বিভিন্ন নৈবেদ্য সাজানো হয়। কোথাও আবার মাটির তৈরি শেয়াল ও শকুনের প্রতীক রাখা হয়। সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত চলে পুজো ও ব্রতকথা শোনা।
এই ব্রতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে চিল ও শিয়ালীর আর একটি লোককাহিনিও। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, দুজনেই একসঙ্গে জীমূতবাহনের ব্রত গ্রহণ করেছিল। কিন্তু ব্রতের নিয়ম পালনে একজন ছিলেন অবিচল, অন্যজন ক্ষুধার কাছে হার মেনে ব্রত ভেঙেছিলেন। পরবর্তী জীবনের ঘটনাপ্রবাহে তাঁদের কর্মের ফলের পার্থক্য ফুটে ওঠে। এই কাহিনির মধ্য দিয়ে ব্রতকথা শেখায়—শুধু আচার পালন নয়, তার সঙ্গে প্রয়োজন নিষ্ঠা, সংযম ও বিশ্বাস।
তবে জিতাষ্টমী শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়। এর গভীরে রয়েছে এক মায়ের চিরন্তন প্রার্থনা—‘আমার সন্তান ভালো থাকুক, সুস্থ থাকুক, দীর্ঘ জীবন পাক।’
জীমূতবাহনের কাহিনি তাই আজও মনে করিয়ে দেয়, সত্যিকারের ভালোবাসা শুধু নিজের জন্য বাঁচতে শেখায় না, প্রয়োজনে অন্যের জীবন রক্ষার জন্য নিজের স্বার্থ ত্যাগ করতেও শেখায়।
শরতের নীল আকাশের নিচে, প্রদীপের আলোয়, ফুল-ফল আর ভক্তির অর্ঘ্যে তাই জিতাষ্টমী হয়ে ওঠে মায়ের হৃদয়ের এক নীরব প্রার্থনা—
সন্তানের জীবনে যেন অমঙ্গল না আসে, অন্ধকার যেন দূরে সরে যায়, আর ভালোবাসার আশীর্বাদে জীবন ভরে ওঠে।

![]()

More Stories
নিজের ছেড়ে যাওয়া রাজ্যসভা আসনেই বিজেপির প্রার্থী কোয়েল মল্লিক
পুলিশের কর্মীদের রেশন ভাতা বাড়লো
রাজ্যে নতুন শিল্পনীতি প্রকাশের পথে আরও এক ধাপ