সোমালিয়া ওয়েব নিউজ: একটি যন্ত্রের ওজন প্রায় ২০০ টন! দৈর্ঘ্য ১১০ ফুটেরও বেশি। সেই বিশাল যন্ত্রকে গন্তব্যে পৌঁছে দিতে পেরিয়ে যেতে হয়েছে চারটি রাজ্য, অতিক্রম করতে হয়েছে প্রায় ১,৩০০ কিলোমিটার পথ। কোথাও বিদ্যুতের তার সরানোর ব্যবস্থা, কোথাও রাস্তার বাধা দূর করা—এভাবেই প্রায় ছয় মাসের দীর্ঘ প্রস্তুতি ও পরিবহন পর্ব শেষে উত্তরপ্রদেশের কুম্ভিতে পৌঁছল বেলজিয়ামে তৈরি এই দানবীয় শিল্পযন্ত্র।
কিন্তু এই বিশাল যন্ত্রকে ঘিরে এত আয়োজন কেন? এর পিছনে রয়েছে ভারতের কৃষি ও শিল্পক্ষেত্রের এক গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা। এবার আখকে কাজে লাগিয়েই তৈরি হতে চলেছে বায়োপ্লাস্টিক!
গন্তব্য উত্তরপ্রদেশের কুম্ভি, লক্ষ্য পরিবেশবান্ধব শিল্পের প্রসার।
উত্তরপ্রদেশের লখিমপুর খেরির কুম্ভিতে বলরামপুর চিনি মিলসের কারখানা চত্বরে গড়ে উঠছে বৃহৎ আখভিত্তিক বায়োপ্লাস্টিক উৎপাদন প্রকল্প। সেই প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রগুলির মধ্যে অন্যতম এই সাইক্লাইজেশন রিঅ্যাক্টর (Cyclisation Reactor)। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২২ অক্টোবরের আগেই যন্ত্রটি কারখানায় পৌঁছেছে এবং ইনস্টলেশনের কাজ শুরু হয়েছে।
বেলজিয়ামে তৈরি যন্ত্রটিকে প্রথমে সমুদ্রপথে ভারতের ওড়িশার পারাদ্বীপ বন্দরে নিয়ে আসা হয়। এরপর শুরু হয় স্থলপথে দীর্ঘ ও জটিল পরিবহন। ওড়িশা থেকে ঝাড়খণ্ড, বিহার হয়ে উত্তরপ্রদেশ—চার রাজ্যের পথ পেরিয়ে অবশেষে গন্তব্যে পৌঁছয় বিশাল রিঅ্যাক্টরটি।
এত ভারী যন্ত্র পরিবহনের জন্য সাধারণ ট্রাক যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন হয় বিশেষভাবে তৈরি বহু-চাকাবিশিষ্ট ভারী ট্রেলারের। বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে ট্রেলারের চাকার সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। তবে যন্ত্রটির আকার ও ওজনের কারণে যে বিশেষ পরিবহন ব্যবস্থা ব্যবহার করতে হয়েছে, তা স্পষ্ট।
রাস্তার বাধা, বিদ্যুতের তার—প্রতিটি পদক্ষেপেই ছিল চ্যালেঞ্জ।
এই পরিবহন অভিযান ছিল অত্যন্ত জটিল। রাস্তার বাঁক, সংকীর্ণ পথ, সেতু ও ওভারব্রিজের উচ্চতার সীমাবদ্ধতা এবং বিদ্যুতের তার—সবকিছু বিবেচনা করে তৈরি করতে হয়েছে পরিবহনের পরিকল্পনা। কোথাও বিদ্যুতের তার সাময়িকভাবে উঁচু করতে হয়েছে, কোথাও সরাতে হয়েছে প্রতিবন্ধকতা। আবার কিছু জায়গায় ভারী যান চলাচলের উপযোগী করে রাস্তা প্রস্তুত করার ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বিশাল পরিবহনের কাজে যুক্ত ছিলেন প্রায় ৩৫ জন প্রশিক্ষিত কর্মী। গোটা পরিবহন অভিযানে প্রায় ১৫ কোটি টাকা খরচ হয়েছে বলেও ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ, শুধু একটি যন্ত্র তৈরি করাই নয়, সেটিকে নিরাপদে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দেওয়ার জন্যও প্রয়োজন হয়েছে বিপুল অর্থ, দক্ষতা ও প্রকৌশলগত পরিকল্পনা।
এবার আসল চমক—আখ থেকে তৈরি হবে PLA বায়োপ্লাস্টিক।
আখ সাধারণত চিনি উৎপাদনের জন্যই বেশি পরিচিত। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে এই কৃষিজ ফসল থেকেই তৈরি করা সম্ভব পলিল্যাকটিক অ্যাসিড বা PLA। এটি এক ধরনের বায়োপ্লাস্টিক, যা প্যাকেজিং সামগ্রী-সহ বিভিন্ন শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহার করা যায়।
এই প্রকল্পে আখ থেকে প্রথমে ল্যাকটিক অ্যাসিড উৎপাদন করা হবে। পরবর্তী একাধিক শিল্পপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেই উপাদান থেকে তৈরি হবে PLA। সাইক্লাইজেশন রিঅ্যাক্টর এই উৎপাদন ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
পেট্রোলিয়াম-নির্ভর প্রচলিত প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে PLA-র ব্যবহার বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সব বায়োপ্লাস্টিক সব পরিবেশে সহজে পচে যায় না। PLA-র মতো উপাদান ভেঙে ফেলার জন্য অনেক ক্ষেত্রেই বিশেষ শিল্পভিত্তিক কম্পোস্টিং ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়। তাই পরিবেশের উপকারিতা নিশ্চিত করতে উৎপাদনের পাশাপাশি যথাযথ বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও জরুরি।
কত বড় এই প্রকল্প?
বলরামপুর চিনি মিলসের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই প্রকল্পে প্রায় ৩,০৮০ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বছরে প্রায় ৭৫ হাজার টন PLA উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। যদিও কয়েকটি সংবাদ প্রতিবেদনে বছরে ৮০ হাজার টন উৎপাদনক্ষমতার কথা বলা হয়েছে, চূড়ান্ত লক্ষ্যমাত্রার ক্ষেত্রে সংস্থার সর্বশেষ আনুষ্ঠানিক তথ্যই প্রামাণ্য।
এই প্রকল্প শুধু বায়োপ্লাস্টিক তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে কৃষিজ সম্পদের মূল্য বৃদ্ধি, আখভিত্তিক শিল্পের সম্প্রসারণ এবং নতুন কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা। আখচাষের সঙ্গে যুক্ত কৃষকদের জন্যও ভবিষ্যতে নতুন বাজার ও শিল্পের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে তার প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে প্রকল্পের উৎপাদন, বাণিজ্যিক সাফল্য এবং কৃষকদের সঙ্গে সরবরাহব্যবস্থার সম্পর্কের উপর।
ভারতের মতো কৃষিনির্ভর দেশে কৃষিজ ফসলকে আধুনিক শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করার এই উদ্যোগ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। একদিকে কৃষির সঙ্গে শিল্পের সংযোগ বাড়বে, অন্যদিকে পেট্রোলিয়াম-নির্ভর কাঁচামালের বিকল্প তৈরির সুযোগও তৈরি হবে।
ছয় মাসের অপেক্ষা, চার রাজ্যের পথ এবং প্রায় ১৫ কোটি টাকার পরিবহন—সব মিলিয়ে এই বিশাল যন্ত্রের আগমন ইতিমধ্যেই আলোচনার বিষয়। এখন দেখার, কুম্ভির এই প্রকল্প কত দ্রুত উৎপাদনে যায় এবং ভারতের বায়োপ্লাস্টিক শিল্পে কতটা পরিবর্তন আনতে পারে।
আখ কি এবার শুধু চিনির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না? কৃষিজ ফসল থেকেই কি তৈরি হবে ভবিষ্যতের আরও পরিবেশবান্ধব শিল্পপণ্য? উত্তরপ্রদেশের এই বৃহৎ প্রকল্পের দিকে তাকিয়ে এখন সেই সম্ভাবনাই দেখছে শিল্পমহল।

![]()

More Stories
বঙ্গোপসাগরে শক্তি বাড়াচ্ছে নিম্নচাপ, সোমবার ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কা—উপকূলে জারি হলুদ সতর্কতা
লাইভ সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান দেখানো যাবে না, হিংসাত্মক ভিজ্যুয়ালেও লাগাম—বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলিকে কেন্দ্রের কড়া নির্দেশ
৩২ ধরনের ফল ও সবজি দিয়ে পুরীর সৈকতে দেবী দুর্গার বালুশিল্প, নজর কাড়লেন সুদর্শন পট্টনায়ক