সোমালিয়া ওয়েব নিউজ; বয়স৭৬। শরীরে ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথির কষ্ট। তবু মনোবল অটুট, আদর্শ অটুট। আজও বামফ্রন্টের সংগঠনের কাজে সমানভাবে সক্রিয় হুগলি জেলার গোঘাটে কমরেড দেবু চ্যাটার্জি। পার্টির প্রতি ভালোবাসা ও নিষ্ঠা যেন তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে তিনি ছিলেন সংগ্রামী, অকুতোভয় এক সৈনিক।স্কুল জীবন থেকেই রাজনীতির প্রতি টান। আলিপুরদুয়ারের ঐতিহাসিক বেরুবাড়ি আন্দোলনে মাত্র ক্লাস ফাইভে পড়ার সময়ই প্রথম মিছিলে অংশগ্রহণ করেন দেবুবাবু। স্লোগান ছিল— *“জান যায় প্রাণ যায়, বেরুবাড়ি ছাড়বো না”*। সেই থেকেই শুরু হয় তাঁর রাজনীতির পথচলা। কামারপুকুর রামকৃষ্ণ মিশনের ছাত্র ছিলেন দেবু চ্যাটার্জি। ক্লাস সিক্সে পড়ার সময় ধর্মঘটের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ক্লাসে পড়া বলতে অস্বীকার করেন তিনি। সেই কারণে হেডমাস্টার চিত্ত মহারাজ ও শিক্ষক প্রবীরদার হাতে বেতের আঘাত পান। রক্তপাত হলেও আদর্শচ্যুত হননি— ধর্মঘটের স্বার্থেই এক লাইন পড়াও বলেননি। তারপর শুরু হয় অমানবিক অত্যাচার, শেষকালে তিনি পড়া বলতে বাধ্য হন, রাজনীতির প্রতি এই অনুরাগ তাঁকে কংগ্রেস-ঘেঁষা পারিবারিক পরিবেশের মধ্যেও বামপন্থার দিকে টেনে আনে। ১৯৬০-এর দশকের শেষ দিকে, যখন চারিদিকে কংগ্রেসের প্রভাব, তখনই তিনি গোঘাটের ফরওয়ার্ড ব্লকের প্রার্থী অজিত সাহার প্রচারে ঝাঁপিয়ে পড়েন। দুপুরবেলায় অন্যরা বিশ্রাম নিলে, দেবুবাবু একা উনুনে আঠা তৈরি করে এলাকায় পোস্টারিং করতেন— নিঃস্বার্থভাবে, নিঃশব্দে।১৯৬৮ সালে কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ভেটেনারি পড়াশোনা শুরু করেন। সেখানেই ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় হন— প্রথমে কালচারাল সেক্রেটারি, পরে গেমস সেক্রেটারি এবং অবশেষে কলেজের জেনারেল সেক্রেটারি নির্বাচিত হন। ১৯৭০ সালের আগস্টে আনুষ্ঠানিকভাবে পার্টির সদস্যপদ পান। ১৯৭২ সালে কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পর কলেজ জীবনে নানাভাবে আক্রমণের শিকার হন তিনি। তবু পিছিয়ে যাননি। ১৯৭৫ সালে ভেটেনারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সাইফুদ্দিন চৌধুরীর সংস্পর্শে কিছুদিন কাটান। ১৯৭৬ সালে বাড়ি ফিরে এসে রাত্রিবেলায় পোস্টার লিখে দেয়ালে লাগানোই ছিল তাঁর নিয়মিত অভ্যাস।কামারপুকুর কলেজ মোড়ে প্রতিষ্ঠা করেন ‘জাগরণী সংঘ’, যা দেখতে সাধারণ ক্লাব হলেও মূল উদ্দেশ্য ছিল বাম আদর্শের প্রচার ও সংগঠন বিস্তার। ১৯৭৩ সালে ডাক্তার পরিতোষ বাবুর হাত ধরে হুগলি জেলা কমিটিতে যোগ দেন। ১৯৭৭ সালে তিনি হন লোকাল কমিটির সম্পাদক, ১৯৮০ সালে জেলা কমিটির সদস্য এবং তার আগেই ছিলেন জোনাল কমিটির সম্পাদক। ১৯৮৮ সালে কামারপুকুরে জেলা সম্মেলনের পর থেকে দীর্ঘদিন তিনি জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।মূলত কৃষক সংগঠনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন দেবুবাবু। সারা ভারত কৃষক সভার সদস্য এবং দুই দফায় হুগলি জেলা কৃষক সভার সভাপতি নির্বাচিত হন। বর্তমানে বার্ধক্যজনিত কারণে তিনি জেলা কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন।দেবু চ্যাটার্জির বক্তব্য, “এই ডিজিটাল যুগেও মানুষের সঙ্গে সরাসরি জনসংযোগই আসল লক্ষ্য হওয়া উচিত। বিকল্প বলতে কেবল বামপন্থীরাই প্রকৃত বিকল্প।’’ তাঁর মতে, আজও কৃষক আন্দোলনে গোঘাটের ভূমিকা গৌরবজনক। তিনি স্মরণ করেন, পাশের পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার কাতরা গ্রামের পার্টি নেতা নিতাই মণ্ডলের বাড়িতে প্রায়ই আসতেন কমরেড বিনোদ দাস। সেখান থেকেই গোঘাটের বদনগঞ্জ, শ্যামবাজারসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় পার্টির সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন তাঁরা। বর্তমানে পার্টির আর্থিক শৃঙ্খলার কথাও উল্লেখ করেন দেবুবাবু— “প্রত্যেক সদস্যের আয়ের নির্দিষ্ট অংশ পার্টিতে লেবি হিসেবে দিতে হয়। না দিলে সদস্যপদ রাখা যায় না। পার্টির শৃঙ্খলার বাইরে কেউ থাকতে পারে না।”রাজ্য ও জাতীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপটে তিনি বলেন, “তৃণমূল ও বিজেপি— দুই দলই ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতি করছে। প্রতিযোগিতামূলক সম্প্রদায়িকতা চলছে। মানুষের রুটি-রুজি, জীবন-জীবিকার সমস্যা থেকে মনোযোগ সরিয়ে রাখা হচ্ছে।”তিনি আরও যোগ করেন, “সরকারি অর্থে দীঘায় জগন্নাথ মন্দির নির্মিত হয়েছে, বিভিন্ন স্থানে দাঙ্গা ঘটেছে— তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে বোঝাপড়া স্পষ্ট। তাই একমাত্র বিকল্প বামফ্রন্ট।SIR প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “দেশের একটি বৈধ নাগরিকও যেন ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়, সেটাই আমাদের লক্ষ্য।” ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রস্তুতি প্রসঙ্গে জানান, “অধিকাংশ পার্টি অফিস খুলে গেছে, বাকি অফিসগুলোও দ্রুত খোলা হবে।” কংগ্রেসের সঙ্গে জোট প্রসঙ্গে বলেন, “এটি পার্টির সর্বোচ্চ নেতৃত্ব ঠিক করবে। তবে আমাদের মূল লক্ষ্য বিজেপির অপসারণ ও শক্তিশালী বিরোধী জোট গঠন।”এই বয়সেও একাগ্রতা, আত্মনিবেদন ও আদর্শের প্রতি অনুরাগে অটল কমরেড দেবু চ্যাটার্জি যেন এক জীবন্ত প্রেরণা— আজকের তরুণ প্রজন্মের কাছে এক অমূল্য শিক্ষার দৃষ্টান্ত।
![]()

More Stories
বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের লড়াই আজও প্রাসঙ্গিক — আরামবাগের সিপিআইএমের নেতা সমীর চক্রবর্তীর অভিজ্ঞতায় উঠে এল সংগঠনের বাস্তবতা
আধুনিক প্রযুক্তির যুগে পড়ুয়া সংকটে গোঘাটের লাইব্রেরিগুলি – পাঠক টানতে উদ্যোগের খোঁজে গ্রন্থাগারগুলি
কোলাহলের মাঝেই চলছে অখণ্ড হরিনাম— হুগলির বদনগঞ্জের কয়াপাট বাজারের মন্দিরে ৪৬ বছরের ঐতিহ্য