November 30, 2025

তিন শতাব্দীর ঐতিহ্য – সামন্তখণ্ড চক্রবর্তী পরিবারের রাসযাত্রা উৎসব

সোমালিয়া ওয়েব নিউজ: হুগলি জেলার অন্তর্গত এক ছোট অথচ ঐতিহ্যবাহী গ্রাম সামন্তখণ্ড। এই গ্রামের চক্রবর্তী পাড়া-তেই প্রায় তিন শতাধিক বছর ধরে অটুট রয়েছে এক অনন্য আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য — শ্রীকৃষ্ণের রাসযাত্রা উৎসব। প্রতি বছর কার্তিক মাসের পূর্ণিমা তিথিতে, অর্থাৎ শ্রীরাসপূর্ণিমা-য় তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হয় এই উৎসব।

সন্ধ্যা নামলেই চক্রবর্তী পরিবারের প্রাঙ্গণে সাজানো হয় সুসজ্জিত রাসমঞ্চ। নানা রঙের ফুল, আলো আর শিল্পিত সাজসজ্জায় মুখরিত হয়ে ওঠে রাসফুলের মহিমা। সন্ধ্যার পর ব্রাহ্মণগণ গঙ্গাজল দিয়ে রাধা-কৃষ্ণের বিগ্রহকে স্নান করিয়ে , নতুন বস্ত্র পরিধান করিয়ে, ফুলে ও গন্ধে অলঙ্কৃত করেন। এরপর রাধা-কৃষ্ণ যুগলকে কোলে ধারণ করে পরিবেশিত হয় মনোমুগ্ধকর  রাসনৃত্য।

মন্দির চত্বর তখন একেবারে উৎসবমুখর—ঢাক, ঢোল, করতাল, বাঁশি আর শঙ্খধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে চারদিক। ব্রাহ্মণগণ রাধা-কৃষ্ণকে পরিবেষ্টন করে ধূপ, দীপ, চামর ও বিভিন্ন উপাচারে সম্পূর্ণ করেন পূজার্চনা। তারপর রাসমঞ্চে বিগ্রহ স্থাপন করে, করা হয় রাস প্রতিষ্ঠা। এই অনুষ্ঠানকে ঘিরে গোটা গ্রাম যেন ডুবে যায় এক মায়াবী, আধ্যাত্মিক আবেশে।

চক্রবর্তী পরিবারের প্রবীণ সদস্য স্বপন কুমার চক্রবর্তী থেকে জানা যায় প্রায় ১৬৭০ খ্রিষ্টাব্দে বর্ধমান রাজ্যের মহারাজ বিজয় মাহাতোর অধীনে কর্মরত ছিলেন কমলাকান্ত চক্রবর্তী নামে এক বিদ্বান পুরোহিত। তাঁর কর্মনিষ্ঠায় খুশি হয়ে মহারাজ তাঁকে সামন্তখণ্ড মৌজা উপহার দেন এবং কমলাকান্ত চক্রবর্তীকে এই সামন্ত খন্ডে বসবাস করতে দিয়েযান। শুধু জমিই নয়—সঙ্গে দিয়েছিলেন রাধাকান্ত ঠাকুর, রাধিকা ও শ্রীবিষ্ণুর মূর্তি।

মহারাজ নিজ হাতে সেই বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করে বলেন, “এই পরিবারই দেবতার সেবায় চিরকাল নিয়োজিত থাকবে।” সেই থেকেই শুরু হয় চক্রবর্তী পরিবারের আদি রাস ও দোল উৎসবের পরম্পরা, যা আজও অব্যাহত আছে প্রায় সাড়ে তিন শতাব্দী ধরে।

এই সময়ে চক্রবর্তী পরিবারের সদস্যরা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ফিরে আসেন পৈতৃক ভিটেতে। উপস্থিত থাকেন বহু *বযাজমান, শিষ্য ও ভক্ত। শুধু হুগলি বা বর্ধমান নয় — পশ্চিমবঙ্গের বাইরের রাজ্য থেকেও বহু মানুষ আসেন এই অনন্য রাসযাত্রা উৎসব দেখতে।

উৎসবের অন্যতম অংশ মা শীতলা দেবী-র উপস্থিতি। কথিত আছে, প্রাচীনকালে সামন্তখণ্ডের ষোল আনার দেবী ছিলেন শীতলা মা। তাঁদের বংশলুপ্তির পর গ্রামবাসীরা সিদ্ধান্ত নেন — দেবীকে চক্রবর্তী পরিবারের মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করা হবে। চক্রবর্তী পরিবারে ছ মাস থাকবেন এবং মুখার্জি পরিবারে সমাজ থাকবেন শীতলা মাতা। সেই পরম্পরাই আজও অটুট। উৎসব চলাকালীন এই চক্রবর্তী পরিবারে তিনদিন অন্যকূট অনুষ্ঠান ও প্রসাদ বিতরণ হয়।

চক্রবর্তী পরিবারের বংশলতিকা ও ঐতিহ্যের ইতিহাস মন্দিরের দেয়ালে রয়েছে। গ্রামের প্রবীণরা বলেন, “এই উৎসব আমাদের গ্রামের প্রাণ। যতদিন রাধা-কৃষ্ণ থাকবেন, ততদিন এই রাসযাত্রা চলবে।”

তিন শতাব্দীর ঐতিহ্য, ভক্তির আবেগ ও সমাজের মিলন — সব মিলিয়ে সামন্তখণ্ডের রাসযাত্রা আজ শুধু এক পারিবারিক উৎসব নয়, বরং গ্রামীণ বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জীবন্ত দলিল।

Loading