November 30, 2025

সাংবাদিকতা আজ আক্রমণের নিশানায় — গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ কি ভেঙে পড়ছে?

সোমালিয়া ওয়েব নিউজঃ ভারতের গণতন্ত্রের চারটি স্তম্ভ হলো আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ এবং গণমাধ্যম। এই তিনটি স্তম্ভ (আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ) সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত এবং ক্ষমতা পৃথকীকরণের নীতি অনুসরণ করে, যেখানে গণমাধ্যমকে চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা সরকার ও জনগণের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সাহায্য করে।
আইনসভা (Legislature): আইন প্রণয়ন করে এবং দেশের শাসনকার্য পরিচালনা করে।
নির্বাহী বিভাগ (Executive): আইন কার্যকর করে এবং শাসনকার্য পরিচালনা করে।
বিচার বিভাগ (Judiciary): আইন ব্যাখ্যা করে এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে।
গণমাধ্যম (Media): গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত হয় এবং তথ্য সরবরাহ, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং জনগণের মতামত তুলে ধরার মাধ্যমে সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখে।

উপরাষ্ট্রপতি সি. পি. রাধাকৃষ্ণন সম্প্রতি সংবাদমাধ্যম সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করে বলেছেন—গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে সংবাদমাধ্যমের স্বদর্থক ভূমিকা আজ দেশের গঠনে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তিনি আরও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ডিজিটাল যুগে বিভ্রান্তিমূলক তথ্য ও ভুল খবর নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে। কিন্তু বাস্তবে দাঁড়িয়ে দেখা যাচ্ছে, ভারতসহ বিশ্বের বহু দেশে সাংবাদিকদের ওপর আক্রমণ, হয়রানি এবং দমন-পীড়ন ভয়াবহভাবে বেড়েছে।

মাঠে নেমে খবর সংগ্রহ করা আজ সাংবাদিকদের জন্য এক অদৃশ্য যুদ্ধ। রাজনৈতিক সংঘর্ষ হোক বা প্রশাসনিক দুর্নীতি—যেখানেই তথ্যের সন্ধান, সেখানেই আক্রমণের ঝুঁকি।

  • খবর করতে গেলে শারীরিক হামলা,
  • ক্যামেরা ভাঙা,
  • মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়া,
  • ভিডিও ডিলিট করে দেওয়া —
    এসব আজ প্রায় নিয়মিত ঘটনা।

এ যেন স্পষ্ট বার্তা—‘সত্য ভিডিও কোরো না, সত্য লিখো না।’

সাম্প্রতিক সময়ে আরেকটি বিপজ্জনক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে—
সত্যি ঘটনাকে তুলে ধরলেই সাংবাদিককে উল্টো অভিযুক্ত করে দেওয়া হচ্ছে।

  • আইটি আইন,
  • মানহানির অভিযোগ,
  • মিথ্যে অপরাধমূলক মামলা,
  • কিংবা অদ্ভুত সব অভিযোগে গ্রেপ্তারির হুমকি—
    এগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে সাংবাদিকদের নীরব করাতে।

এটি শুধু ব্যক্তির ওপর আক্রমণ নয়, এটি গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর সুচতুর আঘাত

সরাসরি আক্রমণ নয়, অনেকসময় সংবাদ সংগ্রহে ‘বাধা’ দেওয়া হয় প্রশাসনিক কৌশলে—

  • তথ্য না দেওয়া অথবা ঘুরিয়ে দেওয়া,
  • ঘটনাস্থলে প্রবেশ নিষেধ,
  • নির্দিষ্ট বিষয় ‘কভার না করতে’ মৌখিক নির্দেশ,
  • লাইভ চলাকালীন পুলিশি বাধা।

এগুলো কখনো আইনগত নয়, কিন্তু কার্যত সাংবাদিকতার স্বাধীনতাকে শিকলে বাঁধে।

সাংবাদিকতা আক্রান্ত হলে প্রথম ক্ষতিগ্রস্ত হয় জনগণের তথ্য জানার অধিকার
গণতন্ত্র শক্তিশালী হয় স্বচ্ছতার ওপর, আর সেই স্বচ্ছতার সবচেয়ে বড় বাহক সংবাদমাধ্যম। কিন্তু যখন সাংবাদিকই নিরাপদ নন, তখন

  • দুর্নীতি অপ্রকাশিত থাকে,
  • ক্ষমতার অপব্যবহার অদৃশ্য হয়ে যায়,
  • মিথ্যা বর্ণনা জনমত নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে।

এটি শুধু সংবাদমাধ্যমের সংকট নয়—এটি গণতন্ত্রের সংকট

কেন আক্রমণ বাড়ছে?

  1. ক্ষমতার প্রতি প্রশ্ন তোলায় অস্বস্তি
    — সত্য তুলে ধরার কাজটাই অনেককে অস্বস্তিতে ফেলছে।
  2. ডিজিটাল যুগে প্রচারের তীব্রতা
    — একবার সত্য প্রকাশ পেলে তা দ্রুত ভাইরাল হয়, তাই তা থামাতে ‘প্রথমেই আঘাত’।
  3. দুর্বল আইনি সুরক্ষা
    — সাংবাদিক রক্ষা আইন না থাকা বা অপর্যাপ্ত হওয়া।
  4. প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতা
    — অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় কর্তারা ক্ষমতার মদমত্ততায় সীমা অতিক্রম করেন।

উপরাষ্ট্রপতি রাধাকৃষ্ণনের বক্তব্য—সংবাদমাধ্যম গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ—আজ এক কঠিন বাস্তবতার সামনে দাঁড় করায় আমাদের।
যে স্তম্ভ ভেঙে পড়ছে প্রতিদিন, আক্রমণের পর আক্রমণে।
সত্য প্রতিষ্ঠার পথে বাধা যত বাড়ছে, গণতন্ত্র ততই নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে।

যদি সাংবাদিকতার নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা যায়, যদি সত্য বলার স্বাধীনতা বারবার আক্রমণের মুখে পড়ে—
তাহলে শুধু সাংবাদিক নয়, একটি দেশের গণতান্ত্রিক আত্মাই আহত হয়

সংবাদমাধ্যমকে রক্ষা করা মানে শুধু সাংবাদিককে নয়—
সত্য, স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্রকে রক্ষা করা।

Loading