November 30, 2025

Oplus_16908288

হাতুড়ে ডাক্তারি বনাম পাশ করা ডাক্তার—অরাজকতার জঞ্জালে বাংলার স্বাস্থ্যব্যবস্থা

সোমালিয়া ওয়েব নিউজ; হাতুড়ে ডাক্তার শব্দবন্ধ ব্যবহার করা নিয়ে বিতর্ক বহুদিনের। কিন্তু বিতর্কের আড়ালেই রয়েছে আরও গভীর বাস্তবতা—বাংলার স্বাস্থ্যব্যবস্থার এক বিস্তৃত অরাজকতা, যেখানে পাশ করা ডাক্তার থেকে শুরু করে গ্রাম-গঞ্জে সক্রিয় অপ্রশিক্ষিত চিকিৎসকেরাও নানা অনিয়মে জড়িয়ে পড়ছেন। এরই প্রেক্ষিতে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক প্রশ্ন উঠে এসেছে—হাতুড়ে ডাক্তাররা কি স্যালাইন দিতে পারেন? অ্যান্টিবায়োটিক লিখে দিতে পারেন? ঔষধ মজুদ করতে পারেন? উত্তর স্পষ্ট—আইনত এসবের কোনও দায়িত্ব বা অধিকার তাঁদের নেই। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। শহর ছাড়িয়ে গ্রামাঞ্চলে একবার ঢুকে পড়লেই স্পষ্ট হয়ে যায়—প্রায় ৪০ লক্ষেরও বেশি অপ্রশিক্ষিত ব্যক্তির ওপর ভরসাই গ্রামীণ মানুষের চিকিৎসা নির্ভরতার প্রধান ভিত্তি। অথচ দেশে রেজিস্টার্ড ডাক্তার মাত্র প্রায় ১০ লক্ষ। ফলে সিস্টেমের ঘাটতিই যেন অদক্ষ চিকিৎসকদের স্বভাবতই ‘স্বীকৃতি’ দিয়ে দিচ্ছে। পাশ করা ডাক্তারদের অনিয়মও প্রশ্নের মুখে, এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে পাশ করা ডাক্তারদের একাংশের অনিয়ম। অভিযোগ উঠেছে—বহু চিকিৎসকই চেম্বার চালালেও ক্লিনিকাল এস্টাবলিশমেন্ট আইন মানছেন না। ফি- র নির্দিষ্ট রসিদ দিচ্ছেন না। সরকারি স্তরে বেসরকারি চেম্বারের জন্য নির্দিষ্ট ফি কাঠামো না থাকায় সাধারণ মানুষ বাড়তি আর্থিক চাপে পড়ছেন। ফলে স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বিভ্রান্তি আর অসন্তোষ আরও বাড়ছে। চিকিৎসা নেওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের চোখে অনেক সময় পাশ করা ডাক্তার আর হাতুড়ে ডাক্তার—দু’জনকেই ‘অসম্পূর্ণ বিশ্বাসযোগ্যতা’র চশমায় দেখা হচ্ছে। ব্র্যান্ডেড ওষুধ বনাম জেনেরিক—বিভ্রান্তি ঘিরে আরও প্রশ্ন চিকিৎসাক্ষেত্রে আরেক বিতর্ক—ব্র্যান্ডেড না জেনেরিক, কোনটা কার্যকর? সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচলিত ধারণা, ব্র্যান্ডেড ওষুধই নাকি ‘নির্ভরযোগ্য’। কিন্তু বাস্তবে জেনেরিক ওষুধও একই সক্রিয় উপাদানে তৈরি।

এই সমস্ত বিষয়ে নিয়ে মতামত জানিয়েছেন কলকাতা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের ফার্মাকোলজির প্রাক্তন ডেমোনস্ট্রেটর, রুরাল মেডিকেল প্র্যাকটিশনার্স অ্যাসোসিয়েশন এবং সোসাইটি ফর সোশ্যাল ফার্মাকোলজির অন্যতম প্রধান ডা. স্বপন জানা। তিনি বলেন, ব্র্যান্ডেড কিংবা জেনেরিক—ওষুধ একই। কার্যকারিতা নির্ভর করে উৎপাদন মান, সংরক্ষণ আর সরকারি অনুমোদনের ওপর। নামের দাম বেশি বলে ওষুধের গুণ বেশি হবে—এ ধারণা বিভ্রান্তিকর। আর জি কর কাণ্ডে অভয়ার মৃত্যু স্বাস্থ্যব্যবস্থার নিরাপত্তা, নিয়ম এবং শৃঙ্খলাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। অনেকে ভুলভাবে তাঁকে “বিশেষ ডাক্তার” বলে উল্লেখ করলেও বাস্তবে তিনি ছিলেন একজন চিকিৎসা ছাত্রী, তখনো পড়াশোনা চলছিল, তবুও বাইরে চেম্বার করে ফি নেওয়া—যা আইনি দৃষ্টিতে অপরাধ। এই ঘটনাকেও ব্যবহার করে কেউ কেউ ‘হাতুড়ে বনাম পাশ করা ডাক্তার’-এর তুলনা টানতে চাইছেন। কিন্তু ডা. স্বপন জানার মতে— আইন ভাঙা মানে অনাচার। পাশ করা ডাক্তার হোন বা অদক্ষ চিকিৎসক—দু’ক্ষেত্রেই ঝুঁকি একই রকম।

ডা. স্বপন জানার বিশ্লেষণ: সমস্যার মূল কোথায়?

স্বাস্থ্যব্যবস্থার বিশৃঙ্খলার কারণ হিসেবে তিনি কয়েকটি দিক তুলে ধরেন—

1. প্রশিক্ষিত চিকিৎসকের ঘাটতি, ফলে গ্রামাঞ্চলে অদক্ষ চিকিৎসকদের ওপর নির্ভরতা।

2. আইনগত নিয়ন্ত্রণের অভাব।

3. পাশ করা চিকিৎসকদেরও শৃঙ্খলা-ভঙ্গ ও আর্থিক অনিয়ম।

4. ব্র্যান্ডেড ওষুধের অযথা প্রচার ও ব্যবসায়িক প্রভাব।

5. RMP/paramedic স্তরের সরকারি স্বীকৃত প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা অনুপস্থিত।

ডা. জানা মনে করেন—সমাধান হলো প্রশিক্ষণ, নিয়ন্ত্রণ ও স্বচ্ছতা। ব্যবস্থা ঠিক না হলে হাতুড়ে ডাক্তারও বাড়বে, পাশ করা ডাক্তারদের অনিয়মও। স্বাস্থ্যব্যবস্থার শক্ত ভিত না থাকলে সমাজের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ। হাতুড়ে ডাক্তার হোক বা পাশ করা ডাক্তার—দু’পক্ষেরই অনিয়ম আজ জনস্বাস্থ্যের বড় বিপদ। একদিকে অদক্ষতা, অন্যদিকে শৃঙ্খলাহীনতা—বাংলার চিকিৎসা পরিকাঠামোকে কার্যত দু’দিক থেকেই টেনে ধরছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে—এখন সময় এসেছে চিকিৎসা ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছতা এবং প্রশিক্ষিত জনবলের বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলার। নইলে এমন অরাজকতার শিকার হতেই থাকবে রোগী-পরিবার এবং সাধারণ জনগণ।

Loading