সোমালিয়া ওয়েব নিউজ; গ্রামবাংলার যোগাযোগ ও আর্থিক লেনদেনের অন্যতম ভরসার জায়গা ইন্ডিয়ান পোস্ট–এর শাখা পোস্ট অফিসগুলি। অথচ উন্নত প্রযুক্তির যুগে দাঁড়িয়েও দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন গ্রামীণ পোস্ট অফিসে পরিষেবা সংক্রান্ত একাধিক অভিযোগ জমে উঠছে। বিভিন্ন এলাকাবাসীর অভিযোগ—পোস্ট অফিস কবে, কয়টা থেকে খোলে বা কখন বন্ধ হয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা পোস্ট অফিসের সামনে দৃশ্যমানভাবে লেখা থাকে না। এমনকি পোস্টমাস্টার বা ডাক সেবকদের সঙ্গে জরুরি প্রয়োজনে যোগাযোগের জন্য কোনও অফিসিয়াল ফোন নম্বরও বাইরে উল্লেখ থাকে না। ফলে পরিষেবা সংক্রান্ত সমস্যায় পড়লেও স্থানীয় স্তরে দ্রুত যোগাযোগ বা সমাধানের পথ মেলে না।স্থানীয় গ্রাহকদের মতে, ডাক টিকিট, পোস্ট কার্ড, খামে ভরা স্ট্যাম্প–সহ নিত্য প্রয়োজনীয় ডাক সামগ্রী বহু সময়েই পাওয়া যায় না। পোস্ট অফিস থেকে টাকা তোলার ক্ষেত্রে ‘লিংক ফেলিওর’–এর সমস্যা সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। জমা–তোলার লেনদেনের বায়োমেট্রিক ডিভাইস থাকার কথা থাকলেও, সেগুলি প্রায়ই অচল অবস্থায় থাকে, অথবা প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে কাজ করে না। ব্যাংকিং পরিষেবাতেও আধুনিকীকরণ অসম্পূর্ণ—সঞ্চয় অ্যাকাউন্টের পাসবই এখনও হাতে লেখা হয়, টাকা জমা–তোলার ক্ষেত্রে অধিকাংশ পোস্ট অফিস থেকে কোনও প্রিন্টেড রসিদ বা রসিদ প্রিন্ট মেশিন–থেকে পাওয়া যায় না। মোদ্দা কথা, ডিজিটাল ইন্ডিয়ার যুগেও ‘ডিজিটাল রসিদ’ গ্রামীণ পোস্ট অফিসে ‘ঐচ্ছিক বিলাসিতা’র পর্যায়ে আটকে রয়েছে। এই বাস্তব চিত্র ও জন–অসন্তোষের প্রশ্ন নিয়েই আমরা মুখোমুখি হয়েছিলাম দক্ষিণবঙ্গ পোস্টমাস্টার জেনারেল ঋজু গাঙ্গুলি–র।
তিনি পোস্ট অফিসের ভূমিকা, সীমাবদ্ধতা এবং অভিযোগ–ব্যবস্থাপনার সরকারি পদ্ধতি নিয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেন।
কার্যসময় কত? অফিস কি ইচ্ছামত খোলা–বন্ধ হয়? দক্ষিণবঙ্গ পোস্টমাস্টার জেনারেল জানান, গ্রামীণ শাখা পোস্ট অফিসগুলির অনুমোদিত কার্যসময় সাধারণত ৫ ঘণ্টা। তবে বিশেষ ক্ষেত্রে—কাজের পরিমাণ যদি কম থাকে, বা পরিষেবা–চাহিদা সীমিত হয়—সে ক্ষেত্রে ঘণ্টা ৩ ঘণ্টা হতে পারে। তিনি আরও বলেন, সমস্ত পোস্ট অফিসে সরকারিভাবে সাইনবোর্ড থাকে এবং তাতে কার্যসময় উল্লেখও থাকে।
পোস্ট অফিসের সামনে স্টাফ–দের ফোন কেন নেই? এই প্রশ্নে ঋজু গাঙ্গুলি স্পষ্ট জানান—পোস্টমাস্টার বা ডাক সেবকদের ব্যক্তিগত বা অফিসিয়াল মোবাইল ফোন নম্বর বাইরে টাঙিয়ে রাখার কোনও সরকারি নির্দেশ বা প্রয়োজন নেই। তাঁর মতে, পোস্ট অফিস একটি পরিষেবা–কেন্দ্র, ‘হেল্পডেস্ক কল সেন্টার’ নয়। তবে পরিষেবার ঘাটতি, অনিয়ম বা আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত জটিলতা হলে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে লিখিত বা অনলাইন অভিযোগ জানালে, দপ্তর তা খতিয়ে দেখবে।
পোস্ট অফিসের সেভিংস–এর টাকা কি বিনিয়োগ হয়?গ্রামীণ মানুষের কাছে আর্থিক নিরাপত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ প্রশ্নে তিনি জানান—পোস্ট অফিসে সেভিংস অ্যাকাউন্টের জমা–কৃত অর্থ কোনও বেসরকারি সেক্টর বা বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে ইনভেস্ট করা হয় না। সম্পূর্ণ নগদ অর্থ রাজকোষ হিসাবে সরকারের হাতে সুরক্ষিত থাকে। অর্থাৎ, এটি সম্পূর্ণ কেন্দ্রীয় সরকারের দায় ও অধীনে সংরক্ষিত। আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য—পোস্ট অফিসের সুদের হার বা সুদ–নির্ধারণের ক্ষমতা থাকে সংসদের হাতে এবং সেই সুদের কাঠামো একটি আইনসিদ্ধ নীতিমালার মাধ্যমে নির্ধারিত হয়।
ব্যাংকের টাকা তুলতে পোস্ট অফিস কি সাহায্য করে? পোস্ট অফিসের সেবা–মাধ্যম—ইন্ডিয়ান পোস্টাল পেমেন্টস ব্যাংক–এর মাধ্যমে আধার–এনাবেল্ড পেমেন্ট সিস্টেম (AePS) ব্যবহার করে গ্রামের পোস্ট অফিস থেকেই অন্য ব্যাংকের টাকাও তোলা সম্ভব। তবে এর জন্য প্রয়োজন সক্রিয় আধার–লিঙ্ক, মোবাইল রেজিস্ট্রেশন ও কার্যকর ডিভাইস।
রসিদ কি সত্যিই দেওয়া হয়? দপ্তর জানাচ্ছে—লেনদেনের সময় গ্রামীণ পোস্ট অফিসে ব্যবহৃত হ্যান্ড ডিভাইস থেকে রসিদ বের হয় এবং তা গ্রাহককে দেওয়ার নিয়ম আছে। পাশাপাশি সঙ্গে সঙ্গেই গ্রাহকের রেজিস্টার মোবাইলে এসএমএস পাঠানো হয়। তবে অনুসন্ধানে বোঝা যায়, বহু পোস্ট অফিসে ডিভাইসের ত্রুটি, কালি কম থাকা, নেট সংযোগের ঘাটতি বা অপারেটর–এর প্রশিক্ষণের অভাবের কারণে এই রসিদ–প্রদান ‘নিয়ম’ কাগজেই আটকে আছে—বাস্তবে ‘সংযোগহীনতার শিকার’।
আধার পরিষেবা কেন অচল? বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের গ্রামে ইউনিক আইডেন্টিফিকেশন অথরিটি অফ ইন্ডিয়া–র পরিষেবা নিতে গিয়ে মানুষের ভোগান্তি চরমে। রাত থেকে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়েও সেবা–সংক্রান্ত কাজ না হওয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। ঋজু গাঙ্গুলি জানান, পোস্ট অফিসগুলিতে আধার পরিষেবা ব্যাহত হওয়ার অন্যতম কারণ ফান্ডের অভাব ও ডিফেক্টিভ ডিভাইস। পশ্চিমবঙ্গে আধার কিট–এর ৫০% যন্ত্র নষ্ট অবস্থায় পড়ে আছে। কিছু ডিভাইস স্টাফ–দের অপারেশনাল ভুল বা অসতর্ক ব্যবহারের কারণে ব্ল্যাকলিস্টেডও হয়ে গেছে। এই ঘাটতি দৈনন্দিন সেবাকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। আধার পরিষেবার জন্য রাত থেকে লাইন–সমস্যার সমাধান কি? এই বিষয়ে তিনি প্রস্তাব রাখেন—যদি আধার সংস্থা অনলাইন অ্যাপয়েন্টমেন্ট ব্যবস্থা গ্রামীণ পোস্ট অফিস স্তরেও কার্যকর করে, তাহলে রাত থেকে লাইনে দাঁড়ানো মানুষের ভোগান্তি কমবে এবং ‘আগে আসা–আগে সেবা’ নীতি পরিকল্পিতভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
ডাক সামগ্রী সাপ্লাই কি বন্ধ? গ্রামী ডাক ঘর গুলিতে ডাক টিকিট বা পোস্ট কার্ডের সাপ্লাই কমে যাওয়ার কারণ তিনি জানান—বর্তমানে ডিজিটাল যোগাযোগ–ব্যবস্থার কারণে পোস্ট কার্ড ও ডাক টিকিটের ব্যবহার দ্রুত কমছে। চাহিদা কম থাকায় দপ্তর নতুন করে সাপ্লাই বাড়াচ্ছে না। তবে গ্রামীণ পোস্ট অফিস থেকে পার্সেল বুকিং, স্পিড পোস্ট, রেজিস্টার্ড চিঠি–সহ অধিকাংশ পরিষেবা সচল আছে বলেই দাবি করেন তিনি।
বিমা পরিষেবা—জনপ্রচার কেন কম? গ্রামীণ জীবনের আর্থিক সুরক্ষার এক অনন্য দিক—ডাক জীবন বিমা এবং গ্রামীণ ডাক জীবন যোজনা–র সুবিধা অনেকেই জানেন না। ঋজু গাঙ্গুলি স্বীকার করেন, এই বিমা প্রকল্পগুলির পাবলিসিটি ও প্রচারণায় কিছু নীতিগত বাধ্যবাধকতা থাকায়, ব্যাপক জন–প্রচার সম্ভব হয়ে উঠছে না। তবে কম প্রিমিয়ামে উচ্চ বোনাস এবং আর্থিক নিরাপত্তার দিক থেকে ডাক জীবন বিমা গ্রামীণ এলাকায় আগের তুলনায় অনেকটাই জনপ্রিয়তা পেয়েছে বলেও জানান তিনি।
অভিযোগ কোথায়? কিভাবে?দপ্তরের পরামর্শ—পরিষেবা সংক্রান্ত সমস্যা হলে গ্রাহকরা সরাসরি ইন্ডিয়ান পোস্ট ওয়েবসাইটে অনলাইন অভিযোগ জানাতে পারবেন। তবে অভিযোগ গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রয়োজন ইমেইল আইডি ও ফোন নম্বর। স্থানীয় পোস্ট অফিসে যোগাযোগ না পাওয়ার বাস্তব সমস্যা থাকলেও, দপ্তর মনে করে, অভিযোগের ডিজিটাল ট্র্যাকিং–ব্যবস্থাই সর্বাধিক কার্যকর পথ।
পরিষেবা বনাম ব্যাখ্যার লড়াইয়ে সরকারি তথ্য একদিকে, বাস্তব অভিজ্ঞতার ভোগান্তি আরেকদিকে। সাধারণ মানুষ এবং অভিজ্ঞ মহল মনে করছেন ভারত সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর হল ইন্ডিয়ান পোস্ট। তাদের প্রশ্ন গ্রামীন পোস্ট অফিস গুলির পরিকাঠামোগত এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়ন কেন্দ্রীয় সরকার ইচ্ছা করলেই করতে পারেন। মানুষ যদি পোস্ট অফিস থেকে সমস্ত সুবিধা পরিষেবা পেতে পারে তাহলে অন্য কোন আর্থিক সংস্থার কাছে যেতে চাইবে না তাহলে কি সেই সমস্ত অদৃশ্যকারণের জন্যই পোস্ট অফিস গুলিকে কি অকার্যকরী করে রাখা? সরকারের উচিত এই ডিজিটাল ইন্ডিয়া যুগে ও অত্যন্ত দ্রুততার সাথে গ্রামীণ পোস্ট অফিস গুলিকে আরো উন্নতি করা এবং সাধারণ মানুষকে বিভিন্ন আর্থিক প্রতারণা সংস্থা থেকে মুক্ত রাখা। গ্রামীণ পোস্ট অফিসে পরিষেবার আধুনিকীকরণ চালু থাকলেও তা ‘অসমাপ্ত গল্প’—নেট সংযোগ, ফান্ড, প্রশিক্ষণ ও প্রচারের অভাবে পথে–ঘাটে মানুষ দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করছে—‘পোস্ট অফিস কি সত্যিই বদলেছে, নাকি শুধু বদলানোর ঘোষণা শুনি?’



![]()

More Stories
আরামবাগ শহরজুড়ে বেহাল রাস্তা: গর্ত, পাথর উঠে বিপজ্জনক চলাচল—দুর্ঘটনার আশঙ্কা রামকৃষ্ণ সেতুর স্বাস্থ্য নিয়েও উদ্বেগ, মার্চের মধ্যে কাজ শেষের আশ্বাস পিডব্লিউডি-র
আরামবাগে টেরাকোটার প্রাচীন মন্দিরগুলি ধ্বংসের মুখে
খানাকুলের গর্ব প্রদীপ্ত বাগ: ডব্লিউবিসিএস উত্তীর্ণ হয়ে ডিএসপি পদে মনোনীত