February 4, 2026

বিপ্লবী শহীদের জন্মদিন – বিস্মৃতির অতলে ঐতিহ্য

সোমালিয়া ওয়েব নিউজঃ অগ্নিযুগের বিপ্লবী, দেশের স্বাধীনতার লড়াইয়ে আত্মবলিদানের প্রতীক ক্ষুদিরাম বোস–এর জন্মদিন আজ। অবিভক্ত ভারতের তৎকালীন মেদিনীপুর জেলা–এর গ্রামীণ পরিবেশে ১৯ বছর বয়সেই যিনি দেশের জন্য হাসিমুখে মৃত্যুকে বরণ করেছিলেন, সেই বিপ্লবীর জন্ম ১৮৮৯ সালের ৩ ডিসেম্বর, বর্তমান পশ্চিম মেদিনীপুর জেলায়।

কিন্তু ১৩৬ বছর পর সেই দিনটি যেন সমাজের আলোকবৃত্তের বাইরে ক্রমেই ম্লান। ব্যস্ততার নাগপাশে আটকে পড়া আধুনিক নাগরিক জীবনে আজ আর তাঁর স্মরণ তেমনভাবে শোনা যায় না—এমনই অভিযোগ সাধারণ মানুষের মুখে মুখে।

আজ সকালে আরামবাগ শহরের ক্ষুদিরাম অনুশীলন কেন্দ্র–এ নিয়মরক্ষার আচার হিসেবে মাল্যদান পর্ব সম্পন্ন হলেও, কেন্দ্রের কর্মীরা জানালেন, “এই বিশেষ দিনে বড় অনুষ্ঠান আর হয় না।” তাঁদের কণ্ঠে আক্ষেপ স্পষ্ট—“জাতীয় বীরকে নিয়ে সারাদিনের চর্চা বা আলোচনাসভা হলে নতুন প্রজন্ম হয়তো চিনবে তাঁকে।”

আজ স্কুল ছুটির পরে আমরা পড়ুয়াদের কাছে প্রশ্ন রেখেছিলাম —“আজ কোন বিশেষ দিন জানো?” উত্তর এল বিস্ময়কর সরলতায়—এক ছাত্রী বলল, “না, জানি না।” এই চিত্র শুধু ছাত্র–ছাত্রীদের নয়, বহু শিক্ষিত নাগরিকও স্বীকার করছেন, বিনোদন ও ডিজিটাল ব্যস্ততায় ইতিহাসচর্চা আজ গৌণ।

সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই বিস্মৃতি নিছক তথ্যের অভাব নয়—এটি মূল্যবোধ ও ঐতিহাসিক শিকড় থেকে বিচ্ছিন্নতার প্রতিফলন।

আরামবাগের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ সমরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী জানান, “শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে উদ্যোগ নিতে হবে। শুধু পাঠ্যবইয়ের পাতায় নয়, আলোচনা, প্রদর্শনী, মঞ্চ-অনুষ্ঠান, স্মারক বক্তৃতার মাধ্যমে ইতিহাসকে জীবন্ত রাখতে হবে।”

এ বিষয়ে কথা হয় আরামবাগ বার অ্যাসোসিয়েশন–এর সম্পাদক বিশিষ্ট আইনজীবী সংগ্রাম সরকার–এর সঙ্গে। তিনি বলেন, “সমাজে সামগ্রিক অবক্ষয় নেমেছে। আমরা নতুন সিনেমা, সিরিয়াল, খেলার আপডেট মনে রাখি, কিন্তু শহীদের আত্মত্যাগ ভুলে যাই। এটি দুর্ভাগ্যজনক।” তাঁদের বক্তব্যে উঠে আসে একই দাবি—“এই ধরনের বিশেষ দিন যদি রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন বাধ্যতামূলক করা হয়, তবেই সমাজ নিজেদের শিকড়ে ফিরতে পারবে।”

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ সমরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী এই বিষয়ে এক প্রস্তাবও উত্থাপন করেছেন—শহীদের জন্ম ও আত্মবলিদান দিবস উপলক্ষে জেলা-স্তরে শিক্ষার্থী সম্মেলন, ঐতিহাসিক কুইজ, নাট্য-আলেখ্য, প্রবন্ধ প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনী আয়োজনকে সরকারি কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করা হোক।

স্থানীয় সমাজকর্মী ও সংস্কৃতিকর্মীরাও বলছেন, শুধু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না, সেই আইন বাস্তবায়নের নজরদারিও জরুরি।

গবেষকরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ১৯০৮ সালে মুজাফফরপুর বোমা মামলা–এ ধরা পড়ার পর যখন তাঁকে ফাঁসি দেওয়া হয়, ব্রিটিশ প্রশাসন পর্যন্ত তাঁর দৃঢ়তা ও দেশপ্রেমে বিস্মিত হয়েছিল। অথচ স্বাধীন ভারত, ডিজিটাল যুগ, প্রগতিশীল সমাজ—সব মিলিয়ে আজ তাঁর মূল্যায়নে যেন নীরবতা।

সমাজের প্রশ্ন – আমাদের দায় কার কাছে?

  • দেশ কি তার বীরদের ঠিকভাবে স্মরণ করছে?
  • শিক্ষিত প্রজন্ম কেন জানে না তাঁর আত্মত্যাগের গল্প?
  • বিনোদনের ভিড়ে কি আমরা মূল্যবোধ হারাচ্ছি?

সমাধানের প্রস্তাব

  1. শহীদ-দিবসগুলি সরকারি ঘোষণার মাধ্যমে বাধ্যতামূলক উদযাপন
  2. স্কুল-কলেজ স্তরে ইতিহাস সচেতনতা কর্মসূচি
  3. জেলা ও মহকুমা স্তরে জনসাধারণের অংশগ্রহণে স্মরণসভা
  4. বিপ্লবীদের জীবন নিয়ে সাংস্কৃতিক প্রদর্শনী ও গবেষণা উৎসাহ
  5. মোবাইল–নির্ভর বিনোদনের বাইরে এসে ইতিহাস সংরক্ষণে সামাজিক দায়বদ্ধতা

সমাজ এগিয়ে চলে, যুগ বদলায়—এ সত্য। কিন্তু বীরদের বিস্মৃতি মানে জাতিগত আত্মপরিচয়ের ক্ষয়।
দেশের মুক্তিসংগ্রামের এই কণ্ঠ ক্ষুদিরাম বোস–এর স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখা শুধু সরকারি দায় নয়—এটি জাতীয় বিবেকের দায়

আজ তাঁর জন্মদিনে আরামবাগের বহু প্রবীণ নাগরিক, আইনজীবী ও শিক্ষাবিদদের কণ্ঠে একই বার্তা—
“ইতিহাস ভুললে ভবিষ্যৎ পথ হারাবে।”

Loading