February 4, 2026

আজ বিশ্ব মৃত্তিকা দিবস, গোঘাটে বিশেষ আলোচনা সভা

সুস্থ মাটি, সুস্থ শহর’ – নগরায়নের মুখে মাটির স্বাস্থ্যরক্ষার ডাক

সোমালিয়া ওয়েব নিউজ; আজ, ৫ ডিসেম্বর, বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে বিশ্ব মৃত্তিকা দিবস (World Soil Day)। প্রতি বছর এই দিনটি পালনের মূল লক্ষ্য হলো মাটির গুরুত্ব সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং একটি সুস্থ বাস্তুতন্ত্র বজায় রাখার জন্য মাটির সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনার পক্ষে সওয়াল করা। এই বছর ২০২৫ সালের প্রতিপাদ্য হলো: ‘Healthy Soils for Healthy Cities’ বা ‘সুস্থ মাটি, সুস্থ শহর’, যা নগরায়নের দ্রুত প্রসারের প্রেক্ষাপটে মাটির অনিবার্য ভূমিকার ওপর আলোকপাত করেছে।  এই দিনটিকে নিয়ে আজ একটি বিশেষ আলোচনা সভা করে গোঘাট এক নম্বর ব্লকের কৃষি দপ্তর। বিশেষ সভাতে উপস্থিত ছিলেন ব্লকের অ্যাসিস্ট্যান্ট ডাইরেক্টর অফ এগ্রিকালচার- সৌরভ বর্মন, কৃষি কর্মাধ্যক্ষ -মানসী ঘোষ, অ্যাসিস্ট্যান্ট ডাইরেক্টর অফ এগ্রিকালচার, সাবজেক্ট ম্যাটার স্পেশালিস্ট, আরামবাগ -বাবলু কুমার সাঁতরা ও অন্যান্য কৃষক বন্ধুরা। আধিকারিকরা আলোচনাতে মূলত জানান কৃষি জমিতে রাসায়নিক সারের বদলে জৈব সার দিয়ে চাষ করতে হবে। তিন ফসলী জমিতে ধারাবাহিকভাবে একই ফসল চাষ না করে ফসল পরিবর্তন করে চাষ করতে হবে। অতিরিক্ত রাসায়নিক সার প্রয়োগের ফলে জমির পিএইচ মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে।  পি এইচ মাত্রা বজায় রাখতে জমিতে ধনচে গাছের চাষ করতে হবে। ধানের নাড়া না পুড়িয়ে বিকল্প পদ্ধতিতে জৈব সারের রূপান্তরিত করতে হবে অথবা বিশেষ মেশিনের দ্বারা বান্ডিল পদ্ধতিতে গৃহ কার্যে ব্যবহার করতে হবে। বিশেষ সাক্ষাৎকারে সৌরভ বাবু জানান এই রাসায়নিক এবং কীটনাশক সার চাষি ভাইদের শরীরে বিভিন্ন রকম মারণব্যাধির জন্য দায়ী। রাসায়নিক সার ব্যবহার না করে জৈব পদ্ধতিতে চাষ এবং জমিতে এজোলা চাষ করার জন্য চাষীদের অনুরোধ করেন। একই সাথে নিয়মিত কৃষি জমির মাটি পরীক্ষার জন্য নির্দেশ দেন। মাটির স্বাস্থ্য দেখে সেই রিপোর্ট অনুযায়ী কৃষি দপ্তর থেকে সঠিক পরামর্শ পাওয়া যাবে। তিনি বলেন এই মাটি পরীক্ষা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চালু আছে। বাবলু বাবু জানান অন্যান্য রাজ্যের মত এই রাজ্য এম এস পি চালু করা উচিত। এমএসপি চালু হলে তবেই চাষিরা তাদের ফসলের সঠিক দাম পাবে। এ বিষয়ে কৃষকদের সচেতনতা হওয়ার প্রয়োজন আছে। রাসায়নিক সার প্রয়োগ করে কৃষিকার্য করলে ভবিষ্যতে ফলন আরো কমে যাবে। উর্বর মাটি ধীরে ধীরে বন্ধ্যা হয়ে যাবে। এমন একটা দিন আসবে যখন আর ফসল ফলবে না, তাই আগে থেকেই মাটির স্বাস্থ্যের কথা ভেবে জৈব পদ্ধতিতে চাষাবাদ করা প্রয়োজন। কৃষি কর্মাধ্যক্ষ মানসী ঘোষ জানান আগের থেকে নাড়া পোড়ানো অনেকটাই কমেছে। তবে চাষীদের আরো সচেতন হওয়ার প্রয়োজন আছে, সময়ে সময়ে মাটি পরীক্ষা এবং কৃষি আধিকারিকদের পরামর্শ অনুযায়ী চাষাবাদ করতে হবে। 

🌱 মাটির গুরুত্ব ও এবারের প্রতিপাদ্য

মাটি কেবল চাষাবাদের ভিত্তি নয়, এটি পৃথিবীর উপরিভাগের এক অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ, যা খাদ্য নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, জল পরিশোধনে এবং সামগ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। একটি স্বাস্থ্যকর মৃত্তিকা অগণিত অণুজীব, কেঁচো এবং অন্যান্য ক্ষুদ্র প্রাণীর আবাসস্থল, যা পুষ্টিচক্র, কার্বন সংরক্ষণ এবং জল ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় সহায়ক।

২০২৫ সালের এই প্রতিপাদ্যটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ কারণ বিশ্বের ৫৫ শতাংশেরও বেশি মানুষ এখন শহরে বসবাস করে এবং ২০৫০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা ৭০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। ক্রমবর্ধমান নগরায়নের ফলে কংক্রিট এবং অ্যাসফল্টের নিচে মাটি ‘সিল’ হয়ে যাচ্ছে, যার ফলস্বরূপ জল শোষণের ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে, ভূগর্ভস্থ জলের স্তর কমছে, এবং জলাবদ্ধতা বাড়ছে। এছাড়াও, শিল্প ও গৃহস্থালি বর্জ্য থেকে নির্গত দূষক পদার্থ মাটির স্বাস্থ্যকে চরমভাবে বিপন্ন করছে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO)-এর উদ্যোগে এবং থাইল্যান্ডের রাজার জন্মদিনে সম্মান জানাতে ৫ ডিসেম্বর দিনটিকে বিশ্ব মৃত্তিকা দিবস হিসেবে পালনের প্রস্তাব করা হয়। ২০১৩ সালের ২০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৬৮তম অধিবেশনে এই দিনটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ব মৃত্তিকা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ২০১৪ সালে প্রথমবার বিশ্ব মৃত্তিকা দিবস পালিত হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শহুরে এলাকায় মাটির অবনতি খাদ্য নিরাপত্তা, বায়ুর গুণমান, জল ব্যবস্থাপনা এবং সামগ্রিকভাবে জনস্বাস্থ্যকে হুমকির মুখে ফেলছে। মাটির জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের ফলে শহরের বাস্তুসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে, ‘সুস্থ মাটি, সুস্থ শহর’ স্লোগানটি আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, টেকসই নগর উন্নয়ন এবং মানবকল্যাণের জন্য মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা অপরিহার্য।

এই দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি সংস্থা এবং কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলি সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য সেমিনার, কর্মশালা, এবং আলোচনা সভার আয়োজন করেছে। কৃষকদের পাশাপাশি শহরের সাধারণ মানুষের মধ্যেও মাটির সংরক্ষণ এবং দূষণমুক্ত করার বিষয়ে বার্তা ছড়িয়ে দেওয়াই এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য। সুস্থ মাটি সুরক্ষার অঙ্গীকার নিয়ে আজ বিশ্বজুড়ে এই দিবসটি পালিত হচ্ছে।

Loading