February 4, 2026

ডাঃ রবীন বর্মন

হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা বিজ্ঞানের জগতে লেগে থাকার পঞ্চাশ বছর
(১৯৭৫–২০২৫)

সোমালিয়া ওয়েব নিউজঃ ডাঃ রবীন বর্মনের জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে কলকাতার গত অর্ধশতকের ইতিহাস। ১৯৭৪ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর ছাত্রজীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শেষ হয়। সেই সময় ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আজকের মতো পারিবারিক দিকনির্দেশ বা সুসংহত পরিকল্পনার চল ছিল না। কোন কলেজে ভর্তি হবেন, কী বিষয়ে পড়বেন—এই অনিশ্চয়তা নিয়েই তাঁর কলকাতা যাত্রা শুরু।

পশ্চিমবঙ্গের সোনাখালি গ্রামের বাসিন্দা রবীন বর্মনের সহপাঠী হিমাংশুর হাত ধরেই কলকাতায় আসা। হিমাংশুর দাদা তখন কলকাতায় বিএসসি পড়তেন এবং থাকতেন আর্মহাস্ট স্ট্রিট থানার কাছে পঞ্চানন ঘোষ স্ট্রিটের একটি পুরনো ছাত্রাবাসে—বাণীভবন। মাত্র ১৫–২০টি আসনের সেই মেসে জায়গা পাওয়া সহজ ছিল না। বয়সে ছোট হওয়ায় সিনিয়র ছাত্রদের স্নেহে কোনওমতে থাকার ব্যবস্থা হয়। এখানেই গড়ে ওঠে তাঁর সংগ্রামী ছাত্রজীবনের ভিত।

পরবর্তীতে সেন্ট পলস কলেজের অন্তর্গত সেন্ট ডেভিড হোস্টেলে স্থানান্তরিত হন তিনি। কিছুটা স্থায়িত্ব এলেও তিন বছর পর সেই হোস্টেলও খালি করতে হয়। তখন তিনি ডিএমএস (হোমিওপ্যাথি)-এর ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র। জীবিকার প্রয়োজনে প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রছাত্রীদের কোচিং পড়াতে শুরু করেন—মাসিক পারিশ্রমিক মাত্র ২৫ টাকা। এই সময়েই বেলঘরিয়ার গৌর গুহর সঙ্গে পরিচয়, যার হাত ধরে প্রথম বেলঘরিয়া যাত্রা। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে আত্মনির্ভরতার পথে এগিয়ে যান তিনি।

কলকাতা ও গড়ে ওঠা এক চিকিৎসক মন

১৯৭৫ সাল থেকে কলকাতা ডাঃ রবীন বর্মনের কাছে হয়ে ওঠে এক জীবন্ত পাঠশালা। গ্রামবাংলা থেকে আসা এক তরুণের চোখে মহানগর ছিল বিস্ময়ের। সিঙ্গাপুরি কলা, কেক, আধুনিক চুল কাটার রীতি—সবই ছিল নতুন অভিজ্ঞতা। এই বিস্ময়ের মধ্য দিয়েই তাঁর মনোজগৎ প্রসারিত হয়।

সুরেন্দ্রনাথ কলেজে পড়াশোনার সময় তিনি প্রত্যক্ষ করেন ছাত্ররাজনীতির উত্তাল পরিবেশ—এসএফআই, ছাত্র পরিষদ, ডিএসও, পিএসইউ-র পোস্টার আর মিছিলে মুখর কলেজ চত্বর। শিয়ালদহ স্টেশনের পুরনো রূপ, ডবল ডেকার বাস, ট্রামযাত্রা, ৭৫ পয়সার সিনেমার টিকিট—সবই তাঁর স্মৃতিতে অমলিন।

এক টাকায় সবজিভাত, এক টাকার দই, কলেজ স্ট্রিটের বাজার, সন্তোষের মিষ্টির দোকান—এইসব ছোট ছোট অভিজ্ঞতার মধ্যেই গড়ে উঠেছিল সাধারণ মানুষের জীবনের প্রতি তাঁর গভীর সংযোগ। যা পরবর্তীতে তাঁর চিকিৎসক জীবনের মূল ভিত্তি হয়ে ওঠে।

শহর বদলেছে, মানুষ বদলায়নি

ডাঃ রবীন বর্মন খুব কাছ থেকে দেখেছেন কলকাতার রূপান্তর—উল্টাডাঙ্গা থেকে বিধাননগর, সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ের পাতাল রেল, সল্টলেক সেক্টর ফাইভের উত্থান, বাইপাসের পরিবর্তন। আবার দেখেছেন হারিয়ে যাওয়া বহু নামী হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসালয়, বদলে যাওয়া পথচলা, লোহার রেলিংয়ে ভাগ হয়ে যাওয়া রাস্তা।

তবু এই পরিবর্তনের মধ্যেও তিনি বিশ্বাস করেন—কলকাতা থাকবে, তার ইতিহাস থাকবে। হয়তো একদিন মানুষ বদলে যাবে, স্মৃতির পাতায় হারিয়ে যাবে অনেক নাম, কিন্তু শহরের আত্মা থেকে যাবে।

ডাঃ রবীন বর্মনের জীবন কেবল একজন চিকিৎসকের জীবনী নয়—এটি এক সময়ের কলকাতার দলিল। সংগ্রাম, শিক্ষা, মানবিকতা আর স্মৃতির শহরের সঙ্গে সহাবস্থানের এক নিরব কাহিনি।
তিনি আজও বিশ্বাস করেন—

ইতিহাস থাকে, শহর থাকে—
শুধু মানুষই একদিন ইতিহাসের বাইরে চলে যায়।

Loading