সোমালিয়া ওয়েব নিউজঃ নিপাহ ভাইরাস (Nipah Virus বা NiV) একটি অত্যন্ত সংক্রামক ও প্রাণঘাতী ভাইরাস, যা Paramyxoviridae পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। এই ভাইরাসটি প্রথম শনাক্ত হয় ১৯৯৯ সালে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে, যেখানে সংক্রামিত শূকরের সংস্পর্শে আসা মানুষের মধ্যে এনসেফালাইটিস ও ফুসফুসের মারাত্মক সংক্রমণের প্রাদুর্ভাব দেখা গিয়েছিল।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নিপাহ ভাইরাস মূলত প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে ছড়ালেও, পরবর্তীকালে মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণের ঘটনাও একাধিকবার নথিভুক্ত হয়েছে। ফলে এই ভাইরাস জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে বড়সড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
কীভাবে ছড়ায় নিপাহ ভাইরাস
নিপাহ ভাইরাস সাধারণত বাদুড়, শূকর ও ঘোড়ার মতো সংক্রামিত প্রাণীর সঙ্গে সরাসরি সংস্পর্শে এলে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে।
মালয়েশিয়ার প্রাদুর্ভাবে সংক্রমণের মূল উৎস ছিল শূকর, আর ফিলিপাইনে সংক্রমণের সঙ্গে যুক্ত ছিল ঘোড়া, যা মধ্যস্থতাকারী বাহক হিসেবে কাজ করেছিল।
বাংলাদেশে প্রতি বছর যে নিপাহ প্রাদুর্ভাব দেখা যায়, তার অন্যতম কারণ হিসেবে ফলের বাদুড়ের মলমূত্রে দূষিত কাঁচা খেজুরের রস পান করাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। ভারতের শনাক্ত নিপাহ ভাইরাসের ধরন বাংলাদেশের নিপাহ ভাইরাসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কযুক্ত বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
এছাড়াও, আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে পরিবারের সদস্য ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণের ঘটনাও ঘটেছে।
লক্ষণ কী কী
নিপাহ ভাইরাস সব বয়সের মানুষকে আক্রান্ত করতে পারে। সাধারণত ভাইরাসে সংক্রমণের ৫ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে লক্ষণ দেখা দেয়।
প্রাথমিকভাবে জ্বর ও তীব্র মাথাব্যথা দেখা যায়। এরপর ধীরে ধীরে তন্দ্রাচ্ছন্নতা, বিভ্রান্তি ও মানসিক অসংলগ্নতা শুরু হয়, যা দ্রুত কোমায় পরিণত হতে পারে। আক্রান্তদের প্রায় অর্ধেকের মধ্যেই শ্বাসকষ্ট দেখা যায়।
১৯৯৮-৯৯ সালে মালয়েশিয়ার প্রাদুর্ভাবে হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের প্রায় ৪০ শতাংশের মৃত্যু হয়েছিল। অনেক ক্ষেত্রে রোগ সেরে গেলেও দীর্ঘমেয়াদে খিঁচুনি, ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন ও গুরুতর স্নায়বিক জটিলতা থেকে যেতে পারে।
রোগ নির্ণয়
নিপাহ ভাইরাস শনাক্ত করতে তীব্র ও সুস্থতার পর্যায়ে সেরোলজিক পরীক্ষা করা হয়। পাশাপাশি গলা ও নাকের সোয়াব, রক্ত, প্রস্রাব এবং সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড (CSF) থেকে রিয়েল টাইম পিসিআর পরীক্ষা করা যেতে পারে।
মারাত্মক ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের টিস্যু পরীক্ষা করে ইমিউনোহিস্টোকেমিস্ট্রি পদ্ধতিতেও রোগ নির্ণয় করা হয়।
চিকিৎসা ব্যবস্থা
বর্তমানে নিপাহ ভাইরাসের জন্য নির্দিষ্ট কোনও নিশ্চিত চিকিৎসা নেই। চিকিৎসা মূলত উপসর্গের ওপর ভিত্তি করে সহায়ক পদ্ধতিতে করা হয়।
Ribavirin নামের একটি ওষুধ পরীক্ষাগারে কার্যকর প্রমাণিত হলেও মানুষের ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। নিপাহ ভাইরাসের জি গ্লাইকোপ্রোটিনকে লক্ষ্য করে মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি ব্যবহার করে প্যাসিভ ইমিউনাইজেশন নিয়ে গবেষণা চলছে।
যেহেতু এই ভাইরাস মানুষ থেকে মানুষে ছড়াতে পারে, তাই হাসপাতালে চিকিৎসার সময় কঠোর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ বিধি মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নিপাহ ভাইরাস প্রতিরোধের ক্ষেত্রে সতর্কতাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
স্থানীয় বা সংক্রমণপ্রবণ এলাকায় বাদুড়, শূকর ও অন্যান্য সম্ভাব্য সংক্রামিত প্রাণীর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা, এবং কাঁচা খেজুরের রস পান না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সচেতনতা ও দ্রুত চিকিৎসাই নিপাহ ভাইরাস মোকাবিলার প্রধান অস্ত্র বলে মনে করছেন চিকিৎসক মহল।
![]()

More Stories
রবি শস্য চাষে রেকর্ড বৃদ্ধি: ৬৭৬ লক্ষ হেক্টর ছাড়াল আবাদ, গমে ৩৩৫ লক্ষ হেক্টর
বৈষ্ণোদেবী দর্শনে এসে আটকে পড়া যাত্রীদের জন্য কাটরা–শ্রীনগর রুটে বিশেষ ট্রেন চালাবে রেলমন্ত্রক
লোকসভায় বিশৃঙ্খলা: বাজেট অধিবেশনের বাকি সময়ের জন্য আট বিরোধী সাংসদ সাসপেন্ড