যুগাচার্য স্বামী প্রণবানন্দজী মহারাজ
ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের সঙ্গে এক অনন্য ঐতিহাসিক সম্পর্ক
সোমালিয়া ওয়েব নিউজঃ ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে যেমন নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর নাম উজ্জ্বল, তেমনই আধ্যাত্মিক ও সমাজসেবার ক্ষেত্রে যুগাচার্য স্বামী প্রণবানন্দজী মহারাজ ও ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের অবদান অনস্বীকার্য। এই দুই মহাপুরুষ ও তাঁদের পরিবারের মধ্যে গড়ে ওঠা আন্তরিক সম্পর্ক আজও ইতিহাসের এক মূল্যবান অধ্যায়।
পুরীধামে প্রথম সাক্ষাৎ
কটকের কাজ সেরে শ্রীশ্রী গুরুমহারাজ স্বামী প্রণবানন্দজী মহারাজ রথযাত্রা উপলক্ষে পুরীধামে গমন করেন। সে সময় পুরীতে ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের নিজস্ব আশ্রম নির্মিত হয়নি। ফলে স্বর্গদ্বার রোডে স্থানীয় এক মোহন্তের বিশাল বাড়িতে তাঁর সাময়িক নিবাসের ব্যবস্থা হয়।
নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর পিতৃদেব শ্রীযুক্ত জানকীনাথ বসু কটকে অবস্থানকালে আচার্যদেবের দর্শনের সুযোগ পাননি। সেই আক্ষেপ মেটাতেই তিনি সহধর্মিণীসহ পুরীতে এসে শ্রীশ্রী গুরুমহারাজের দর্শন করেন। দীর্ঘক্ষণ ধরে দর্শন ও আলাপচারিতার পর তাঁদের মুখমণ্ডলে যে গভীর তৃপ্তি ও আনন্দের ছাপ ফুটে উঠেছিল, তা দেখে মনে হচ্ছিল—যেন তাঁরা এক অমূল্য সম্পদের সন্ধান পেয়েছেন।
সুভাষচন্দ্রের জননীর গভীর ভক্তি
বিদায় নেওয়ার সময় সুভাষচন্দ্র বসুর মাতা সস্মিতহাস্যে বলেন—
“আজ থেকে আমরা আপনাদের একান্ত আপনজন হয়ে গেলাম। কটকে যখনই আসবেন, দর্শন দিতে ভুলবেন না।”
এই প্রসঙ্গে শ্রীশ্রী গুরুমহারাজ স্নেহভরে বলেন—
“মা, আপনি তো রত্নগর্ভা। কত সৌভাগ্য ও সুকৃতির শুভ সংস্কার নিয়ে এসেছেন আপনি। তাই আপনার প্রতিটি সন্তানই রত্নস্বরূপ।”
করজোড়ে নতশিরে সুভাষচন্দ্রের জননী উত্তর দেন—
“বাবা, এ সবই তোমাদের আশীর্বাদের ফল।”
এই অপূর্ব সরলতা, শ্রদ্ধা ও ভক্তি দেখে মনে হয়েছিল—এমন মহান পুত্রের জননী হওয়ার জন্য এই গুণাবলি যেন অপরিহার্য। পরবর্তীকালে সুভাষচন্দ্র বসুর পিতা ও মাতা শ্রীশ্রী গুরুমহারাজের নিকট দীক্ষা গ্রহণ করেন।
কলকাতায় নেতাজীর সঙ্গে সাক্ষাৎ
পরবর্তীকালে সঙ্ঘের সন্ন্যাসীদের রেঙ্গুন যাত্রার প্রাক্কালে আচার্যদেব স্বামী প্রণবানন্দজী স্বামী যোগানন্দ ও এক সেবককে পাঠান নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর কাছ থেকে একটি পরিচয়পত্র সংগ্রহের জন্য। সে সময় সুভাষচন্দ্র বসু কলকাতার মেয়র এবং উদীয়মান তরুণ জাতীয়তাবাদী নেতা।
তাঁর বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল, বৈঠকখানা দর্শনার্থীতে পূর্ণ। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর যখন আমাদের প্রবেশ করতে দেখলেন, তখন তিনি শিশুর মতো ব্যগ্র হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন—
“কি স্বামীজি, আপনারা এতক্ষণ বসে আছেন? আগে সংবাদ দিলেই হতো। বলুন, আপনাদের কী সেবা করতে পারি? স্বামী প্রণবানন্দজী এখন কোথায়? বাবা-মায়ের কাছে তাঁর সম্পর্কে অনেক কথা শুনেছি। তাঁর সঙ্গে একবার দেখা করার আমার বড়ই ইচ্ছে।”
আমরা রেঙ্গুন যাত্রার উদ্দেশ্য জানালে তিনি বলেন—
“আমি তো বার্মায় কাউকে বিশেষ চিনি না। মান্দালার জেলে থাকাকালীন সেখানকার অভিজ্ঞতাই বেশি।”
তখন জানানো হলো—মেয়র হিসেবে সঙ্ঘের কাজকর্ম সম্পর্কে একটি সাধারণ পরিচয়পত্র দিলেই যথেষ্ট। এই কথা শুনে মুহূর্তের মধ্যেই তিনি একটি পরিচয়পত্র লিখে দেন, যা আজও ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘে সংরক্ষিত আছে।
আচার্যদেবের ভবিষ্যদ্বাণী
সুভাষচন্দ্র বসুর ত্যাগ, সংযম ও অসীম সাহসের কথা আচার্যদেবের কাছে আগেই বহুবার শুনেছি। একবার মতিলাল নেহেরু কংগ্রেস সভাপতি রূপে কলকাতায় এলে, সেবার সৈনিকের বেশে সুভাষচন্দ্র বসুর একটি ছবি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সেই বীরমূর্তি দেখেই শ্রীশ্রী গুরুমহারাজ বলেছিলেন—
“সুভাষ একদিন সত্য সত্যই এই দেশে একটি সৈনিক বাহিনী গঠন করে দেশোদ্ধারের চেষ্টা করবে।”
কী আশ্চর্য সমাপতন! পরবর্তী কালে আচার্যদেবের এই ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তব রূপ লাভ করেছিল।
সূত্র :
সঙ্ঘ-প্রকাশিত “মণীষীদের দৃষ্টিতে আচার্য স্বামী প্রণবানন্দ”
সংগৃহীত গ্রন্থ : শ্রীগুরু সঙ্গে শ্রীগুরু প্রসঙ্গে, শ্রীশ্রী প্রণবানন্দ-লীলাস্মৃতি

![]()

More Stories
রবি শস্য চাষে রেকর্ড বৃদ্ধি: ৬৭৬ লক্ষ হেক্টর ছাড়াল আবাদ, গমে ৩৩৫ লক্ষ হেক্টর
বৈষ্ণোদেবী দর্শনে এসে আটকে পড়া যাত্রীদের জন্য কাটরা–শ্রীনগর রুটে বিশেষ ট্রেন চালাবে রেলমন্ত্রক
লোকসভায় বিশৃঙ্খলা: বাজেট অধিবেশনের বাকি সময়ের জন্য আট বিরোধী সাংসদ সাসপেন্ড