বিশেষ সাক্ষাৎকারে রেশন ডিলার সংগঠনের নেতৃত্বের বিস্ফোরক অভিযোগ—“৮০ শতাংশ ডিলার ওজন করে রেশন দ্রব্য পান না”
সোমালিয়া ওয়েব নিউজঃ পশ্চিমবঙ্গের রেশন ব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সাধারণ মানুষ ও রেশন ডিলারদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। কখনও সার্ভার সমস্যা, কখনও রেশন দ্রব্যের গুণগত মান, কখনও কমিশন অনিয়ম—প্রতিদিনই নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে রেশন ডিলারদের। এই পরিস্থিতিতে রেশন ডিলার সংগঠনের পুরনো নেতৃত্ব এবং অত্যন্ত পরিচিত মুখ বিপ্লব মজুমদার-এর সঙ্গে বিশেষ সাক্ষাৎকারে উঠে এল একাধিক গুরুতর অভিযোগ ও দাবি।
তিনি নিজেও একজন রেশন ডিলার। বর্তমান রেশন ব্যবস্থার জটিলতা, ডিলারদের আর্থিক ক্ষতি, এবং “দুয়ারে রেশন” প্রকল্পের বাস্তব সমস্যা নিয়ে তিনি বিস্তারিতভাবে মুখ খুললেন।
“গ্রাহকের প্রাপ্য ঠিকভাবে দিয়ে থাকি, কিন্তু আমরা নিজেরাই ঠিকভাবে পাই না”
বিপ্লব মজুমদারের দাবি, রেশন ডিলাররা গ্রাহকদের প্রাপ্য রেশন দ্রব্য সঠিক পদ্ধতিতে ওজন করে গ্রাহকদের হাতে তুলে দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু তাঁর অভিযোগ—
“পশ্চিমবাংলার প্রায় ৮০ শতাংশ রেশন ডিলার ওজন করে রেশন দ্রব্য পান না।”
অর্থাৎ যে পরিমাণ রেশন দ্রব্য ডিলারদের কাছে পৌঁছনোর কথা, অনেক ক্ষেত্রেই তা ওজনের ঘাটতি নিয়ে আসে বলে অভিযোগ। ফলে শেষ পর্যন্ত ডিলারদেরই গ্রাহকের সামনে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়।
ডিস্ট্রিবিউটর প্রথা নিয়ে বড় অভিযোগ—“শোষণ চলছে”
বিপ্লব বাবুর বক্তব্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে রেশন ব্যবস্থায় ডিস্ট্রিবিউটর মারফত ডিলারদের কাছে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছয়। কিন্তু তিনি বলেন—
“ন্যাশনাল ফুড সিকিউরিটি অনুযায়ী ডিস্ট্রিবিউটর প্রথা কোথাও নেই। একমাত্র পশ্চিমবঙ্গেই এই ব্যবস্থা চলছে।”
এবং তাঁর সরাসরি অভিযোগ—
“ডিস্ট্রিবিউটাররা রেশন ডিলারদের শোষণ করছে।”
এই শোষণের ফলে রেশন দ্রব্য সময়মতো না পাওয়া, ঘাটতি পাওয়া, এবং ডিলারদের আর্থিক ক্ষতির মতো সমস্যা বাড়ছে বলে দাবি।
আটা-চালে হ্যান্ডেলিং লস ঠিকমতো মেলে না, ক্ষতির বোঝা ডিলারদের ঘাড়ে
রেশন ডিলারদের অন্যতম বড় সমস্যা হিসেবে বিপ্লব মজুমদার তুলে ধরেন হ্যান্ডেলিং লস-এর বিষয়টি।
তিনি জানান, আটা ও চালে ডিলাররা সঠিকভাবে হ্যান্ডেলিং লস পান না।
তার উপর আটার গুণগত মান নিয়েও তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন। অভিযোগ—
- আটার গুণগত মান ভালো নয়
- অনেক সময় আটার প্যাকেট ফাটা থাকে
- ফাটা প্যাকেটের আটা নিতে গ্রাহকরা অনীহা দেখান
- এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় বহন করতে গিয়ে হ্যান্ডেলিং লস আরও বাড়ে
ফলে এই বাড়তে থাকা হ্যান্ডেলিং লসের কারণে রেশন ডিলারদের কাছে তৈরি হচ্ছে রেশন দ্রব্যের ঘাটতি, এবং ডিলাররা পড়ছেন লোকসানের মুখে।
“অনেক ডিলার ভয়ে আত্মহত্যা করছে”—চাঞ্চল্যকর দাবি
রেশন ব্যবস্থার চাপ ও লোকসানের বোঝা যে কতটা ভয়াবহ, তা বোঝাতে গিয়ে বিপ্লব মজুমদার অত্যন্ত গুরুতর মন্তব্য করেন। তাঁর দাবি—
“অনেক রেশন ডিলার ভয়ে আত্মহত্যা করছে।”
তিনি জানান, লোকসান, কমিশন অনিয়ম, স্টক ঘাটতি—সব মিলিয়ে বহু ডিলার মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছেন।
চাল “খাবারযোগ্য” হওয়া দরকার, প্যাকেটিং উন্নত করার দাবি
বিপ্লব বাবুর বক্তব্য, রেশনে যে চাল দেওয়া হয় তা অনেকেই খেতে চান না, বরং বিক্রি করে দেন।
তিনি মনে করেন—
- রেশনে খাবারযোগ্য চাল দেওয়া উচিত
- আটার মতো চালও ভালো প্যাকেটে দেওয়া উচিত
- ভালো প্যাকেটিং হলে চালের গুণগত মান বজায় থাকবে
দুয়ারে রেশন নিয়ে ক্ষোভ—“পরিকাঠামো নেই, দুর্ঘটনা হতে পারে যেকোনো সময়”
“দুয়ারে রেশন” পরিষেবা নিয়ে বিপ্লব মজুমদারের অভিযোগ আরও তীব্র।
তিনি বলেন,
“পরিকাঠামো না থাকা সত্ত্বেও দুয়ারে রেশনের পরিষেবা চলছে। এটা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। যেকোনো সময় যেকোনো মুহূর্তে দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।”
অর্থাৎ রেশন পরিবহণ, সংরক্ষণ, নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই যথাযথ ব্যবস্থা না থাকায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়ছে বলে দাবি।
সার্ভার-লিংক-ইপস মেশিন সমস্যা—নিয়মিত ভোগান্তি
ডিলারদের দৈনন্দিন কাজকর্মে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রযুক্তিগত সমস্যা। বিপ্লব বাবুর বক্তব্য অনুযায়ী—
- সার্ভার সমস্যা লেগেই থাকে
- লিংক সমস্যা হয়
- ই-পস মেশিন নিয়েও নানা ত্রুটি দেখা দেয়
ফলে রেশন বিতরণ করতে গিয়ে ডিলারদের যেমন সময় নষ্ট হয়, তেমনই গ্রাহকদেরও দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।
রশিদ স্পষ্ট নয়—গ্রাহক বুঝতে পারেন না পরিমাণ
ই-পস মেশিনে বিলিং হওয়ার পর যে রশিদ বের হয়, সেটি নিয়েও অভিযোগ ওঠে।
বিপ্লব মজুমদার জানান—
“অধিকাংশ গ্রাহক সেই রশিদ দেখে পরিমাণ বুঝতে পারেন না। আরও পরিষ্কারভাবে প্রিন্ট হওয়া উচিত।”
গ্রাহক পরিষেবা ও স্বচ্ছতার স্বার্থে রশিদ আরও পরিষ্কার হওয়ার দাবি উঠেছে।
ডিজিটাল যুগেও স্টক দেখা যায় না, খাতা মানে না দপ্তর!
সবচেয়ে বড় বিস্ময়ের বিষয় হিসেবে বিপ্লব বাবু জানান—
- রেশন ডিলাররা তাদের ই-পস মেশিন থেকে অ্যালটমেন্ট দেখতে পান না
- গত মাসের স্টক দেখা যায় না
- বাধ্য হয়ে ডিলাররা ম্যানুয়ালি খাতা মেইনটেইন করেন
- কিন্তু খাদ্য দপ্তর সেই খাতা মানতে চায় না
অথচ “ডিজিটাল যুগে” এমন পুরনো পদ্ধতির উপর নির্ভর করাকে তিনি এক ধরনের অব্যবস্থা বলেই মনে করছেন।
তিন মাস আগেকার স্টক দেখিয়ে ‘অ্যালাইনমেন্ট’—অভিযোগ
বিপ্লব মজুমদারের বক্তব্য অনুযায়ী,
“তিন মাস আগেকার স্টক দেখে এখনও অ্যালাইনমেন্ট প্রথা রয়ে গেছে।”
ফলে বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে বাস্তব স্টকের গরমিল তৈরি হচ্ছে এবং ডিলারদের সমস্যাও বাড়ছে বলে দাবি।
কমিশন অনিয়ম—“কোন মাসের কমিশন কখন ঢুকবে বোঝা যায় না”
ডিলারদের আয়ের অন্যতম উৎস কমিশন। কিন্তু সেটি নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ।
বিপ্লব বাবুর বক্তব্য—
- নির্দিষ্ট সময়ে কমিশন পাওয়া যায় না
- কোন মাসের কমিশন কবে ঢুকছে বোঝা যায় না
- সব মিলিয়ে একটা “গুলিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত চলছে”
উৎসবে বোনাস নেই, কমিশনও কম—অসন্তোষ চরমে
বিপ্লব মজুমদার অভিযোগ করেন, উৎসবের সময় অন্যান্য কর্মচারীরা বোনাস পেলেও রেশন ডিলাররা কোনও বোনাস পান না।
তিনি বলেন—
“একদিকে কমিশন খুবই কম, অন্যদিকে খাদ্য দপ্তর একের পর এক নতুন নিয়োগ করে ভ্যাকেন্সি তৈরি করছে।”
অর্থাৎ নতুন ডিলার নিয়োগ বাড়লে পুরনো ডিলারদের কার্ড সংখ্যা কমে, কমিশন আরও কমে যায়—এই আশঙ্কা রয়েছে।
রেশন কার্ডের সম বণ্টন ও নতুন নিয়োগ বন্ধের দাবি
ডিলারদের কমিশন সমস্যার সমাধানে বিপ্লব মজুমদারের দাবি—
- রেশন কার্ডের সম বণ্টন দরকার
- নতুন করে ডিলার নিয়োগ না করে
- বর্তমানে থাকা রেশন কার্ডগুলি বর্তমান ডিলারদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া উচিত
তিনি মনে করেন, এতে কমিশনের সমস্যা কিছুটা হলেও কমবে।
“প্রতিটি ডিলারের মাসে অন্তত ৫০ হাজার টাকা আয় দরকার”
বর্তমান বাজারদর ও জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় বিপ্লব বাবুর দাবি—
“বর্তমান সময় অনুযায়ী ন্যূনতম প্রতিটি রেশন ডিলারের মাসিক ৫০ হাজার টাকা আয় প্রয়োজন।”
হঠাৎ কার্ড লাল হয়ে ডিএক্টিভ—অবিলম্বে চালুর দাবি
বিপ্লব মজুমদার জানান, বিভিন্ন সময় বহু গ্রাহকের রেশন কার্ড হঠাৎ করে লাল হয়ে ডিএক্টিভ হয়ে যাচ্ছে।
তিনি দাবি করেন—
- অবিলম্বে সেই সব কার্ড চালু করতে হবে
- এবং গ্রাহকের প্রাপ্য ১২ মাসের রেশন দ্রব্য দিতে হবে
নতুন কার্ড বিলিতে ‘পারিবারিক সচ্ছলতা’ যাচাইয়ের দাবি
নতুন করে রেশন কার্ড বিলি-বণ্টনের ক্ষেত্রেও তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব দেন। তাঁর মতে—
“পারিবারিক সচ্ছলতা দেখে নতুন করে কার্ড বিলি বণ্টন করা উচিত।”
অর্থাৎ প্রকৃত দরিদ্র ও প্রয়োজনীয় মানুষ যেন রেশনের সুবিধা পান, সেই দিকটি নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।
“দপ্তরকে বহুবার জানানো হয়েছে, তবু সুরাহা নেই”
সবশেষে বিপ্লব মজুমদারের অভিযোগ, এই সমস্ত সমস্যা নিয়ে খাদ্য দপ্তরকে বহুবার জানানো হলেও এখনও পর্যন্ত কোনও কার্যকর সমাধান মেলেনি।
তিনি বলেন—
“দপ্তর সবকিছু জেনেও এখনও পর্যন্ত কোনও রকম সুরাহা করেনি।”
পশ্চিমবঙ্গের রেশন ব্যবস্থায় একদিকে সাধারণ মানুষ যেমন পরিষেবা ও গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, তেমনই রেশন ডিলারদের অভিযোগ—তাঁরা প্রতিদিন লোকসান, প্রযুক্তিগত সমস্যা, স্টক ঘাটতি ও প্রশাসনিক জটিলতার মধ্যে পড়ে কাজ করছেন। বিপ্লব মজুমদারের এই সাক্ষাৎকারে উঠে আসা অভিযোগ ও দাবিগুলি রেশন ব্যবস্থার বাস্তব চিত্রকে আরও স্পষ্ট করল। এখন দেখার—খাদ্য দপ্তর এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কত দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

![]()

More Stories
কয়লা পাচার কাণ্ডে পশ্চিমবঙ্গে ইডির তল্লাশি অভিযান, দুর্গাপুর ও বুদবুদে হানা
দিল্লিতে রাজ্য পুলিশের বাড়তি টিম, ২২ জনের দল রাতের বিমানে রওনা
লোকভবনে রাজ্যপালের কাছে SIR সংক্রান্ত দাবিপত্র বিজেপি বিধায়কদের