দুর্গাপুর থেকে ইস্ট কোস্ট করিডোর, ডানকুনি-সুরাট ফ্রেট করিডোরে শিল্পায়নের আশা—পর্যটন, শিক্ষা, হাই স্পিড রেলে নতুন পরিকল্পনা
সোমালিয়া ওয়েব নিউজঃ আজকের কেন্দ্রীয় বাজেট বাংলার মানুষের মনে আশার আলো জাগিয়েছে। শিল্পায়নের জোয়ার আনতে পরিকাঠামোগত উন্নয়নে বিপুল বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে কেন্দ্র। বন্দর, জাতীয় সড়ক, রেল যোগাযোগ ও শিল্প ক্লাস্টার—সবকিছুকে এক সুতোয় বাঁধতে একাধিক বড় প্রকল্পের ঘোষণা করা হয়েছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে দুর্গাপুরকে কেন্দ্র করে নতুন শিল্প করিডোর, ডানকুনি-সুরাট ডেডিকেটেড ফ্রেট করিডোর, এবং বারাণসী-শিলিগুড়ি হাই স্পিড রেল করিডোর—এই তিনটি উদ্যোগকে শিল্প ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলেই মনে করছে অর্থনৈতিক মহল।
ইস্ট কোস্ট ইন্ডাস্ট্রিয়াল করিডোর: তামিলনাড়ু থেকে দুর্গাপুর
বাজেটে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘোষণাগুলির মধ্যে রয়েছে দেশের প্রথম উপকূলভিত্তিক করিডোর—ইস্ট কোস্ট ইন্ডাস্ট্রিয়াল করিডোর। এই করিডোরটি তামিলনাড়ু থেকে পশ্চিমবঙ্গের দুর্গাপুর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে বলে জানানো হয়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই করিডোর তৈরি হলে বন্দর, জাতীয় সড়ক, রেলপথ এবং শিল্পাঞ্চলগুলির মধ্যে যোগাযোগ আরও মসৃণ হবে। ফলে পণ্য পরিবহণ, কাঁচামাল সরবরাহ এবং উৎপাদিত সামগ্রী বাজারজাতকরণ—সব ক্ষেত্রেই সুবিধা বাড়বে। বাংলায় নতুন শিল্প স্থাপনের ক্ষেত্রেও এটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
দুর্গাপুরে ‘ইন্টিগ্রেটেড ইস্ট কোস্ট করিডোর’
অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমন বাংলার শিল্প উন্নয়নের লক্ষ্যে দুর্গাপুরের নতুন শিল্প করিডোরের ঘোষণা করেছেন। এই কারণে দুর্গাপুরে ইন্টিগ্রেটেড ইস্ট কোস্ট করিডোর তৈরি হবে বলে জানানো হয়েছে।
শিল্প মহলের ধারণা, দুর্গাপুর অঞ্চলে ইতিমধ্যেই শিল্প পরিকাঠামোর ভিত্তি থাকায় নতুন করিডোর বাস্তবায়িত হলে সেখানে আরও বড় শিল্প বিনিয়োগ আসতে পারে। এর ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে।
ডানকুনি-সুরাট ডেডিকেটেড ফ্রেট করিডোরে শিল্প সম্ভাবনা
পণ্য পরিবহণের গতি বাড়াতে ডানকুনি থেকে সুরাট ডেডিকেটেড ফ্রেট করিডোর তৈরির প্রস্তাবও বাজেটে গুরুত্ব পেয়েছে।
এই করিডোর চালু হলে শিল্পপণ্য পরিবহণ দ্রুত হবে, খরচ কমবে এবং পশ্চিমবঙ্গ থেকে দেশের অন্যান্য শিল্পাঞ্চলে সংযোগ আরও সহজ হবে। অর্থনৈতিক মহলের মতে, এটি রাজ্যে নতুন শিল্প বিনিয়োগ টানতে সহায়ক হতে পারে।
বারাণসী-শিলিগুড়ি হাই স্পিড রেল করিডোর
বাজেটে দেশের সংযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের লক্ষ্যে ৭টি হাই স্পিড রেল করিডোর গড়ে তোলার ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ করিডোর হলো—
🚉 বারাণসী থেকে শিলিগুড়ি
এছাড়াও ঘোষণা করা হয়েছে—
🚉 মুম্বই থেকে পুনে
🚉 পুনে থেকে হায়দ্রাবাদ
🚉 হায়দ্রাবাদ থেকে ব্যাঙ্গালুরু
🚉 হায়দ্রাবাদ থেকে চেন্নাই
🚉 চেন্নাই থেকে ব্যাঙ্গালুরু
🚉 দিল্লি থেকে বারাণসী
🚉 বারাণসী থেকে শিলিগুড়ি
এই হাই স্পিড রেল করিডোরগুলি দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করবে বলে কেন্দ্রের দাবি। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের সঙ্গে দেশের মূল স্রোতের সংযোগ আরও দ্রুত হলে পর্যটন ও ব্যবসা—দুই ক্ষেত্রেই লাভ হতে পারে।
আয়কর কাঠামোয় পরিবর্তন ও জিএসটি ছাড়ের সুফল
কেন্দ্র সরকার ইতিপূর্বেই ব্যক্তিগত কর কাঠামোয় বড় পরিবর্তন এনে ১২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত আয় করমুক্ত করেছে। বাজেট বক্তৃতায় সেই সিদ্ধান্তের সুফল সাধারণ মানুষের জন্য ইতিবাচক বলেই তুলে ধরা হয়েছে।
এছাড়াও জিএসটি-তে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়ার ফলে বাজারদর কিছুটা কমেছে এবং সাধারণ মানুষ কেনাকাটায় সাশ্রয় পাচ্ছেন বলেও দাবি করা হয়েছে।
অন্যদিকে অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, চলতি বছরের পয়লা এপ্রিল থেকে নতুন আয়কর আইন কার্যকর হতে চলেছে। ফলে করদাতাদের ক্ষেত্রে নিয়ম-কানুনে আরও কিছু পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
কৃষক-নারী-যুব সমাজকে কেন্দ্র করে ‘জনমুখী বাজেট’
এই বাজেটে সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের কথা ভেবে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
বিশেষ করে—
- কৃষকদের আয় বৃদ্ধি
- মহিলাদের ক্ষমতায়ন
- যুব সমাজের কর্মসংস্থান
- রপ্তানি বৃদ্ধি ও বিদেশি বিনিয়োগ
এই লক্ষ্যগুলিকে সামনে রেখে বাজেট সাজানো হয়েছে। বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতিতে শুল্ক যুদ্ধের আবহে ভারতীয় অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী ও আত্মনির্ভর করার কথাও বলা হয়েছে।
পর্যটনে বড় পরিকল্পনা: পূর্বাঞ্চলের পাঁচ রাজ্যে নতুন গন্তব্য
অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, দেশের পূর্বাঞ্চলের পাঁচটি রাজ্যে পর্যটন গন্তব্য গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এছাড়াও—
- দেশের ২০টি পর্যটন কেন্দ্রে কর্মরত ১০ হাজার গাইডের দক্ষতা বৃদ্ধি
- উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বৌদ্ধ পর্যটন সার্কিট উন্নয়নে নতুন উদ্যোগ
পর্যটন শিল্পকে আরও সংগঠিত করে কর্মসংস্থান বাড়ানোর লক্ষ্যই এই প্রকল্পগুলির মূল উদ্দেশ্য বলে জানানো হয়েছে।
শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে নতুন প্রস্তাব
বাজেটে শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রেও একাধিক পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
- দেশে একটি নতুন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ডিজাইন
- দেশের প্রত্যেক জেলায় একটি করে গার্লস হোস্টেল
- দেশে পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয় টাউনশিপ গড়ে তোলা
- আতিথেয়তা ক্ষেত্রের উন্নয়নে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ হসপিটালিটি
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রকল্পগুলি বাস্তবায়িত হলে আগামী দিনে শিক্ষাক্ষেত্রে সুযোগ বাড়ার পাশাপাশি চাকরির বাজারেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
পরিবেশ রক্ষায় কার্বন সংগ্রহ প্রকল্পে ২০ হাজার কোটি
পরিবেশকে নির্মল রাখা এবং কার্বন নির্গমন সংক্রান্ত লক্ষ্যমাত্রা পূরণে আগামী ৫ বছরের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে কার্বন সংগ্রহ, ব্যবহার এবং স্টোরেজ প্রকল্প নেওয়ার প্রস্তাবও বাজেটে রয়েছে।
এটি শিল্পায়নের সঙ্গে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখার দিকেও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে মনে করা হচ্ছে।
বিভিন্ন মহলের প্রতিক্রিয়া
বাজেট ঘোষণার পর বিভিন্ন মহল থেকে প্রতিক্রিয়া এসেছে।
ইন্ডিয়ান চেম্বার অফ কমার্সের সহ-সভাপতি পার্থিব বিক্রম নেওটিয়া বাজেটকে দেশের জন্য উন্নয়নমুখী বলে উল্লেখ করেন। রাজ্যের ক্ষেত্রেও বাণিজ্য ও শিল্প ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
বিজেপি রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য ২০২৬-২৭ আর্থিক বছরের বাজেটকে “বিকশিত পশ্চিমবঙ্গের বাজেট” বলে মন্তব্য করেছেন।
অন্যদিকে রাজ্যপাল সি ভি আনন্দ বোস কেন্দ্রীয় বাজেটকে স্বাগত জানিয়ে একে উন্নয়নমুখী পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন।
সুফল পৌঁছবে তো বাংলায়?
কেন্দ্রীয় বাজেটে বাংলার জন্য শিল্প করিডোর, ফ্রেট করিডোর, হাই স্পিড রেল, পর্যটন ও দক্ষতা উন্নয়নের একাধিক পরিকল্পনা উঠে এসেছে। ফলে রাজ্যে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা বাড়বে বলেই আশা করছে একাংশ।
তবে রাজনৈতিক মহলের মতে, কেন্দ্র-রাজ্য সমন্বয় না হলে এই প্রকল্পগুলির বাস্তবায়ন কতটা দ্রুত হবে—তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
সব মিলিয়ে কেন্দ্রীয় বাজেট বাংলার জন্য সম্ভাবনার নতুন দরজা খুললেও, বাস্তবে এই ঘোষণা কতটা দ্রুত মাটিতে নামবে—সেদিকেই তাকিয়ে রাজ্যবাসী।

![]()

More Stories
রবি শস্য চাষে রেকর্ড বৃদ্ধি: ৬৭৬ লক্ষ হেক্টর ছাড়াল আবাদ, গমে ৩৩৫ লক্ষ হেক্টর
বৈষ্ণোদেবী দর্শনে এসে আটকে পড়া যাত্রীদের জন্য কাটরা–শ্রীনগর রুটে বিশেষ ট্রেন চালাবে রেলমন্ত্রক
লোকসভায় বিশৃঙ্খলা: বাজেট অধিবেশনের বাকি সময়ের জন্য আট বিরোধী সাংসদ সাসপেন্ড