সোমালিয়া ওয়েব নিউজঃ গাছের ডালে এই যে লালচে বা খয়েরি রঙের আস্তরণ দেখা যায়, এটি আসলে লাক্ষা (Lac)। গ্রামবাংলায় অনেক সময় একে ‘গাছের ক্যান্সার’ বলে ভুল করা হয়, কারণ এটি ডালকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে এবং আক্রান্ত ডালটি ধীরে ধীরে শুকিয়ে যায়। তবে বৈজ্ঞানিক ভাবে এটি কোনো রোগ বা ক্যান্সার নয়, বরং এটি একটি উপকারী পতঙ্গের নিঃসরণ। প্রধানত শিরিষ গাছেই বেশি পাওয়া যায়, এক সংগ্রহকারী আমাদের জানান তারা বিভিন্ন গ্রামে এলাকায় ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন গাছ থেকে এই লাক্ষা সংগ্রহ করে, ব্যক্তিগত গাছ থেকে চুক্তির ভিত্তিতে কিনে নেয় তারা। এই লাক্ষা থেকে আলতা সিঁদুর বিভিন্ন পালিশ এর রং ইত্যাদি কাজে ব্যবহৃত হয়। তারা সংগ্রহ করে এটাকে প্রসেসিং করে আবার অন্য মহাজনের কাছে বিক্রি করে দেয়। লাক্ষা আসলে কী? লাক্ষা হলো লাক্ষা পোকা (বৈজ্ঞানিক নাম: Laccifer lacca) নামক এক ধরণের অতি ক্ষুদ্র পোকার দেহ থেকে নিঃসৃত এক প্রকার প্রাকৃতিক রজন (Resin)। এই পোকাগুলো সাধারণত কুল (বড়ই), পলাশ বা কুসুম গাছের কচি ডালের রস খেয়ে বেঁচে থাকে এবং নিজেদের সুরক্ষার জন্য ডালের চারদিকে এই আস্তরণ তৈরি করে। কেন একে ‘ক্যান্সার’ মনে হয়? আক্রমণাত্মক বিস্তার: লাক্ষা পোকা যখন কোনো ডালকে আক্রমণ করে, তখন ডালটি পুরু আস্তরণে ঢেকে যায়। ডাল শুকিয়ে যাওয়া: অতিরিক্ত নিঃসরণের ফলে এবং পোকা ডালের রস শোষণ করে নেওয়ায় আক্রান্ত ডালটি পুষ্টির অভাবে মারা যেতে পারে। ভুল ধারণা: অনেক সময় সাধারণ মানুষ মনে করেন গাছটি কোনো মারণ রোগে আক্রান্ত হয়েছে, যা অন্য ডালেও ছড়িয়ে পড়ছে।
এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব আপনি জেনে অবাক হতে পারেন যে, যাকে অনেকে আপদ মনে করেন, সেটি আসলে একটি অর্থকরী ফসল। গহনা তৈরি, আসবাবপত্রের বার্নিশ, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম এবং সিলমোহর (Sealing wax) তৈরিতে লাক্ষা ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। ভারত ও বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে লাক্ষা চাষ করা হয়।
যদি উদ্দেশ্য লাক্ষা উৎপাদন না হয়ে বাগান রক্ষা করা হয়, তবে কিছু পদক্ষেপগুলো নেওয়া যেতে পারে,যেমন – ছাঁটাই: আক্রান্ত ডালগুলো কেটে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। পরিচ্ছন্নতা: আক্রান্ত ডাল কাটার পর সেখানে কপার অক্সিক্লোরাইড জাতীয় ছত্রাকনাশকের প্রলেপ দিতে হবে।
প্রাচীন ভারতের বিভিন্ন কাহিনিতেও কিন্তু এই লাক্ষার কথা পাওয়া যায় (যেমন মহাভারতের ‘জতুগৃহ’ বা লাক্ষার ঘর)।
লাক্ষা সংগ্রহের পর থেকে বাজারে বিক্রির উপযোগী হওয়া পর্যন্ত বেশ কয়েকটি ধাপের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। মূলত প্রসেসিংয়ের মাধ্যমেই অশোধিত লাক্ষা থেকে বিশুদ্ধ ‘শেল্যাক’ (Shellac) তৈরি হয়।
গাছের যে ডালে লাক্ষার আস্তরণ জমে, সেই ডালগুলো প্রথমে কেটে নেওয়া হয়। এরপর ধারালো ছুরি বা যন্ত্রের সাহায্যে ডাল থেকে লাক্ষার স্তরটি ছাড়িয়ে নেওয়া হয়। এই অবস্থাকে বলা হয় ‘স্টিক ল্যাক’ (Stick Lac)। এতে প্রচুর পরিমাণে ডালপালা, মৃত পোকা এবং ময়লা মিশে থাকে।
স্টিক ল্যাক গুঁড়ো করে বড় পাত্রে ভিজিয়ে রাখা হয়। এরপর হাত দিয়ে বা মেশিনে ভালো করে কচলে ধোয়া হয়। এর ফলে লাক্ষার ভেতরে থাকা প্রাকৃতিক লাল রঙ (Lac Dye) আলাদা হয়ে যায়। হালকা ময়লাগুলো জলের ওপরে ভেসে ওঠে এবং ভারি লাক্ষা নিচে পড়ে থাকে। এই ধোয়া লাক্ষাকে শুকানোর পর বলা হয় ‘সিড ল্যাক’ (Seed Lac)। এটি দেখতে অনেকটা ছোট দানার মতো হয়।
সিড ল্যাককে আরও বিশুদ্ধ করার জন্য তাপ দিয়ে গলানো হয়। ঐতিহ্যগত পদ্ধতিতে এটি একটি লম্বা কাপড়ের ব্যাগে ভরে আগুনের তাপে ঝোলানো হয়। তাপ পেয়ে লাক্ষা গলে কাপড়ের ছিদ্র দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা হয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে এবং ময়লাগুলো কাপড়ের ভেতরেই থেকে যায়। গলে যাওয়া তরল লাক্ষাকে বড় কোনো ধাতব সিলিন্ডার বা চ্যাপ্টা জায়গায় ছড়িয়ে পাতলা চাদরের মতো তৈরি করা হয়। এই পাতলা চাদরগুলো শুকিয়ে গেলে হাত দিয়ে ভেঙে ছোট ছোট টুকরো করা হয়। একেই ‘শেল্যাক’ (Shellac) বলা হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী এই শেল্যাককে কেমিক্যাল ব্যবহার করে সাদা বা স্বচ্ছ করা হয় (Bleached Shellac), যা মূলত উন্নতমানের পলিশ বা প্রসাধনী তৈরিতে কাজে লাগে।
![]()

More Stories
পুরুলিয়ার হুড়া এলাকায় আহত পূর্ণবয়স্ক হরিণ উদ্ধার, বনদপ্তরের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা শুরু
কলকাতার মৃত্যুঘণ্টা কি বেজে গেলো?
হর্সশু কাঁকড়া: নীল রক্তের ‘জীবন্ত জীবাশ্ম’, চিকিৎসাবিজ্ঞানে অমূল্য