সোমালিয়া ওয়েব নিউজঃ রাজস্থান থেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে এসে দেবদেবীর মূর্তি তৈরি—এমনই এক পরিযায়ী শিল্পীদের জীবনসংগ্রামের ছবি উঠে এল হুগলির গোঘাট ব্লকের ভিকদাস সংলগ্ন এলাকায়। জমি ভাড়া নিয়ে তাবু খাটিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে একটি অস্থায়ী কারখানা। সেখানেই চলছে দিনরাত ধরে মূর্তি তৈরির কাজ। সংসারের সকল সদস্য হাত মিলিয়ে যুক্ত রয়েছেন এই শিল্পকর্মে।
এই অস্থায়ী কারখানায় রাধা-কৃষ্ণ, গণেশ, নাড়ুগোপাল সহ নানা দেবদেবীর মূর্তি তৈরি করা হচ্ছে। রবারের ডাইস ব্যবহার করে প্লাস্টার অব প্যারিসের সাহায্যে গড়ে তোলা হয় এই মূর্তিগুলি। শিল্পীরা জানান, এই কাজ তাঁরা বাড়িতেই শিখেছেন এবং দীর্ঘদিন ধরেই পারিবারিকভাবে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। মূলত হায়দ্রাবাদে বড় আকারের গণেশ মূর্তি তৈরি করলেও, আপাতত তিন থেকে চার মাস পশ্চিমবঙ্গেই থেকে এই কাজ চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
মূর্তি গড়ার পর প্রথমে রোদে ভালোভাবে শুকানো হয় প্লাস্টার অব প্যারিস। এরপর শিল্পীদের নিপুণ তুলির ছোঁয়ায় বিভিন্ন রঙে রাঙিয়ে তোলা হয় মূর্তিগুলি। রং ও অলংকরণের মাধ্যমে মূর্তিগুলি হয়ে ওঠে আরও আকর্ষণীয় ও জীবন্ত। শিল্পীরা ক্রেতাদের উদ্দেশ্যে জানিয়েছেন, এই মূর্তিগুলি জল দিয়ে ধোয়া উচিত নয়; পরিষ্কারের জন্য শুকনো কাপড় দিয়ে আলতো করে মুছে নিতে হবে।
মূল্যের দিক থেকেও সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যেই রাখা হয়েছে মূর্তিগুলি। ১০০ টাকা থেকে শুরু করে ৪০০ টাকা পর্যন্ত বিভিন্ন দামের মূর্তি পাওয়া যাচ্ছে। তৈরি হওয়ার পর ছোট ছোট ভ্যানের মাধ্যমে পাড়া-মহল্লা ও বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে বিক্রি করা হয় এই দেবমূর্তি।
এই ঘটনাকে ঘিরে একটি বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাও সামনে এসেছে। রাজস্থান থেকে বহু দূর পথ পাড়ি দিয়ে জীবিকার সন্ধানে পশ্চিমবঙ্গে এসে কঠোর পরিশ্রমে মূর্তি তৈরি ও বিক্রি করছেন এই শিল্পীরা। অথচ স্থানীয়ভাবে এই কাজের প্রতি আগ্রহ বা অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম বলেই মনে করছেন শিল্পীরা। তাঁদের মতে, হাতে-কলমে দক্ষতার এই পেশা এখনও অনেক ক্ষেত্রেই অবহেলিত, যদিও ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক চাহিদার বাজারে এর যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রামীণ শিল্প ও ক্ষুদ্র উদ্যোগকে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দেওয়া গেলে এ ধরনের শিল্প আরও প্রসারিত হতে পারে এবং স্থানীয় কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত খুলে যেতে পারে। একই সঙ্গে আন্তঃরাজ্য শিল্পীদের এই আগমন সাংস্কৃতিক বিনিময়ের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। রাজস্থান থেকে এসে পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে মূর্তি তৈরি ও বিক্রির এই চিত্র পরিযায়ী শ্রম ও শিল্পের উপর নির্ভরশীল এক বাস্তবতার কথা তুলে ধরে। আশ্চর্যের বিষয়, পশ্চিমবঙ্গে শিল্প ও সংস্কৃতির গভীর ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও এই ধরনের পরিশ্রমসাধ্য কাজে স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম বলেই মত শিল্পীদের। ফলে ভিনরাজ্যের কঠোর পরিশ্রমী মানুষদের উপরই নির্ভর করতে হচ্ছে এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে।
এই অস্থায়ী কারখানা শুধু মূর্তি তৈরির কেন্দ্র নয়, বরং তা পরিযায়ী শিল্পীদের সংগ্রাম, দক্ষতা ও জীবিকার এক জীবন্ত দলিল হিসেবেই উঠে আসছে গোঘাটের ভিকদাস এলাকায়।

![]()

More Stories
বেপরোয়া বাইক, বেআইনি ইঞ্জিন ভ্যান ও নিয়মভাঙা পার্কিং—চাপ বাড়ছে রাস্তায়, উদ্বেগে সাধারণ মানুষ
স্মৃতির ধুলোমাখা টিনের ট্রাঙ্ক: আধুনিকতার ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া এক পৈতৃক স্পন্দন
কর্পোরেট আগ্রাসনে কোণঠাসা আরামবাগের পুরনো দোকানপাট