সোমালিয়া ওয়েব নিউজ: বসন্তের আগমনে প্রকৃতি যখন নতুনের সাজে সেজে ওঠে, গাছে গাছে যখন রক্তিম পলাশ আর শিমুলের মেলা বসে, ঠিক তখনই আদিবাসী জনজীবনে শুরু হয় আনন্দের জোয়ার। সাঁওতালসহ বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান উৎসব হলো ‘বাহা’। ‘বাহা’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো ফুল। মূলত প্রকৃতিকে সম্মান জানানো এবং নতুনকে বরণ করে নেওয়ার এই উৎসবটি কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং এটি মানুষ ও প্রকৃতির সহাবস্থানের এক জীবন্ত দলিল।উৎসবের প্রেক্ষাপট ও মূল দেবতাআদিবাসী সমাজ প্রকৃতিকে ঘিরেই আবর্তিত হয়। তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী, জগত সৃষ্টির মূলে রয়েছেন ‘মারাংবুরু’ (সর্বোচ্চ দেবতা)। চৈত্র মাসের এই বিশেষ সময়ে যখন চারপাশ নতুন পাতা আর ফুলে ভরে ওঠে, তখন মারাংবুরু এবং ‘জাহের আয়ো’-কে স্মরণ করে এই পুজো করা হয়। আদিবাসী ক্যালেন্ডার অনুযায়ী মাঘ মাস থেকে বছর শুরু হলেও, বসন্তের এই সময়টি হলো নতুনকে বরণ করার লগ্ন।
পুজোর প্রস্তুতি ও নিয়মাবলীবাহা পরব মূলত তিন দিন ধরে পালন করা হয়, প্রথম দিন (উম): উৎসবের সূচনা হয় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মাধ্যমে। গ্রামের মোড়ল বা ‘মাঝি বাবা’র নির্দেশে গ্রামবাসী তাদের ঘর-বাড়ি এবং পবিত্র ‘জাহের থান’ (পূজাস্থল) পরিষ্কার করেন। দ্বিতীয় দিন (সারদি বাহা): এটিই পুজোর মূল দিন। গ্রামের নাইকে বা পুরোহিত উপবাস থেকে শাল গাছের নতুন ফুল, নিমপাতা ও মহুয়া ফুল দিয়ে দেবতাদের অর্চনা করেন। তৃতীয় দিন (জাঁতলে): এদিন পুজোর রেশ ধরে রেখে আনন্দ-উৎসব পালন করা হয়। আত্মীয়-স্বজনদের সমাগম ঘটে এবং সকলে মিলে প্রীতিভোজের আয়োজন করেন। এই পুজোর আগে কোনো আদিবাসী নারী বা পুরুষ মাথায় নতুন শাল ফুল গোঁজেন না বা নতুন ফল ভক্ষণ করেন না। পুজোর মাধ্যমে প্রকৃতিকে উৎসর্গ করার পরেই তা ব্যবহারের রীতি প্রচলিত। বাহা পুজোর একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো শাল ফুল। শাল গাছকে আদিবাসীরা অত্যন্ত পবিত্র মনে করেন। পুজোর মূল উপকরণ হিসেবে নতুন শাল পাতা ও ফুলের ব্যবহার প্রকৃতির প্রতি তাদের গভীর মমত্ববোধ প্রকাশ করে। এই উৎসবে ছোট থেকে বড় সকলেই উপবাস পালন করেন, যা শরীর ও মনকে শুদ্ধ করার একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা হয়। বাহা উৎসব মানেই মাদলের গুরুগম্ভীর আওয়াজ আর ধামসার তালের সাথে দলবদ্ধ নাচ। পুরুষেরা ধুতি-পাঞ্জাবি এবং মহিলারা বাহারি শাড়ি ও খোঁপায় শাল-পলাশ ফুল গুঁজে উৎসবে শামিল হন। বাড়িতে বাড়িতে হাড়িয়া (দেশীয় পানীয়) ও বিভিন্ন পিঠা-পনার আয়োজন করা হয়। এটি কেবল একটি সম্প্রদায়ের উৎসব নয়, বরং এটি ভ্রাতৃত্বের বন্ধন দৃঢ় করার একটি সামাজিক মাধ্যম।বর্তমান যান্ত্রিক যুগে যেখানে মানুষ প্রকৃতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, সেখানে বাহা পরব আমাদের শেখায় কীভাবে প্রকৃতিকে রক্ষা করে এবং তাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে বেঁচে থাকতে হয়। ‘গাছে নতুন পাতা গজালে তবেই নতুন সাজ’—এই চিরন্তন সত্যকেই উদযাপন করে আদিবাসী মানুষেরা।


![]()

More Stories
হাত ছেড়ে পদ্ম ধরলেন কলকাতার দাপুটে কাউন্সিলর সন্তোষ পাঠক, সল্টলেকে বিজেপির রাজ্য দপ্তরে বড় ভাঙন কংগ্রেসে
আজ ঘোষিত বামফ্রন্টের প্রার্থী তালিকা (Part-III) এক নজরে দেখে নিন
রোজ ভ্যালি কাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্তদের স্বস্তি, ফের শুরু টাকা ফেরত প্রক্রিয়া