দেউলপাড়ার বৌদ্ধ বিহার—আজকের বুদ্ধ পূর্ণিমায় গ্রামীণ বাংলায় শান্তি ও সম্প্রীতির এক অনন্য ঠিকানা

সোমালিয়া ওয়েব নিউজ: হুগলি জেলার গ্রামীণ প্রকৃতির মাঝে লুকিয়ে আছে এক অনন্য শান্তির ঠিকানা—দেউলপাড়ার বৌদ্ধ মন্দির, যার প্রকৃত নাম “শ্রীশ্রী ত্রিরত্ন সঙ্ঘ শান্তিবন বুদ্ধ বিহার”। চারপাশের সবুজ প্রকৃতি ও দামোদর নদীর স্নিগ্ধ হাওয়ায় মোড়া এই স্থান যেন প্রকৃতি ও আধ্যাত্মিকতার এক অপূর্ব মেলবন্ধন। প্রায় নয় বিঘা জমির ওপর গড়ে ওঠা এই মন্দির চত্বর প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। চারপাশে পেয়ারা, লিচু, আম, কাঁঠালসহ নানা ফলের গাছ এবং সুগন্ধি ফুলের সমারোহ পরিবেশকে আরও মনোরম করে তুলেছে। মন্দিরের প্রধান ফটক পেরিয়ে দেখা মেলে এক প্রশস্ত উপাসনা কক্ষ। বেদীর ওপর স্থাপিত শ্বেত পাথরের ধ্যানমগ্ন বুদ্ধমূর্তি দর্শনার্থীদের মনে গভীর প্রশান্তির অনুভূতি জাগায়। জানা যায়, এই মূর্তিটি বিদেশ থেকে আনা হয়েছে। ঘরের তিন দেওয়ালে গৌতম বুদ্ধ-এর জীবনকাহিনী চিত্রিত বড় বড় তৈলচিত্র শোভা পাচ্ছে। ধূপের মৃদু সুবাস ও নীরব পরিবেশ মিলিয়ে এখানে কিছুক্ষণ কাটালেই যেন জীবনের সমস্ত ক্লান্তি দূর হয়ে যায়।এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা তারকচন্দ্র বাইরি—এক অন্তর্মুখী গ্রামবাসী। উত্তর ভারতে ভ্রমণকালে একটি বৌদ্ধ মন্দির দেখে তাঁর জীবনে আসে বড় পরিবর্তন। পরবর্তীতে তিনি বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করে নিজ গ্রামে এই বিশাল মন্দির নির্মাণের উদ্যোগ নেন। প্রায় ২০ বছর সময় ও ৪০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে তৈরি হয় এই বিহার, যার নির্মাণকাজে অংশ নিয়েছিলেন মুর্শিদাবাদের মুসলিম কারিগররা—যা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ১৯৮৫ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি এই মন্দিরের উদ্বোধন করেন দলাই লামা। সেই দিন বিশাল জনসমাগমে গ্রাম যেন উৎসবমুখর হয়ে উঠেছিল।বিশেষত বুদ্ধ পূর্ণিমা উপলক্ষে এখানে বড় উৎসবের আয়োজন করা হয়। দূরদূরান্ত থেকে বহু ভক্ত ও দর্শনার্থী ভিড় জমান। দিনভর চলে উপাসনা, ধর্মীয় আচার ও সামাজিক মিলনমেলা। পরিবারের সদস্য এবং হাতিয়া চন্দ্রিমা ও প্রিয়াঙ্কা জানান বুদ্ধ পূর্ণিমার আগের দিন থেকেই শুরু হয় প্রস্তুতি। মন্দির প্রাঙ্গণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়, বুদ্ধমূর্তিকে গোলাপজলসহ বিভিন্ন সামগ্রী দিয়ে স্নান করানো হয় এবং ফুল দিয়ে সাজানো হয়। বুদ্ধদেবের প্রিয় ফুল পদ্ম এবং প্রিয় খাদ্য হিসেবে পায়েস নিবেদন করা হয়। রাত থেকেই শুরু হয় আরাধনা, আর ভোরে প্রার্থনার মধ্য দিয়ে উৎসবের মূল পর্ব শুরু হয়। সকাল থেকে ভোগ রান্নার ব্যস্ততা চলে—সব খাবারই নিরামিষ। দুপুরে ভোগ সাজিয়ে মূর্তির চারদিকে প্রদক্ষিণ করে নিবেদন করা হয়। কিছু সময়ের জন্য মন্দির বন্ধ রাখার পর পুনরায় খুলে সেই প্রসাদ ভক্তদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। উৎসবের সময় মন্দির চত্বরে থাকা অতিথিশালায় আত্মীয়-স্বজনদের থাকার ব্যবস্থাও থাকে। উল্লেখযোগ্য বিষয়, পুরশুড়া ব্লকে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী প্রায় নেই বললেই চলে। তবুও এই মন্দির ধর্মীয় ও ভ্রমণপ্রেমীদের কাছে এক বিশেষ আকর্ষণ হয়ে রয়েছে। তবে স্থানীয়দের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে মন্দিরে কিছুটা অযত্নের ছাপ পড়েছে, যা সংরক্ষণের দাবি রাখে। দীর্ঘদিন ধরে পর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এই ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় স্থাপনাটি ধীরে ধীরে জীর্ণ হয়ে পড়ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও মন্দিরের তত্ত্বাবধায়করা। মন্দির প্রতিষ্ঠাতা পরিবারের সদস্য দেবাদিত্ত বাইরি কথায়, এত বড় পরিসরের একটি ধর্মীয় স্থাপনা রক্ষণাবেক্ষণ করা তাদের পক্ষে ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। দেবাদিত্ব বাড়ি হলেন প্রতিষ্ঠাতা স্বর্গীয় তারকচন্দ্র বাইরের নাতি, আর্থিক ও প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার কারণে নিয়মিত সংস্কার ও পরিচর্যা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে মন্দিরের বিভিন্ন অংশে অবক্ষয়ের ছাপ স্পষ্ট। তিনি আরো জানিয়েছেন এই মন্দির সংস্কারের জন্য যদি কেউ বা কোন সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এগিয়ে আসেন সমস্ত দায়িত্বভার পরিবারের তরফ থেকে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হবে।।পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই ঐতিহ্যবাহী বৌদ্ধ বিহারকে বাঁচিয়ে রাখতে তারা যে কোনও উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান, ট্রাস্ট বা আগ্রহী ব্যক্তির কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করতে প্রস্তুত। তাদের মতে, সঠিক উদ্যোগ ও পরিকল্পনার মাধ্যমে এই মন্দিরকে পুনরায় আগের মর্যাদায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব স্থানীয়দেরও দাবি, প্রশাসন বা কোনও সাংস্কৃতিক-ধর্মীয় সংস্থা এগিয়ে এলে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। কারণ, এটি শুধুমাত্র একটি মন্দির নয়—এটি এলাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির প্রতীক। দিনের শেষে সূর্যাস্তের আলো যখন মন্দিরের শিখরে পড়ে, আর পায়রার ঝাঁক আকাশে উড়ে বেড়ায়—তখন দেউলপাড়ার এই বৌদ্ধ বিহার যেন এক অনাবিল শান্তির প্রতীক হয়ে ওঠে। এখানে কাটানো কিছু সময় মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি এনে দেয়, যা সহজে ভোলার নয়। এখন দেখার বিষয়, ভবিষ্যতে কোনও সংস্থা বা উদ্যোগী ব্যক্তি এই দায়িত্ব গ্রহণ করে দেউলপাড়ার এই শান্তির ঠিকানাকে নতুন জীবন দিতে এগিয়ে আসেন কি না।

Loading