সোমালিয়া ওয়েব নিউজ: জ্যৈষ্ঠ মাসের প্রথম মঙ্গলবার থেকেই শুরু হয় বাঙালির ঘরে ঘরে প্রচলিত মা মঙ্গলচণ্ডীর ব্রত ও পুজো। মঙ্গলচণ্ডী হলেন হিন্দু সনাতন ধর্মের একজন অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং লোকায়ত দেবী। তিনি প্রধানত দেবী চণ্ডীরই একটি বিশেষ রূপ। লৌকিক বিশ্বাস অনুযায়ী, তিনি সংসারের সব রকমের অমঙ্গল বা আপদ-বিপদ দূর করে মঙ্গল ও কল্যাণ করেন বলেই তাঁর নাম ‘মঙ্গলচণ্ডী’। বাঙালি হিন্দু সমাজে, বিশেষ করে নারীদের মধ্যে দেবী মঙ্গলচণ্ডীর পূজা ও ব্রত পালনের এক সুদীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। পুরাণ ও লৌকিক আখ্যান অনুযায়ী দেবী মঙ্গলচণ্ডীর উল্লেখ যেমন ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণের মতো শাস্ত্রীয় গ্রন্থে পাওয়া যায়, তেমনই বাংলার লোকসাহিত্যে (বিশেষত মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্যে) তাঁর মহিমা বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তীসহ অন্যান্য কবিদের লেখা ‘চণ্ডীমঙ্গল’ কাব্যে দেবী মঙ্গলচণ্ডীর মাহাত্ম্য কীর্তন করা হয়েছে। এই কাব্যের মূল দুটি চরিত্র—ব্যাধ কালকেতু ও তাঁর স্ত্রী ফুল্লরা ,এবং বণিক ধনপতি ও তাঁর দুই স্ত্রী লহনা ও খুলনা—দেবীর কৃপায় কীভাবে সমস্ত বিপদ থেকে উদ্ধার পেয়েছিলন। বাংলার বহু সধবা মহিলা সংসারের সুখ, শান্তি ও পরিবারের মঙ্গল কামনায় নিষ্ঠার সঙ্গে এই ব্রত পালন করে থাকেন। কোনও বছর জ্যৈষ্ঠ মাসে চারটি মঙ্গলবার পড়ে, আবার কোনও বছর পাঁচটি মঙ্গলবারও থাকে। সেই অনুযায়ী পূজার আয়োজনও চলে পুরো মাস জুড়ে। গ্রামবাংলার বিভিন্ন এলাকায় এই ব্রতকে কেন্দ্র করে এক বিশেষ ধর্মীয় ও সামাজিক পরিবেশ তৈরি হয়। কোথাও বাড়িতে ব্যক্তিগতভাবে ব্রত পালন করা হয়, আবার কোথাও পাড়ার মহিলারা একত্রিত হয়ে মন্দিরে সমবেতভাবে এই পুজো করেন। তেমনই একটি ছবি দেখা গেল ভালিয়ার রঘুনাথের মন্দিরে। সরকারপাড়ার রঘুবীরের মন্দিরে মূলত সরকারপাড়ার মহিলারা একত্রে মা মঙ্গলচণ্ডীর ব্রত পালন করেন প্রতিবছর। ব্রতকারী মহিলা ছায়া সরকার জানান, এই ব্রতের নানা বিশেষ নিয়ম ও উপাচার রয়েছে। তিনি বলেন, “১৭টা কাঁঠাল পাতা, ১৭টা বেলপাতা, ৮টি দুর্বাঘাস ও ৮টি আলোচাল দিয়ে অষ্টখিলি তৈরি করা হয়। কলাপাতায় মুড়ে পানের খিলির মতো করে তা বানাতে হয়। আবার প্রসাদের জন্য ১৭টি তুলসী পাতা, ১৭টি যব ও ১৭টি মুগ কলাই দিয়েও খিলি তৈরি করা হয়। মোট ১৭টি বাটা সাজানো হয়। স্বামী ও পরিবারের কল্যাণের উদ্দেশ্যেই এই ব্রত পালন করা হয়।” আর এক ব্রতকারী মহিলা মিলি সরকার জানান, “মূলত সধবা মহিলারাই বিয়ের পর থেকে এই ব্রত করে থাকেন। বিয়ের সময় যে থলি ও লক্ষ্মীর কৌটো পাওয়া যায়, সেই কৌটো দিয়েই মঙ্গলচণ্ডীর পুজো করা হয়। বছরের এই বিশেষ দিনটির জন্য আমরা অপেক্ষা করে থাকি। এই ব্রত করলে মানসিক শান্তি, আনন্দ ও তৃপ্তি পাওয়া যায়।” পুজোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল আমশাখা দিয়ে মঙ্গলঘট প্রতিষ্ঠা করা। এরপর নিয়ম মেনে দেবীর আরাধনা, ব্রতকথা পাঠ এবং প্রসাদ বিতরণ করা হয়। সকাল থেকেই মন্দির প্রাঙ্গণে ভক্তিমূলক পরিবেশ তৈরি হয় এবং মহিলাদের অংশগ্রহণে জমে ওঠে এই ঐতিহ্যবাহী ব্রত উৎসব। শুধু ধর্মীয় আচার হিসেবেই নয়, মা মঙ্গলচণ্ডীর এই ব্রত বাংলার লোকসংস্কৃতি ও সামাজিক ঐতিহ্যেরও এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতিবছর জ্যৈষ্ঠ মাস এলেই গ্রামের মহিলাদের মধ্যে এই ব্রতকে ঘিরে উৎসাহ ও আবেগ চোখে পড়ার মতো হয়ে ওঠে। সংসারের সুখ, শান্তি, সমৃদ্ধি ও পরিবারের সদস্যদের মঙ্গল কামনায় ভক্তিভরে মা মঙ্গলচণ্ডীর আরাধনা করা হয়। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, মা মঙ্গলচণ্ডী হলেন দেবী দুর্গার এক মঙ্গলময় রূপ। তিনি ভক্তদের জীবনের অশুভ শক্তি দূর করে কল্যাণ ও সমৃদ্ধির পথ দেখান। বহু মানুষের ধারণা, নিষ্ঠার সঙ্গে এই ব্রত পালন করলে সংসারের অশান্তি দূর হয়, রোগ-ব্যাধি ও বিপদ কাটে, সন্তানের মঙ্গল হয় এবং পারিবারিক সুখ-সমৃদ্ধি বৃদ্ধি পায়। পূজার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল “মঙ্গলচণ্ডীর ব্রতকথা” পাঠ বা শ্রবণ। এই ব্রতকথায় দেবীর মাহাত্ম্য, ভক্তদের বিপদমুক্তি ও সংসারের মঙ্গল লাভের বিভিন্ন কাহিনি বর্ণিত থাকে। পূজা শেষে প্রসাদ বিতরণ করা হয় পরিবারের সদস্যদের মধ্যে।

![]()

More Stories
মেলা ও পার্লারের সস্তা ট্যাটু ,পিয়ার্সিং গান ফোঁড়াই ডেকে আনছে ভয়াবহ বিপদ
মহৌষধ—কচি নিম পাতা আর সজনে ডাটা শাক ফুলে প্রকৃতির নিরাময়
পুকুরের জলে হারিয়ে যাচ্ছে শৈশব: গ্রীষ্মের সাঁতারে ফিকে হচ্ছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য