সোমালিয়া ওয়েব নিউজ: হুগলি জেলার গোঘাট এক নম্বর ব্লকের কাটালি-মদনমোহনপুর এলাকায় আজও জীবন্ত হয়ে রয়েছে শতাধিক বছরের পুরনো পান চাষের ঐতিহ্য। প্রায় ৫০ থেকে ৬০টি চাষী পরিবার দীর্ঘ একশো বছরেরও বেশি সময় ধরে এই পান চাষের সঙ্গে যুক্ত। শুধু অর্থনৈতিক দিক থেকেই নয়, সামাজিক ও ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে এই চাষ। স্থানীয় মানুষদের কাছে পান শুধুমাত্র একটি অর্থকরী ফসল নয়, বরং এটি তাদের সংস্কৃতি, জীবনধারা এবং পূর্বপুরুষদের উত্তরাধিকার। স্থানীয় পান চাষী সোনাচাঁদ নন্দী জানান, পান চাষের জন্য উঁচু ও এঁটেল মাটিযুক্ত জমি সবচেয়ে উপযুক্ত। জল জমে থাকে এমন জমিতে এই চাষ হয় না। পান গাছের কান্ড থেকেই নতুন চারা তৈরি করা হয়। এখানে মূলত বাংলা পাতি পানের চাষ বেশি হয়। পানের বরুজ থেকে সুস্থ কান্ড নিয়ে এসে নতুন জমিতে রোপণ করা হয়। রাসায়নিক সারের ব্যবহার তুলনামূলক কম। গোবর সার ও খোলই প্রধান ভরসা। প্রয়োজনে মাঝেমধ্যে কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। ফলে এই চাষ অনেকটাই প্রাকৃতিক পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল। চাষীদের বক্তব্য, পান গাছ অত্যন্ত সংবেদনশীল। তাই নিয়মিত পরিচর্যা না করলে ফলন নষ্ট হয়ে যেতে পারে। সাধারণত প্রতি দুই সপ্তাহ অন্তর পান তোলা হয়। একটি ডালে পাঁচটি পাতা হলেই তা বাজারজাত করার উপযুক্ত হয়ে ওঠে। এই এলাকার পান মূলত স্থানীয় পাইকারি বাজারে বিক্রি হয়। বিশেষ করে বদনগঞ্জ , কয়াপাঠ ও কোতুলপুর এলাকায় বড় পাইকারি বাজার রয়েছে, যেখানে প্রতিদিন বহু ব্যবসায়ী পান কিনতে আসেন। চাষীদের মতে, ভালো মানের পান সারা বছরই চাহিদাসম্পন্ন। বিয়ে, পূজা-পার্বণ, সামাজিক অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে দৈনন্দিন ব্যবহারে পান বাঙালির সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। ফলে বাজারে এর স্থায়ী চাহিদা রয়েছে। সোনাচাঁদ নন্দী আরও জানান, মিঠা পাতি পানের চাষ সাধারণত নোনা জমিতে ভালো হয়। জমির প্রকৃতি অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের পানের গুণগত মানও বদলে যায়। আর এক পান চাষী নবকুমার দে জানান, পান চাষের জন্য খড়িকাঠি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই কাঠি দিয়ে পান গাছকে বাঁধা হয়। পানের চাষ করতে ঘরের মতো কাঠামো তৈরি করে বরুজ বানাতে হয়, যাতে সরাসরি রোদ বা অতিরিক্ত বৃষ্টি, হাওয়া থেকে গাছকে রক্ষা করা যায়। তিনি বলেন, বর্তমানে এই খড়িকাঠি সংগ্রহ করতে হয় হাওড়া র নাল্ট এলাকা থেকে। আগে স্থানীয় এলাকাতেও এই কাঠির চাষ হতো। কিন্তু গরু ও ছাগলের অত্যাচারে সেই চাষ ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়। ফলে এখন বাইরের জেলার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। খড়ের মতো কাহন হিসেবে এই কাঠি কিনতে হয়। চাষীদের মতে, পান বরুজ তৈরি করতে যথেষ্ট খরচ হয়। কাঠি, বাঁশ, খড় ও শ্রমিকের খরচ মিলিয়ে শুরুতেই বড় বিনিয়োগ দরকার। তবে একবার গাছ ঠিকভাবে বেড়ে উঠলে বহু বছর ধরে ফলন দেয়। নবকুমার দে জানান, একটি পান গাছ প্রায় ৫০ থেকে ৬০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে এবং দীর্ঘদিন ফলন দিয়ে যায়। প্রতিদিন বরুজে কাজ করতে হয়। সামান্য অবহেলাতেও রোগ ধরে যেতে পারে। ভোরবেলা সাধারণত পান পাতা তোলা হয়। কারণ তখন পাতার সতেজতা সবচেয়ে বেশি থাকে। বাজারেও সেই পান বেশি দাম পায়। এই পান চাষের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে গভীর ধর্মীয় বিশ্বাসও। স্থানীয়দের মতে, দেবী দুর্গার বিভিন্ন রূপের মধ্যে “সিংহবাহিনী” রূপকে এই পান গাছের মধ্যে কল্পনা করা হয়। ফলে পান বরুজকে অত্যন্ত পবিত্র স্থান হিসেবে মানা হয়। বছরে দুইবার—অগ্রহায়ণ ও বৈশাখ মাসে—বিশেষ পুজোর আয়োজন করা হয়। চাষীরা বিশ্বাস করেন, দেবীর আশীর্বাদে বরুজ ভালো থাকে এবং ফলন বৃদ্ধি পায়। এখানে বেশ কিছু সামাজিক নিয়মও মানা হয়। বাসি কাপড় পরে বরুজে প্রবেশ করা যায় না। মহিলাদের ঋতুস্রাবের সময় বরুজে প্রবেশ নিষিদ্ধ বলে প্রাচীন নিয়ম আজও অনেক পরিবারে প্রচলিত রয়েছে। চাষীদের বক্তব্য, চলতি বছরে আলু চাষে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে। কিন্তু পান চাষ সেই ক্ষতি অনেকটাই পুষিয়ে দিয়েছে। তাদের মতে, আলুর বাজারে দামের অস্থিরতা বেশি থাকলেও পান চাষে তুলনামূলক স্থিতিশীল আয় হয়। ফলে বিকল্প অর্থকরী ফসল হিসেবে পান চাষ এখন অনেক কৃষকের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। স্থানীয় চাষীরা জানান, সাধারণত ফাল্গুন ও আষাঢ় মাসে পান গাছ রোপণ করা হয়। আবহাওয়া ও মাটির আর্দ্রতার ওপর নির্ভর করে গাছের বৃদ্ধি হয়। অত্যধিক গরম বা অতিবৃষ্টি—দুটিই ক্ষতিকর। তাই বরুজের পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ করাই চাষীদের প্রধান কাজ। পান চাষের সঙ্গে যুক্ত এই সম্প্রদায়কে স্থানীয়ভাবে “বারুজীবী” বলা হয়। এঁরা অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণি বা ওবিসি সম্প্রদায়ভুক্ত। বহু প্রজন্ম ধরে এঁদের জীবন-জীবিকা পান চাষের ওপর নির্ভরশীল। বর্তমান সময়ে কৃষিক্ষেত্রে নানা পরিবর্তন এলেও কাটালি-মদনমোহনপুরের এই বারুজীবী পরিবারগুলি এখনও ঐতিহ্য আঁকড়ে ধরে রেখেছে। আধুনিকতার ভিড়েও শতবর্ষের এই পান বরুজ আজও গ্রামীণ বাংলার কৃষি-সংস্কৃতির এক জীবন্ত দলিল।

![]()

More Stories
গরমে তালের রসের চাহিদা বাড়ছে, কীভাবে সংগ্রহ করা হয় এই প্রাকৃতিক পানীয়? পুষ্টির ভাণ্ডার নাকি স্বাস্থ্যের ঝুঁকি? জেনে নিন বিশেষজ্ঞদের মত
যুব সমাজের পরিবর্তনের ডাক: রাষ্ট্রচিন্তা, অনুশাসন ও কর্মসংস্থানের বার্তা দিল বিজেপি যুব মোর্চা
আরামবাগ পৌরসভার দুরবস্থা, দুর্নীতি ও উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে মুখ খুললেন বিজেপি কাউন্সিলর বিশ্বজিৎ ঘোষ