জাতীয় পুনর্জাগরণের এক মহান ঋষি: পরম পূজনীয় শ্রী গুরুজীর জীবন, সাধনা ও নেতৃত্ব

৫ জুন—পরম পূজনীয় শ্রী মাধব সদাশিব গোলওয়ালকর (শ্রী গুরুজী)-এর মহাপ্রয়াণ দিবস

সোমালিয়া ওয়েব নিউজ: ভারতের জাতীয় পুনর্জাগরণের ইতিহাসে কিছু ব্যক্তিত্ব আছেন, যাঁদের জীবন কেবল একটি সংগঠনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং একটি যুগের চিন্তা, আদর্শ ও কর্মধারাকে প্রভাবিত করেছে। এমনই এক বিরল ব্যক্তিত্ব ছিলেন পরম পূজনীয় শ্রী মাধব সদাশিব গোলওয়ালকর, যিনি স্নেহভরে সারা দেশেই “শ্রী গুরুজী” নামে পরিচিত।

আজ তাঁর মহাপ্রয়াণ দিবসে স্মরণ করলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক ত্যাগী, আধ্যাত্মিক, নিরহংকার অথচ দৃঢ়চেতা নেতৃত্বের প্রতিচ্ছবি, যিনি নিজের জীবনকে সম্পূর্ণভাবে জাতির সেবায় উৎসর্গ করেছিলেন।

তৎকালীন বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিসেবে শ্রী গোলওয়ালকর ছিলেন ছাত্রসমাজের অত্যন্ত প্রিয়। তাঁর গভীর জ্ঞান, সহজ ব্যাখ্যা ও স্নেহময় আচরণের জন্য ছাত্ররা তাঁকে “গুরুজী” বলেই ডাকতেন।

সেই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘের একটি শাখা চলত। স্বয়ংসেবক শ্রী ভাইয়াজী দানীর অনুরোধে তিনি প্রথমবার সংঘের শাখা প্রত্যক্ষ করেন। শাখার শৃঙ্খলা, দেশপ্রেম ও চরিত্রগঠনের আদর্শ তাঁকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করে। পরবর্তীতে তিনি নাগপুরে গিয়ে জাতীয় স্বয়ংসেবক সংঘের প্রতিষ্ঠাতা ডাঃ কেশব বলিরাম হেডগেওয়ারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

এই সাক্ষাৎ তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

কিছুদিন পর হঠাৎই তিনি জনসমাজের চোখের আড়ালে চলে যান। এই সময় ডাঃ হেডগেওয়ারও তাঁর অনুপস্থিতিতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।

১৯৩৬ সালে তিনি জানতে পারেন যে, শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের প্রত্যক্ষ শিষ্য স্বামী অখণ্ডানন্দ মহারাজ মুর্শিদাবাদের সারগাছিতে আশ্রম স্থাপন করে আছেন। আধ্যাত্মিক তৃষ্ণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে গুরুজী সেখানে পৌঁছান এবং প্রায় এক বছর গুরুসেবায় আত্মনিয়োগ করেন।

১৯৩৭ সালের ১৩ জানুয়ারি, কৃষ্ণ একাদশীর পবিত্র তিথিতে তিনি স্বামী অখণ্ডানন্দের কাছ থেকে দীক্ষা গ্রহণ করেন। এটি ছিল তাঁর জীবনের এক গভীর আধ্যাত্মিক অধ্যায়।

কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই, ৭ ফেব্রুয়ারি স্বামী অখণ্ডানন্দ মহারাজ বেলুড় মঠে মহাসমাধি লাভ করেন। এরপর গুরুজী পুনরায় নাগপুরে ফিরে আসেন এবং ডাঃ হেডগেওয়ারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বহুদিন পর তাঁকে ফিরে পেয়ে ডাঃ হেডগেওয়ার অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিলেন।

১৯৩৯ সালে ডাঃ হেডগেওয়ার তাঁকে কলকাতায় পাঠান সংঘের কার্যক্রম বিস্তারের উদ্দেশ্যে। কলকাতার মানিকতলার সরকার লেনে তিনি বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে সংঘের শাখা শুরু করেন।

বাংলার মাটিতে সংঘকার্যের এই সূচনা ছিল পরবর্তী বিস্তারের ভিত্তিপ্রস্তর।

তবে মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই ডাঃ হেডগেওয়ার তাঁকে পুনরায় নাগপুরে ফিরিয়ে নেন।

১৯৪০ সালের ২১ জুন ডাঃ কেশব বলিরাম হেডগেওয়ারের দেহাবসান ঘটে। প্রতিষ্ঠাতার প্রয়াণে সমগ্র সংঘ পরিবার শোকাহত হয়ে পড়ে।

এরপর ৩ জুলাই শ্রী গুরুজী সংঘের দ্বিতীয় সরসঙ্ঘচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেই শুরু। এরপর টানা ৩৩ বছর তিনি সংঘকে নেতৃত্ব দেন এবং ভারতের অন্যতম বৃহত্তম সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনে পরিণত করার ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন।

গুরুজীর নেতৃত্বের সময় ভারত নানা ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী হয়েছে।

দেশভাগের বিভীষিকা, উদ্বাস্তু সমস্যা, কাশ্মীর প্রশ্ন, জাতীয় নিরাপত্তা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি সংগঠনকে সমাজসেবার কাজে নিয়োজিত করেন।

মহাত্মা গান্ধীর হত্যাকাণ্ডের পর সংঘের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে এবং সংগঠন নিষিদ্ধ করা হয়। হাজার হাজার স্বয়ংসেবক গ্রেফতার হন।

এই কঠিন সময়ে গুরুজী অসাধারণ ধৈর্য, সংযম ও দৃঢ়তার পরিচয় দেন। দীর্ঘ সংগ্রামের পর সংঘের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আদালতে টেকেনি এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়।

১৯৬২ সালে চীনের আক্রমণের সময় গুরুজী সমগ্র সংঘ পরিবারকে দেশের প্রতিরক্ষার কাজে সহায়তার জন্য আহ্বান জানান।

সংঘের স্বয়ংসেবকরা ত্রাণ, শৃঙ্খলা রক্ষা ও জনসেবামূলক কাজে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

এই অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৬৩ সালের প্রজাতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজে সংঘের স্বয়ংসেবকদের অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানানো হয়। প্রায় তিন হাজার স্বয়ংসেবক পূর্ণ গণবেশে দিল্লির রাজপথে কুচকাওয়াজে অংশ নেন।

এটি সংঘের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে।

শুধু সংঘ পরিচালনাই নয়, গুরুজীর সময়ে বহু জাতীয় সংগঠনের বিকাশ ঘটে।

তাঁর অনুপ্রেরণায় ও নেতৃত্বে গড়ে ওঠে—

  • অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ (ABVP)
  • ভারতীয় জনসংঘ
  • ভারতীয় মজদুর সংঘ
  • বিশ্ব হিন্দু পরিষদ
  • বনবাসী কল্যাণ আশ্রম

সহ বহু সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও জাতীয়তাবাদী সংগঠন।

তিনি বিশ্বাস করতেন, সমাজজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে চরিত্রবান, সেবাপরায়ণ ও দেশপ্রেমিক কর্মী গড়ে তুলতে হবে।

দীর্ঘ ৩৩ বছরের অক্লান্ত কর্মযজ্ঞ, অসংখ্য কর্মী নির্মাণ এবং জাতীয় জীবনে গভীর প্রভাব বিস্তারের পর ১৯৭৩ সালের ৫ জুন তিনি মহাপ্রয়াণ করেন।

তাঁর প্রয়াণে শুধু একটি সংগঠন নয়, ভারতীয় সমাজজীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে।

কিন্তু তাঁর আদর্শ, চিন্তা ও কর্মপদ্ধতি আজও লক্ষ লক্ষ মানুষের মধ্যে জীবন্ত।

শ্রী গুরুজীর জীবন শেখায়—নেতৃত্ব মানে ক্ষমতা নয়, দায়িত্ব; সংগঠন মানে ব্যক্তি নয়, আদর্শ; আর দেশসেবা মানে কেবল বক্তব্য নয়, আজীবনের ত্যাগ ও সাধনা।

আজ তাঁর মহাপ্রয়াণ দিবসে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ সেই মহামানবকে, যিনি নিজের সমগ্র জীবনকে জাতির উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেছিলেন।

Loading