কৃষক বন্ধু ভেরিফিকেশনে ভোগান্তি বাড়ছে, জমির পর্চা পেতেই নাজেহাল কৃষকরা

জটিল আবেদনপত্র, বাংলার ভূমি পোর্টালে অতিরিক্ত চাপ, দীর্ঘ লাইনে ক্ষোভ; অনলাইন আবেদন ও হেল্পলাইন চালুর দাবি

সোমালিয়া ওয়েব নিউজঃ রাজ্য সরকারের ‘কৃষক বন্ধু’ প্রকল্পের ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া শুরু হতেই বিভিন্ন জেলায় আবেদনকারীদের ভোগান্তির অভিযোগ ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। ভেরিফিকেশন ফর্মে বিস্তৃত তথ্য চাওয়া, সাম্প্রতিক সার্টিফায়েড জমির পর্চা সংগ্রহের বাধ্যবাধকতা, বাংলার ভূমি পোর্টালের ধীরগতি এবং ফর্ম জমা দেওয়ার জন্য দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা—সব মিলিয়ে চাপে পড়েছেন বহু কৃষক ও তাঁদের পরিবার। পরিস্থিতি সহজ করতে আবেদন প্রক্রিয়া আরও সরলীকরণ এবং প্রযুক্তিগত পরিকাঠামো উন্নত করার দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। অভিযোগ অনুযায়ী, ভেরিফিকেশন ফর্মে আবেদনকারী কৃষকের পাশাপাশি তাঁর পরিবারের সদস্যদের, বিশেষ করে স্ত্রীর সম্পর্কেও বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হচ্ছে। অনেক আবেদনকারীর দাবি, এই তথ্য সংগ্রহে সময় যেমন বেশি লাগছে, তেমনি প্রয়োজনীয় নথিপত্র একত্র করাও অনেকের পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে গ্রামাঞ্চলের প্রবীণ কৃষকদের সমস্যার মাত্রা আরও বেড়েছে। সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয়েছে জমির নথি সংগ্রহকে কেন্দ্র করে। আবেদনকারীদের সাম্প্রতিক সার্টিফায়েড জমির পর্চা জমা দিতে বলা হয়েছে। সেই নথি সংগ্রহের জন্য অধিকাংশ মানুষ বাংলার ভূমি পোর্টালের ওপর নির্ভর করলেও, একযোগে বিপুল সংখ্যক ব্যবহারকারী প্রবেশের চেষ্টা করায় পোর্টালটি কার্যত ধীরগতির হয়ে পড়েছে। বহু আবেদনকারী জানিয়েছেন, সার্টিফায়েড পর্চা তো দূরের কথা, অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ লাইভ জমির পর্চাও দেখা যাচ্ছে না। বারবার সার্ভার সমস্যার কারণে প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এদিকে কৃষি দপ্তর, ব্লক অফিস এবং বিভিন্ন গ্রহণকেন্দ্রে ফর্ম জমা দেওয়ার জন্য প্রতিদিন দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। সকাল থেকেই বহু কৃষক লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলেও, অনেক ক্ষেত্রে দিনের শেষে কাজ সম্পূর্ণ করা সম্ভব হচ্ছে না বলে অভিযোগ। দূরবর্তী এলাকা থেকে আসা আবেদনকারীদের সময় ও অর্থ—উভয়েরই অপচয় হচ্ছে। প্রশাসনিক ও কৃষি বিষয়ক মহলের একাংশের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ফর্ম গ্রহণের ব্যবস্থা আরও বিকেন্দ্রীকরণ করা জরুরি। বুথভিত্তিক বা অঞ্চলভিত্তিক গ্রাম পঞ্চায়েতে ফর্ম জমা নেওয়ার ব্যবস্থা করা হলে একদিকে যেমন ভিড় কমবে, অন্যদিকে আবেদনকারীদের যাতায়াতের সমস্যাও অনেকটাই লাঘব হবে। একই সঙ্গে কৃষি দপ্তরের ওপর বর্তমান অতিরিক্ত চাপও কমানো সম্ভব হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে বিপুল সংখ্যক আবেদনপত্র কৃষি দপ্তরের কর্মীদের মাধ্যমে অনলাইনে তথ্য এন্ট্রি করা হচ্ছে। এই পদ্ধতিতে কাজের চাপ বাড়ার পাশাপাশি তথ্য নথিভুক্ত করার ক্ষেত্রে অনিচ্ছাকৃত ভুলের সম্ভাবনাও থেকে যাচ্ছে। তাই আবেদনকারীদের নিজস্বভাবে অনলাইনে ফর্ম পূরণের সুযোগ চালু করা হলে প্রক্রিয়াটি আরও দ্রুত, স্বচ্ছ ও নির্ভুল হতে পারে। অন্নপূর্ণা যোজনার আবেদন প্রক্রিয়ার মতো একটি ডিজিটাল ব্যবস্থা চালুর দাবি ইতিমধ্যেই বিভিন্ন মহলে উঠতে শুরু করেছে। ভেরিফিকেশন ফর্মের আরেকটি বিষয় নিয়েও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। আবেদনপত্রে ‘কৃষক বন্ধু সিরিয়াল নম্বর’ এবং ‘কৃষক বন্ধু আইডি’—উভয় তথ্যই চাওয়া হয়েছে। আবেদনকারীদের বক্তব্য, কৃষক বন্ধু পোর্টাল থেকে আইডি নম্বর পাওয়া গেলেও সিরিয়াল নম্বরের কোনো উল্লেখ নেই। ফলে সংশ্লিষ্ট তথ্য পূরণ করতে গিয়ে অনেকেই সমস্যায় পড়ছেন। আবেদনকারীদের দাবি, কৃষক বন্ধু পোর্টালে আইডির পাশাপাশি সিরিয়াল নম্বরও প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হোক। বাংলার ভূমি পোর্টালের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। একাধিক প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞের মতে, রাজ্যজুড়ে লক্ষাধিক ব্যবহারকারী একই সময়ে পরিষেবা গ্রহণের চেষ্টা করলে সার্ভারের সক্ষমতা সেই চাপ সামলানোর মতো হওয়া প্রয়োজন। বর্তমান পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নিয়ে সার্ভারের ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি, দ্রুততর ডেটা প্রসেসিং ব্যবস্থা এবং অতিরিক্ত প্রযুক্তিগত পরিকাঠামো গড়ে তোলার পরামর্শ দিচ্ছেন তাঁরা। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, রাজ্য সরকার ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছে যে জমির তথ্য ও পর্চা সংগ্রহের জন্য আর কোনো সরকারি ফি দিতে হবে না। অর্থাৎ, জমির তথ্য এখন সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পাওয়ার কথা। তবে প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে সেই পরিষেবা অনেক ক্ষেত্রেই ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ। সমগ্র ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর ও জনবান্ধব করতে আবেদনকারীদের পক্ষ থেকে একটি নির্দিষ্ট হেল্পলাইন নম্বর চালু করা, বুথভিত্তিক সহায়তা কেন্দ্র গড়ে তোলা, পঞ্চায়েত স্তরে প্রশিক্ষিত কর্মী নিয়োগ এবং কৃষক বন্ধু ও বাংলার ভূমি—উভয় পোর্টালের প্রযুক্তিগত পরিকাঠামো শক্তিশালী করার দাবি উঠেছে। রাজ্যের লক্ষাধিক কৃষক এই প্রকল্পের সুবিধাভোগী। ফলে ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া যত সহজ, স্বচ্ছ ও সময়োপযোগী হবে, ততই সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমবে। এখন নজর রাজ্য সরকারের দিকে—উঠে আসা সমস্যাগুলির দ্রুত সমাধানে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়, সেটাই দেখার।

Loading