“ন মে ভক্তঃ প্রণশ্যতি”—বলরাম দাসের অলৌকিক রথযাত্রার লীলা

সোমালিয়া ওয়েব নিউজ: রথযাত্রার সেই দিন। চারদিকে উল্লাস, শঙ্খধ্বনি, হরিনাম, ভক্তদের ঢল। শ্রীজগন্নাথদেব তাঁর ভক্তদের দর্শন দিতে রথে আরোহণ করেছেন। অথচ সেই মহাপুণ্যময় দিনে ভক্ত বলরাম দাস ইন্দ্রিয়ের দুর্বলতায় পথভ্রষ্ট হয়ে এক বারাঙ্গনার** গৃহে উপস্থিত হন। সংসারের মোহে আচ্ছন্ন হয়ে তিনি সম্পূর্ণ ভুলে যান—আজ তাঁর প্রাণের প্রভুর রথযাত্রা।

কিন্তু আশ্চর্য! সেই বারাঙ্গনাই তাঁকে কঠোর ভর্ৎসনা করে বললেন, “আজ রথযাত্রা, আর তুমি এখানে? যাও, তোমার জগন্নাথকে দর্শন করো।” সেই তিরস্কার যেন বজ্রাঘাতের মতো আঘাত করল বলরামের হৃদয়ে। মুহূর্তেই তাঁর চেতনা ফিরে এল। নিজের অপরাধ, নিজের অধঃপতনের কথা মনে করে তিনি লজ্জায়, অনুতাপে এবং ব্যাকুলতায় ছুটে চললেন শ্রীজগন্নাথের রথের দিকে।

অপবিত্র শরীর, অশ্রুসজল নয়ন, কাঁপা হৃদয় নিয়ে তিনি রথে উঠতে উদ্যত হলেন। কিন্তু সেবকরা তাঁর অতীত চরিত্রের কথা শুনে তাঁকে নির্মমভাবে রথ থেকে নামিয়ে দিল। অপমান, লাঞ্ছনা আর আত্মগ্লানিতে বিদীর্ণ হয়ে বলরাম দাস আর কিছু বলতে পারলেন না। নিঃশব্দে সেখান থেকে চলে গেলেন চক্রতীর্থের সমুদ্রতীরে।

সেখানে বসে তিনি বালু দিয়ে তিনটি ছোট্ট রথ নির্মাণ করলেন। তাঁর কাছে আর কোনো ঐশ্বর্য ছিল না—ছিল শুধু একান্ত ভক্তি, অনুতাপ আর প্রভুর জন্য অশেষ প্রেম। সেই বালুকাময় রথেই তিনি নিজের জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রার রথযাত্রা শুরু করলেন। আর তখনই ঘটল অলৌকিক লীলা। ভক্তের অশ্রু, ভক্তের ভালোবাসা, ভক্তের আহ্বানে স্বয়ং জগন্নাথ সেই বালুকার রথে আবির্ভূত হলেন।

এদিকে শ্রীমন্দিরের বিশাল রথ হঠাৎ অচল হয়ে গেল। হাজার হাজার মানুষ প্রাণপণে টানলেন, বলবান হাতির দল দিয়ে চেষ্টা করা হলো—কিন্তু রথ একচুলও এগোল না। সকলেই হতবাক, সকলেই বিস্মিত।

রাজা প্রতাপরুদ্র গভীর ব্যাকুলতায় শ্রীজগন্নাথের শরণাপন্ন হলেন। সেই রাত্রে স্বপ্নে জগন্নাথদেব আদেশ দিলেন, “আমার প্রিয় ভক্ত বলরাম দাসকে তোমার সেবকেরা অপমান করেছে। তাদের হাত-পা বেঁধে তাঁর কাছে নিয়ে যাও। তিনি সন্তুষ্ট না হলে আমার রথ চলবে না।”

ভোর হতেই রাজা আদেশ পালন করলেন। অপমানকারী সেবকদের বেঁধে বলরাম দাসের সামনে উপস্থিত করলেন এবং স্বপ্নাদেশের সমস্ত কথা জানালেন।

এসব শুনে বলরাম দাসের হৃদয় ভেঙে গেল। তাঁর চোখে অশ্রুর ধারা নেমে এলো। তিনি ভাবলেন, “হে প্রভু! আমার মতো অধম, পতিত, অপরাধী মানুষের জন্য তুমি নিজেই রথ থামিয়ে রেখেছ! এই কয়দিন তুমি যেন আমার জন্যই অনাহারে, অপেক্ষায় রয়েছ! তোমার এই অপরিসীম দয়া না থাকলে মানুষ তোমাকে ‘ভক্তবৎসল’ বলবে কেন?”

ভগবৎপ্রেমে আপ্লুত বলরাম আর এক মুহূর্তও দেরি করলেন না। দৌড়ে রথের কাছে এসে প্রাণভরে জগন্নাথদেবকে দর্শন করলেন। আনন্দাশ্রুতে তাঁর দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে গেল। তারপর তিনি দুই হাতে রথে স্পর্শ করে আলতো করে ঠেলে দিলেন।

অবিলম্বে সেই বিশাল রথ চলতে শুরু করল। যে রথ হাজার মানুষের শক্তিতে নড়েনি, তা এক ভক্তের স্পর্শে অনায়াসে গুণ্ডিচা মন্দিরের পথে এগিয়ে চলল।

এই হৃদয়স্পর্শী ঘটনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার সেই চিরন্তন অমৃতবাণী—

অপি চেৎ সুদুরাচারো ভজতে মামনন্যভাক্।
সাধুরেব স মন্তব্যঃ সম্যগ্ব্যবসিতো হি সঃ।।
ক্ষিপ্রং ভবতি ধর্মাত্মা শশ্বচ্ছান্তিং নিগচ্ছতি।
কৌন্তেয় প্রতিজানীহি ন মে ভক্তঃ প্রণশ্যতি।।

অর্থাৎ—যদি কোনো ব্যক্তি অত্যন্ত দুরাচারও হন, তবু যদি তিনি একান্তচিত্তে আমাকে ভজনা করেন, তবে তাকেও সাধু বলেই গণ্য করতে হবে। কারণ তাঁর সংকল্প সৎ। তিনি অচিরেই ধর্মপরায়ণ হয়ে ওঠেন এবং চিরস্থায়ী শান্তি লাভ করেন। হে কৌন্তেয়, তুমি দৃঢ়ভাবে ঘোষণা কর—আমার ভক্ত কখনও বিনষ্ট হয় না।

বলরাম দাসের এই কাহিনি আমাদের শেখায়—ভগবান মানুষের অতীত দেখেন না, তিনি দেখেন বর্তমান হৃদয়। মানুষের চোখে যে পাপী, ভগবানের চোখে সে-ই হতে পারে পরম প্রিয় ভক্ত, যদি তার হৃদয়ে থাকে অকৃত্রিম অনুতাপ, অটল বিশ্বাস এবং নিঃস্বার্থ প্রেম। ভক্তের এক ফোঁটা অশ্রু, একান্ত আত্মসমর্পণ এবং সত্যিকারের ভালোবাসার কাছে স্বয়ং ভগবানও বাঁধা পড়েন। তাই জগন্নাথ আজও যুগে যুগে ঘোষণা করেন—“ন মে ভক্তঃ প্রণশ্যতি”—আমার ভক্ত কখনও হারিয়ে যায় না।

—তত্ত্বমালা (শ্রীশ্রীরথযাত্রা তত্ত্ব) রচনা— শ্রীশ্রী ১০৮ স্বামী নিগমানন্দ সরস্বতী পরমহংসদেব।

**”বারাঙ্গনা” শব্দের অর্থ বারনারী, বারবনিতা, বেশ্যা বা যৌনকর্মী।

Loading