February 23, 2026

অতীতের আয়নায় বর্তমান: গোঘাটের খাটোগ্রাম-এ পাঁচ ভাইয়ের ‘সোনার সংসার’, এক ছাদের তলায় ভালোবাসার অনন্য নজির

 

সোমালিয়া ওয়েব নিউজঃ আধুনিকতার ঝাঁ চকচকে আবরণ পেরিয়ে এই গ্রামে ঢুকলেই চোখে পড়ে এক অন্য ছবি—মাটির গন্ধে, সম্পর্কের টানে আর পরিশ্রমের ঘামে গড়া এক যৌথ সংসার। রায় পরিবারের উঠোনে পা রাখলেই বোঝা যায়, এখানে জীবন এখনও প্রকৃতির ছন্দে বাঁধা। আধুনিকতার ইঁদুর দৌড়, ফ্ল্যাট কালচার আর ‘নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি’র যুগে যখন একসঙ্গে থাকা যেন ক্রমেই অতীতের স্মৃতি, তখন খাটোগ্রাম-এর এক সাধারণ গ্রামবাংলার উঠোনে দাঁড়ালে মনে হয় সময় যেন থমকে গেছে। বারান্দায় পাশাপাশি বসে ষাট-সত্তরোর্ধ্ব পাঁচ ভাইয়ের তাসের আড্ডা, উঠোন জুড়ে নাতি-নাতনিদের দৌড়ঝাঁপ, আর দুপুরে একসঙ্গে পাতা ভাতের থালা—সব মিলিয়ে যেন এক জীবন্ত স্মৃতিচিত্র, যেখানে ‘একসঙ্গে থাকা’ই সবচেয়ে বড় সার্থকতা।

রায় পরিবারের বড় ভাই অভয়পদ রায় অবিবাহিত, ব্যবসার সূত্রে আরামবাগে থাকেন। তবে বাকি চার ভাই—আসিতানন্দ, অমর, শ্যামল ও গুরুপদ—একই ছাদের তলায়, একই সংসারে দিন কাটান। কেউ চাষবাস দেখেন, কেউ ধানের ব্যবসা, কেউ গরু-বাছুরের দেখভাল করেন, আবার কেউ ট্র্যাক্টর-রোটার সামলান। প্রত্যেকেই পরিশ্রমী, বিনয়ী এবং সংসারের উন্নতিতেই তাঁদের স্বপ্ন।

আলাপচারিতায় উঠে আসে একটাই কথা—“একসঙ্গে থাকলে উন্নতি সহজ হয়।” কাজ ভাগ হয়ে যায়, দায়িত্বও ভাগ হয়। সন্তানদের মানুষ করতে সুবিধা হয়। মতবিরোধ যে হয় না তা নয়—কিন্তু তা ক্ষণিকের। খেতে বসে আলোচনা হলেই মিটে যায় মনোমালিন্য। দুপুর ও রাতের আহার একসঙ্গে বসেই—এই অলিখিত নিয়ম আজও অটুট। ভাইদের কথায়, বয়স বাড়লে একাকীত্ব গ্রাস করে, কিন্তু একান্নবর্তী সংসারে সেই অবসাদের জায়গা নেই; আপদে-বিপদে সবাই সবার পাশে।

এই পরিবারের তিন আদরের বোনও আছেন, যাঁরা উৎসব-অনুষ্ঠানে ছুটে আসেন বাপের বাড়ি। তাঁদের আক্ষেপ—সমাজের মানসিকতা বদলাচ্ছে, একসঙ্গে থাকার ইচ্ছে কমছে। তবে রায় পরিবারের ভিত এখনও দৃঢ়। যদিও বাড়ির কারও সরকারি চাকরি হয়নি—এটাই তাঁদের একমাত্র আক্ষেপ।

ছোট ভাই গুরুপদ রায়ের কথায়, “সামান্য মতবিরোধ হলে দাদারাই ঠিক করে দেন। বড় কোনও সমস্যা আজও হয়নি।” যৌথ পরিবারের সাফল্যের নেপথ্যে গৃহিণীদের ভূমিকা যে কতখানি, তা এখানে না এলে বোঝা যায় না। চার জা—চারটি ভিন্ন পরিবার থেকে এসেও আজ একসূত্রে বাঁধা। সকাল শুরু হয় এক থালায় বসে চা-মুড়ি খেয়ে। বড় জা রান্নাঘর সামলালেও বাকিরা সমানতালে সাহায্য করেন। বাড়িতে কোনও কাজের লোক নেই—কাচাকাচি, ঘর মোছা, দুধ দোয়ানো, গরুর দেখভাল—সবই নিজেদের হাতে। মতভেদ হলে এক থালায় মুড়ি মেখে খেয়েই মিটে যায় রাগ-অভিমান। বাড়ির পাশেই রয়েছে দোতলা পাকা গোয়ালঘর। সযত্নে বাঁধা গরু-বাছুর, পাশে গরুর খাবারের জন্য খড় কাটার মেশিন। নিজেদের জমিতে ফলানো তিল ও সরিষার শুকনো ডাঁটা গোয়ালঘরে মজুত করে রাখা হয়েছে—শুধু সাশ্রয়ের জন্য নয়, আত্মনির্ভরতারও নিদর্শন। গরুর গোবর থেকে তৈরি ঘুঁটে উঠোন জুড়ে শুকোচ্ছে—উল্টেপাল্টে রোদে দেওয়া হচ্ছে যত্ন করে। এই ঘুঁটেই গৃহস্থালির উনানের জ্বালানি। রান্নাঘরে এখনও জ্বলছে মাটির উনান, ধোঁয়ার গন্ধে মিশে আছে গ্রামবাংলার চিরচেনা আবেশ।খাওয়াদাওয়া শেষে বাড়ির গৃহিণী একটু আলাদা করে রাখেন অতিরিক্ত ভাত-তরকারি। কারণ হিন্দু ঘরে বিড়ালকে মা ষষ্ঠীর বাহন বলে মানা হয়। সেই বিশ্বাসে স্নেহভরে ডেকে খাওয়ানো হয় বাড়ির বিড়ালটিকে। বিশ্বাস আর ভালোবাসা এখানে আলাদা করে চেনার নয়—দুটোই মিশে আছে দৈনন্দিন জীবনে।দুপুরের খাওয়া শেষ। ভাইদের মধ্যে ছোটখাটো আলোচনা, বোঝাপড়া সেরে উঠোনে নেমেছে নীরবতা। জায়েরা একসঙ্গে শুকনো জামাকাপড় ভাঁজ করছেন। কাজের ফাঁকে ফাঁকে হাসির রোল উঠছে। তারপর একসাথে একটু বিশ্রাম—শুয়ে শুয়ে গল্প, সংসারের খুঁটিনাটি, সন্তানদের ভবিষ্যৎ, আবার কখনও নিছক হাসিঠাট্টা। আলাদা আলাদা ঘর হলেও মনগুলো যেন একই সুতোয় বাঁধা।এই বাড়িতে আত্মকেন্দ্রিকতার জায়গা নেই। আছে ভাগ করে নেওয়া দায়িত্ব, ভাগ করে নেওয়া সুখ-দুঃখ। দোতলা গোয়ালঘর, উঠোনে শুকোতে দেওয়া ঘুঁটে, উনানের ধোঁয়া, বিড়ালের জন্য আলাদা করে রাখা খাবার—সব মিলিয়ে এ যেন এক জীবন্ত ইতিহাস, যেখানে আধুনিকতার ভিড়েও টিকে আছে সম্পর্কের অনাবিল উষ্ণতা। আন্তরিকতা এতটাই গভীর যে, না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।

দুপুরে বাড়িতে গিয়ে দেখা মিলল গৃহশিক্ষক বিশ্বজিৎ ঘড়ুইয়ের। প্রায় ২৪ বছর ধরে তিনি এই বাড়িতে ছবি আঁকা শেখাতে আসছেন। তাঁর কথায়, “মালার মতো একই সুতোয় গাঁথা এই পরিবার। আগে যেমন দেখেছি, এখনও তেমনই—শুধু বয়স বেড়েছে, সম্পর্কের উষ্ণতা কমেনি।” তিনি আরও জানান, এই বাড়ির ছোট ছেলে অরিজিতের জন্য জেঠিমা হাতে দুধের গ্লাস নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন—যে দায়িত্ব সাধারণত মায়ের। এখানে মা-জেঠিমা, কাকা-কাকিমা—কোনও বিভাজন নেই; সকলেই সকলের সন্তান।

বিশ্বজিৎবাবুর মতে, একান্নবর্তী পরিবারে সন্তান মানুষ করা সহজ। দাদু-ঠাকুমা, কাকা-কাকিমা, মাসি-পিসির স্নেহ শিশুর মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা বাড়ায়। কিন্তু বর্তমান প্রজন্ম একসন্তানেই অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে; আত্মকেন্দ্রিকতার বেড়াজালে আটকে যাচ্ছে সম্পর্কের বিস্তার। পরিবার যত ছোট হচ্ছে, দায়িত্বও তত সঙ্কুচিত হচ্ছে—সন্তানরা হারাচ্ছে বড় পরিবারের স্নেহছায়া।

খাটোগ্রামের রায় পরিবার তাই আজ শুধু একটি পরিবার নয়—একটি দর্শন। যেখানে আত্মকেন্দ্রিকতার বদলে আছে সমব্যথিতা, বিভেদের বদলে ঐক্য, আর একাকীত্বের বদলে আছে একসাথে পথচলার অঙ্গীকার। আধুনিকতার ঝড়ের মধ্যেও এই ‘সোনার সংসার’ যেন মনে করিয়ে দেয়—ভালোবাসা আর সহমর্মিতাই পরিবারকে টিকিয়ে রাখার সবচেয়ে বড় ভিত্তি। এই রায় পরিবার তাই শুধু একটি সংসার নয়—এ এক আবেগ, এক আদর্শ, এক সোনালি সময়ের প্রতিচ্ছবি, যা আজও প্রমাণ করে দেয়—একসাথে থাকাই সবচেয়ে বড় শক্তি।

Loading