সোমালিয়া ওয়েব নিউজ: পশ্চিমবঙ্গে আর্থিকভাবে সচ্ছল পরিবারের রেশন কার্ড ডিএক্টিভেশন নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। বিভিন্ন মহলে দাবি করা হচ্ছে, দীর্ঘদিন ধরে যেসব পরিবার প্রকৃতপক্ষে সরকারি খাদ্য সহায়তার প্রয়োজনীয়তার বাইরে চলে গিয়েছে অর্থাৎ সচ্ছল পরিবার, তাদের রেশন কার্ড নিষ্ক্রিয় করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এর ফলে যেমন একদিকে প্রকৃত দরিদ্র ও প্রয়োজনীয় মানুষের কাছে সরকারি সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার সম্ভাবনা বাড়ছে, তেমনি অন্যদিকে অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত নিম্ন আয়ের মানুষও সমস্যার মুখে পড়েছেন বলে অভিযোগ উঠছে। বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাজ্যের খাদ্যমন্ত্রী অশোক কীর্তনীয়া সংবাদমাধ্যমে আবেদন করেছিলেন যে, যেসব পরিবারের আর্থিক অবস্থা এখন স্বচ্ছল, তারা স্বেচ্ছায় রেশন কার্ড সারেন্ডার করুন। তবে সেই আহ্বানে খুব বেশি সাড়া মেলেনি বলে জানা যায়। এরপর বিভিন্ন সূত্রে খবর, আর্থিকভাবে স্বচ্ছল পরিবারগুলির রেশন কার্ড ডিএক্টিভেট করার কাজ শুরু হয়েছে। দাবি করা হচ্ছে, যেসব পরিবারের বার্ষিক আয় প্রায় ৬ লক্ষ টাকা বা তার বেশি এবং চারচাকা ব্যক্তিগত গাড়ি রয়েছে, সেসব পরিবারের কার্ড যাচাই করে নিষ্ক্রিয় করা হচ্ছে। যদিও এই বিষয়ে সরকারিভাবে কী কী মানদণ্ড অনুসরণ করা হচ্ছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশিকা প্রকাশ করা জরুরি বলে মনে করছেন অনেকেই। সচেতন মহলের একাংশ এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, প্রকৃত উপভোক্তাদের হাতে সরকারি খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দিতে হলে আর্থিকভাবে স্বচ্ছল পরিবারগুলিকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া প্রয়োজন ছিল এবং এই কাজ আরও বহু বছর আগেই করা উচিত ছিল। প্রসঙ্গত, তৃণমূল কংগ্রেস সরকার ক্ষমতায় আসার পর কেন্দ্রীয় সরকারের জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইন (NFSA)-এর আওতায় নতুন রেশন কার্ড চালু হয়। কিন্তু দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর ধরে নতুন করে ব্যাপক যাচাই, উপভোক্তাদের আর্থিক অবস্থার মূল্যায়ন এবং অযোগ্য পরিবারগুলিকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার কাজ কার্যকরভাবে সম্পন্ন হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে অনেক আর্থিকভাবে স্বচ্ছল পরিবার এখনও পর্যন্ত সরকারি খাদ্যশস্যের সুবিধা পেয়ে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সময়ে আগের তুলনায় খাদ্যাভাব অনেকটাই কমেছে। ফলে অনেক পরিবার রেশনের চাল, গম বা আটা নিজেদের ব্যবহার না করে, অথবা খাদ্য দ্রব্যের গুণগত মান ভালো না থাকায় স্থানীয় মুদিখানা দোকান কিংবা ফেরিওয়ালাদের কাছে বিক্রি করে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে কেন্দ্র ও রাজ্য—উভয় সরকারেরই বিপুল পরিমাণ ভর্তুকির অর্থ অপচয় হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। সরকারি অর্থের এই অপচয়ের দায় কার, সেই প্রশ্নও তুলছেন বিভিন্ন মহল। তবে শুধুমাত্র আয় বা চারচাকা গাড়ির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া যথেষ্ট নয় বলেও মত প্রকাশ করেছেন সচেতন নাগরিকরা। তাঁদের মতে, পরিবারের মোট সম্পত্তি, বসতবাড়ির ধরন, জমির পরিমাণ, ব্যবসা, স্থায়ী সম্পদ এবং প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতাও বিবেচনায় নেওয়া উচিত। কারণ, অনেক সময় একই রেশন কার্ডে একাধিক ভাই বা একাধিক উপার্জনকারী সদস্যের নাম থাকলেও সকলের আর্থিক অবস্থা একরকম নয়। অনেক যৌথ পরিবারে দেখা যায়, একজন বা দু’জন সদস্যের আয় তুলনামূলক বেশি অথবা তাঁদের নামে একটি চারচাকা গাড়ি রয়েছে। কিন্তু পরিবারের বাকি সদস্যদের আয় খুবই সীমিত। বহু ক্ষেত্রে পৃথক পরিবার হিসেবে রেশন কার্ড বিভাজনের আবেদন করেও তা দীর্ঘদিন ধরে সম্পন্ন হয়নি। ফলে পুরো পরিবারের রেশন কার্ডই ডিএক্টিভেট হয়ে যাওয়ায় নিম্ন আয়ের সদস্যরাও সরকারি খাদ্য সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞদের একাংশের মত, যেসব পরিবারের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা নির্ধারিত সীমার নিচে রয়েছে, তাঁদের পুনরায় আবেদন করার সুযোগ দেওয়া উচিত। প্রয়োজন হলে পুনরায় ক্ষেত্রসমীক্ষা করে প্রকৃত উপভোক্তাদের রেশন কার্ড পুনরায় সক্রিয় করা যেতে পারে। একই সঙ্গে নতুন রেশন কার্ডের আবেদন এবং পারিবারিক বিভাজনের প্রক্রিয়াও দ্রুত সম্পন্ন করা প্রয়োজন। বর্তমানে অনেক গ্রাহক রেশন তুলতে গিয়ে হঠাৎ জানতে পারছেন তাঁদের রেশন কার্ড নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে। এতে রেশন ডিলারদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের বচসা ও উত্তেজনার ঘটনাও ঘটছে। অথচ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট পরিবার আগে থেকে কোনও সরকারি নোটিশ বা মোবাইলে বার্তা পাননি বলে অভিযোগ। এই পরিস্থিতিতে খাদ্য দপ্তরের প্রতি সচেতন মহলের দাবি, যে সমস্ত রেশন কার্ড ডিএক্টিভেট করা হয়েছে, সেই পরিবারের নিবন্ধিত মোবাইল নম্বরে এসএমএস পাঠিয়ে কারণ জানানো হোক। পাশাপাশি লিখিত নোটিশ, অনলাইন পোর্টালে স্ট্যাটাস এবং আপিল বা পুনর্বিবেচনার স্পষ্ট ব্যবস্থা চালু করা হোক। এতে অযথা বিভ্রান্তি কমবে এবং রেশন ডিলার ও গ্রাহকদের মধ্যে সংঘাতও অনেকটাই এড়ানো সম্ভব হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি ভর্তুকির সুবিধা অবশ্যই প্রকৃত দরিদ্র ও প্রয়োজনীয় মানুষের কাছে পৌঁছানো উচিত। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া যেন স্বচ্ছ, তথ্যভিত্তিক এবং মানবিক হয়। প্রকৃত উপভোক্তাদের বঞ্চিত না করে এবং যোগ্য ব্যক্তিদের নিজেদের বক্তব্য জানানোর সুযোগ দিয়ে রেশন ব্যবস্থার সংস্কার করা গেলে তবেই এই উদ্যোগ তার প্রকৃত উদ্দেশ্য সফল করবে।

![]()

More Stories
বড় সিদ্ধান্ত রাজ্য প্রশাসনে: আরও ৬ মাস মুখ্যসচিব পদে বহাল থাকছেন মনোজ কুমার আগরওয়াল
পশ্চিমবঙ্গে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন ব্যবস্থায় নতুন বিজ্ঞপ্তি: প্রশাসনিক কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন
আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়: দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে কড়া পদক্ষেপ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের