September 12, 2026

আজ বিভূতিভূষণের জন্মদিন—ফিরে আসুন অপুদের সেই হারিয়ে যাওয়া পথে

সোমালিয়া ওয়েব নিউজ: আজ বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মদিন। অথচ এই দিনটিতে তাঁকে শুধু জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে গেলেই কোথায় যেন বুকের ভিতর একটা অদ্ভুত শূন্যতা জমে ওঠে। মনে হয়, বাংলা সাহিত্য আজও তাঁর জন্য পথ চেয়ে বসে আছে। হয়তো নিশ্চিন্দিপুরের সেই পথটাও অপেক্ষা করে আছে—আবার একদিন অপু আর দুর্গা দৌড়ে যাবে কাশবনের মধ্যে দিয়ে, দূরে কোথাও ট্রেনের শব্দ উঠবে, আর বিস্ময়ে ভরা দু’টি শিশু চোখে ধরা দেবে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় স্বপ্ন।

কিন্তু দুর্গা আর ফিরে আসেনি।

অপু বড় হয়ে গেছে।

আর বিভূতিভূষণও বহু বছর আগে চলে গিয়েছেন।

তবু আশ্চর্যের কথা, তাঁর পৃথিবী এখনও কোথাও মরে যায়নি।

আজও শরতের সাদা কাশফুল দেখলে মনে হয়, এই বুঝি দুর্গা ছুটে আসবে। দূরে ট্রেনের শব্দ শুনলে মনে হয়, অপু এখনও দাঁড়িয়ে আছে বিস্ময়ে—লোহার সেই বিশাল অজানা জিনিসটিকে দেখে তার চোখে নতুন পৃথিবীর ডাক। একটি দরিদ্র পরিবারের ভাঙা ঘর, সর্বজয়ার মুখের চিন্তা, হরিহরের অসহায় স্বপ্ন—এসব কি শুধুই উপন্যাসের পাতা? না, এগুলো আমাদেরই জীবন, আমাদেরই চেনা মানুষের মুখ।

‘পথের পাঁচালী’ পড়তে পড়তে আমরা শুধু অপুদের গল্প পড়ি না, কোথায় যেন নিজেদের হারিয়ে যাওয়া শৈশবকেও খুঁজে পাই। যে শৈশব আর ফিরে আসবে না। যে বাড়ির উঠোন আজ হয়তো নেই, যে পুকুরে একদিন বিকেল কেটেছে, যে মানুষগুলো একসময় আমাদের মাথায় হাত রেখে বলতেন—তাঁরাও আজ স্মৃতি। বিভূতিভূষণের লেখা যেন সেই সব হারিয়ে যাওয়া মানুষের দরজা খুলে দেয়।

তারপর ‘অপরাজিত’। অপু এগিয়ে যায়। গ্রাম পেরিয়ে শহর, শৈশব পেরিয়ে যৌবন, এক পৃথিবী পেরিয়ে আর এক পৃথিবী। কিন্তু মানুষ যতই এগিয়ে যাক, পিছনে ফেলে আসা দিনগুলো কি কখনও সত্যিই পিছনে পড়ে থাকে? মায়ের মুখ, গ্রামের পথ, শৈশবের বন্ধু, পুরনো আকাশ—সবই তো মানুষের সঙ্গে অদৃশ্য হয়ে হেঁটে চলে। বিভূতিভূষণ যেন সেই কথাই বলতে চেয়েছেন—জীবন থামে না, কিন্তু হৃদয়ের ভিতরে কিছু পথ চিরকাল একই জায়গায় পড়ে থাকে।

‘আরণ্যক’-এর অরণ্যে দাঁড়িয়ে আজও মনে হয়, প্রকৃতি যেন মানুষের কাছে নীরব এক প্রশ্ন রেখে চলেছে। যে বন মানুষ কেটে ফেলে, যে গাছের পাশ দিয়ে নির্বিকার হেঁটে যায়, সেই প্রকৃতির বুকেও কি কোনও ব্যথা নেই? বিভূতিভূষণ অরণ্যকে শুধু দেখেননি, তাকে অনুভব করেছিলেন। তাই তাঁর অরণ্যের মধ্যে আজও হাওয়া বইলে মনে হয়, সেখানে লেখকের নিঃশ্বাস মিশে আছে।

আর ‘ইছামতী’র মতো তাঁর সৃষ্টিগুলি আমাদের শেখায়—নদী বয়ে যায়, মানুষ বদলে যায়, সময় বদলে যায়, কিন্তু মানুষের হাসি-কান্না, ভালোবাসা আর বিচ্ছেদের বেদনা থেকে যায়।

আজ তাঁর জন্মদিনে সবচেয়ে বেশি মনে হয়, বিভূতিভূষণ যদি আবার একবার ফিরে আসতেন! যদি তিনি দেখতে পেতেন তাঁর অপু আজও বাঙালির ঘরে ঘরে বেঁচে আছে। দুর্গার মৃত্যুতে আজও কত পাঠকের চোখ ভিজে ওঠে। যদি তিনি জানতে পারতেন, তাঁর লেখা পড়তে গিয়ে কত মানুষ নিজের মাকে খুঁজে পেয়েছে, নিজের গ্রামকে খুঁজে পেয়েছে, নিজের হারিয়ে যাওয়া ছোটবেলাটাকে খুঁজে পেয়েছে।

হয়তো তিনি মৃদু হেসে আবার চলে যেতেন কোনও অজানা গ্রামের পথে।

কাঁধে ব্যাগ, চোখে প্রকৃতির প্রতি সেই গভীর মুগ্ধতা।

আর আমরা দূর থেকে শুধু দেখতাম—একজন মানুষ হেঁটে যাচ্ছেন বাংলার মাটির পথ ধরে। তাঁর পায়ের ধুলোয় জন্ম নিচ্ছে অপু, দুর্গা, সত্যচরণ, কত অচেনা মানুষ, কত অমর গল্প।

আজ তাঁর জন্মদিনে তাই শুধু বলি না—শুভ জন্মদিন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়।

বলতে ইচ্ছে করে—আপনি কোথাও যাননি। আপনি এখনও আছেন।

আছেন শরতের কাশবনে।

আছেন দূরের ট্রেনের শব্দে।

আছেন গ্রামের মাটির গন্ধে।

আছেন একা কোনও শিশুর বিস্মিত চোখে।

আছেন মায়ের জন্য সন্তানের নিঃশব্দ কান্নায়।

আছেন সেই সব মানুষের হৃদয়ে, যারা জীবনের ব্যস্ততার মধ্যেও হঠাৎ কোনও পুরনো পথ দেখে থমকে দাঁড়িয়ে ভাবে—আহা, একদিন আমরাও তো এমনই ছিলাম!

বিভূতিভূষণ চলে গিয়েছেন, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি আমাদের ছেড়ে যায়নি। তাই তাঁর জন্মদিন আসলে একজন লেখকের জন্মদিন নয়—এ যেন বাঙালির হারিয়ে যাওয়া শৈশবের জন্মদিন, বাংলার মাটির গন্ধ ফিরে পাওয়ার দিন, আর স্মৃতির কাছে নিঃশব্দে ফিরে যাওয়ার দিন।

শুভ জন্মদিন, বিভূতিভূষণ।
আপনার লেখা যতদিন থাকবে, ততদিন বাংলার কোনও পথই পুরোপুরি হারিয়ে যাবে না।

Loading