প্রশাসনিক জবাবদিহিতা ও কর্মসংস্কারের অভাব: দুর্নীতির মূল কারণ কি শুধুই রাজনৈতিক?
সোমালিয়া ওয়েব নিউজ: দেশ ও সমাজে দুর্নীতি, অনিয়ম, বেআইনি তোলাবাজি এবং সরকারি প্রকল্পে অর্থ আত্মসাতের ঘটনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ রয়েছে। অভিজ্ঞ মহল ও সমাজ সচেতন নাগরিকদের একাংশের মতে, শুধুমাত্র রাজনৈতিক ব্যক্তি বা কর্মীদের দ্বারা এত বিস্তৃত দুর্নীতি সংঘটিত হওয়া বাস্তবে সম্ভব নয়; এর সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বিভিন্ন স্তরের সরকারি কর্মচারী ও আধিকারিকদের ভূমিকা, দায়িত্বহীনতা বা নজরদারির ঘাটতির বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। পঞ্চায়েত, ব্লক, মহকুমা, জেলা এবং রাজ্য স্তরের বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে যে সমস্ত প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়, সেখানে সংশ্লিষ্ট কর্মচারী, প্রকৌশলী, সচিব, পরিদর্শক ও আধিকারিকদের নিয়মিত তদারকি ও জবাবদিহিতা থাকলে বহু অনিয়ম প্রথম পর্যায়েই রোধ করা সম্ভব হতো বলে অনেকের অভিমত। সরকার পরিবর্তন হলেও প্রশাসনের একটি অংশের মানসিকতা ও কাজের ধরনে প্রত্যাশিত পরিবর্তন দেখা যায়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে। অনেকের মতে, ব্যক্তিগত সুবিধা, অতিরিক্ত আয় বা প্রভাব বজায় রাখার আশায় কিছু অসাধু কর্মচারী ও আধিকারিক নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করে প্রকৃত সমস্যার পরিবর্তে আংশিক তথ্য তুলে ধরেন, যার ফলে জনপ্রতিনিধিরা অনেক সময় সমস্যার গভীরে পৌঁছাতে পারেন না এবং শুধুমাত্র উপরিভাগের সমাধানেই সীমাবদ্ধ থাকতে হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোনো পেট্রোল পাম্পে যদি গ্রাহককে কম তেল দেওয়া হয়, তাহলে শুধু পাম্প মালিক বা কর্মচারীদের নয়, সংশ্লিষ্ট পরিমাপ ও মান নিয়ন্ত্রণকারী সরকারি আধিকারিকদের নিয়মিত তদারকির বিষয়টিও প্রশ্নের মুখে পড়ে। একইভাবে ১০০ দিনের কাজে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে পঞ্চায়েতের প্রকৌশলী, সচিব বা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক আধিকারিকদের দায়িত্বও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। রেশন ব্যবস্থায় দুর্নীতি, নিম্নমানের রাস্তা নির্মাণ, সরকারি হাসপাতালে পরিষেবার ঘাটতি, ভূমি ও ভূমি রাজস্ব দপ্তরে দালালচক্রের দৌরাত্ম্য—এসব ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট তদারকিকারী আধিকারিকদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। যদিও প্রতিটি ক্ষেত্রে দায় নির্ধারণের জন্য নিরপেক্ষ তদন্ত অপরিহার্য, তবে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে শুধু রাজনৈতিক ব্যক্তি বা ঠিকাদার নয়, সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মচারী ও আধিকারিকদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলে মত প্রকাশ করছেন অনেকেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে প্রতিটি সরকারি দপ্তরে ডিজিটাল সার্ভেল্যান্স, অনলাইন ফাইল ট্র্যাকিং, বায়োমেট্রিক উপস্থিতি, সিসিটিভি নজরদারি, কর্মসম্পাদন মূল্যায়ন এবং প্রকল্পভিত্তিক রিয়েল-টাইম মনিটরিং চালু করা জরুরি। এতে কোন কর্মচারী কত কাজ করছেন, কোন ফাইল কতদিন ধরে অমীমাংসিত রয়েছে এবং বিলম্বের কারণ কী—তা সহজেই পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। অনেকেই সরকারি ও বেসরকারি কর্মসংস্কৃতির তুলনাও করছেন। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের নিয়মিত কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন, সুপারভাইজারের নজরদারি এবং কাজের ভিত্তিতে পুরস্কার বা শাস্তির ব্যবস্থা থাকলেও সরকারি দপ্তরে সেই সংস্কৃতি এখনও পর্যাপ্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও অসংখ্য সরকারি কর্মচারী নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন, তবুও কর্মবিমুখতা, দায়িত্বজ্ঞানহীনতা এবং জনসেবার প্রতি অনীহার অভিযোগও অস্বীকার করা যায় না। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কর্মস্থলের প্রতি দায়িত্ববোধ। বহু সরকারি অফিসে পরিচ্ছন্নতা, রক্ষণাবেক্ষণ ও সরকারি সম্পদের যত্নের অভাব চোখে পড়ে। যে দপ্তর থেকে একজন কর্মচারীর জীবিকা নির্বাহ হয়, সেই কর্মস্থলকে নিজের প্রতিষ্ঠানের মতো যত্ন নেওয়ার মানসিকতা গড়ে তোলাও প্রশাসনিক সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে মনে করছেন অনেকে। তাঁদের মতে, সৎ, দক্ষ ও কর্মনিষ্ঠ সরকারি কর্মচারীদের যথাযথ সম্মান ও পুরস্কার দেওয়ার পাশাপাশি প্রমাণিত দুর্নীতি, গাফিলতি ও অসদাচরণের ক্ষেত্রে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা উচিত। সর্বোপরি, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, প্রশাসন ও নাগরিক সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং কর্মসংস্কারের উন্নয়ন ঘটাতে পারলেই একটি দুর্নীতিমুক্ত, দক্ষ ও জনমুখী প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন অভিজ্ঞ মহল।

![]()

More Stories
নলবাহিত পানীয় জল প্রকল্পে প্রশ্নের মুখে গুণগত মান! পাইপ ফেটে জল অপচয়, ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ, বাড়ছে নজরদারির দাবি
আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পে কারা পাবেন সুযোগ? রেশন কার্ডের পুরনো ত্রুটিতে বঞ্চনার আশঙ্কা, উঠছে পুনরায় যাচাইয়ের দাবি
বড় সিদ্ধান্ত রাজ্য প্রশাসনে: আরও ৬ মাস মুখ্যসচিব পদে বহাল থাকছেন মনোজ কুমার আগরওয়াল