সোমালিয়া ওয়েব নিউজ; রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পর প্রশাসনিক কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা আজ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিধানসভা নির্বাচনে নতুন সরকার ক্ষমতায় এলেও পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতি, জেলা পরিষদ এবং পুরসভার অধিকাংশ বোর্ড এখনও পূর্ববর্তী রাজনৈতিক দলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এর ফলে বহু এলাকায় নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সক্রিয় উপস্থিতি ও প্রশাসনিক তৎপরতা আগের মতো দেখা যাচ্ছে না। রাজনৈতিক কারণ, নিরাপত্তাজনিত আশঙ্কা কিংবা দুর্নীতির অভিযোগ বা ডিম থেরাপির ভয়—যে কারণই থাকুক না কেন, যদি জনপ্রতিনিধিরা তাঁদের নির্দিষ্ট দপ্তরে নিয়মিত উপস্থিত না হন, তাহলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের উপর। জন্ম-মৃত্যু সংক্রান্ত শংসাপত্র, নিকাশি, রাস্তা, পানীয় জল, আলো, পরিবেশ সংরক্ষণসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় বহু পরিষেবা ব্যাহত হয় এবং স্থানীয় সমস্যাগুলি দ্রুত সমাধানের সুযোগ কমে যায়। এই বিষয়টি নিয়ে বিধায়ক দিলীপ ঘোষ একাধিকবার সংবাদমাধ্যম এবং বিধানসভায় সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধিদের নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবে এখনও বহু এলাকায় প্রশাসনিক অচলাবস্থা কাটেনি। এর ফলে এমন এক নীরব প্রশাসনিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে, যার সুযোগ নিচ্ছে এক শ্রেণির অসাধু, সমাজবিরোধী ও দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তি। স্থানীয় স্তরে নিয়মিত নজরদারি না থাকায় বিভিন্ন এলাকা থেকে অনুমতি ছাড়া মাটি কাটা ও পাচার, সরকারি বা জনসাধারণের রাস্তা দখল, যেখানে-সেখানে শিল্পবর্জ্য ও মিলের ছাই ফেলে পরিবেশ দূষণ, প্লাস্টিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, অবৈধভাবে গাছ কেটে ফেলা, নালা ও জলনিকাশি ব্যবস্থায় আবর্জনা ফেলে জলপ্রবাহ বন্ধ করে দেওয়া, সরকারি জমি দখল এবং বিভিন্ন ধরনের বেআইনি নির্মাণের অভিযোগ সামনে আসছে। এসব অনিয়মের ফলে শুধু পরিবেশের ক্ষতিই হচ্ছে না, ভবিষ্যতে জলাবদ্ধতা, কৃষিক্ষতি, জনস্বাস্থ্য সমস্যা এবং আইনশৃঙ্খলার ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ধরনের অনিয়ম দীর্ঘদিন চলতে থাকলে তার রাজনৈতিক দায় শেষ পর্যন্ত বর্তমান সরকারকেই বহন করতে হবে। সাধারণ মানুষ প্রশাসনিক ব্যর্থতার জন্য ক্ষমতাসীন সরকারের কাছেই জবাবদিহি চান। তাই এখনই গ্রামীণ প্রশাসনের উপর বিশেষ নজরদারি বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। প্রশাসক নিয়োগ একটি সাময়িক সমাধান হতে পারে, কিন্তু একজন প্রশাসকের পক্ষে প্রতিটি গ্রাম, প্রতিটি পঞ্চায়েত এলাকা বা প্রতিটি ওয়ার্ডে নিয়মিত ঘুরে সমস্ত সমস্যা চিহ্নিত করা বাস্তবসম্মত নয়। তাই বর্তমান সময়ে প্রযুক্তিনির্ভর জনঅংশগ্রহণই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান। শহরাঞ্চলের পরিচ্ছন্নতা ও নাগরিক সমস্যার দ্রুত সমাধানের লক্ষ্যে যেমন মাননীয়া মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল একটি মোবাইল অ্যাপ চালুর উদ্যোগ নিয়েছেন, তেমনই পঞ্চায়েত ও গ্রামীণ উন্নয়ন দপ্তরের পক্ষ থেকেও একটি আধুনিক ডিজিটাল অভিযোগ ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। সেই অ্যাপের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ চাইলে নাম গোপন রেখে ছবি, ভিডিও এবং ঘটনার সুনির্দিষ্ট অবস্থানসহ অভিযোগ সরাসরি সংশ্লিষ্ট পঞ্চায়েত বা প্রশাসনের কাছে পাঠাতে পারবেন। অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত, নিষ্পত্তি এবং তার অগ্রগতিও ডিজিটালভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। এতে প্রশাসনের কাছে দ্রুত তথ্য পৌঁছাবে, দুর্নীতির সুযোগ কমবে, অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যেও প্রশাসনের প্রতি আস্থা বাড়বে। একটি শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক গ্রামীণ প্রশাসন গড়ে তুলতে রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এখন সময়ের দাবি। কারণ প্রশাসনের চোখ সব জায়গায় একসঙ্গে পৌঁছানো সম্ভব নয়, কিন্তু সচেতন নাগরিকদের চোখ ও তথ্যপ্রযুক্তির সমন্বয় ঘটলে প্রতিটি গ্রামই প্রশাসনের নজরদারির আওতায় আসতে পারে। তাই বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধু একটি সংকট হিসেবে না দেখে, বরং গ্রামীণ প্রশাসনকে আরও স্বচ্ছ, দুর্নীতিমুক্ত, জবাবদিহিমূলক এবং জনমুখী করে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

![]()

More Stories
জন্মদিনে বিশেষ কর্মসূচির ঘোষণা, ১৬ আগস্ট বীরভূমে সিংহবাহিনীর প্রথম জেলা সম্মেলন
সরকারি বিদ্যালয়ের সাইকেল প্রকল্পের নতুন নাম ‘সারথি’
নলবাহিত পানীয় জল প্রকল্পে প্রশ্নের মুখে গুণগত মান! পাইপ ফেটে জল অপচয়, ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ, বাড়ছে নজরদারির দাবি