September 10, 2026

কৌশিকী অমাবস্যা: অসুরবিনাশী মহাশক্তির আবির্ভাব ও তন্ত্রসাধনার মহোৎসব

সোমালিয়া ওয়েব নিউজ: সনাতন সংস্কৃতি ও শাক্ত ঐতিহ্যে ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অমাবস্যা তিথিটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ধর্মীয় শাস্ত্র ও লোকবিশ্বাসে এই বিশেষ তিথি ‘কৌশিকী অমাবস্যা’ বা ‘তারা রাত্রি’ নামে সুবিখ্যাত। বিশেষত বাংলা ও কামরূপের তন্ত্রসাধকদের কাছে এটি আত্মশুদ্ধি, শক্তি আরাধনা এবং সিদ্ধিলাভের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লগ্ন। প্রতি বছর এই তিথিতে বীরভূমের পুণ্যপীঠ তারাপীঠ মহাশ্মশান রূপ নেয় এক বিশাল আধ্যাত্মিক মিলনক্ষেত্রে।

পৌরাণিক প্রেক্ষাপট ও দেবীর আবির্ভাব মার্কণ্ডেয় পুরাণের অন্তর্ভুক্ত ‘শ্রীশ্রীচণ্ডী’ অনুযায়ী, অসুররাজ শুম্ভ ও নিশুম্ভের প্রবল অত্যাচারে স্বর্গচ্যুত দেবতারা যখন হিমালয়ে গিয়ে মহামায়ার স্তব করেছিলেন, তখন দেবী পার্বতীর দেহের কোষ বা বহিরাবরণ থেকে এক অপরূপা ও তেজোময়ী দেবীর প্রকাশ ঘটে। যেহেতু তিনি মাতৃদেহের কোষ থেকে নির্গত হয়েছিলেন, তাই তাঁর নামকরণ হয় দেবী কৌশিকী।

অসুর ভ্রাতৃদ্বয় ব্রহ্মার বরে বলীয়ান ছিল—গর্ভজাত কোনো নারী তাদের বধ করতে পারবে না। অযোনিসম্ভূতা দেবী কৌশিকী সেই বরবাক্য অটুট রেখেই রণাঙ্গনে অবতীর্ণ হন। তাঁর রূপের মোহে অন্ধ হয়ে শুম্ভ-নিশুম্ভ তাঁকে বন্দি করার উদ্দেশ্যে সেনাপতি চণ্ড ও মুণ্ডকে প্রেরণ করলে দেবী কালিকার রূপ ধারণ করে তাদের সংহার করেন এবং ‘চামুণ্ডা’ নামে অভিহিত হন। এরপর মূল যুদ্ধে শুম্ভ ও নিশুম্ভকে বধ করে দেবী সমগ্র ত্রিলোককে দানবীয় ত্রাস থেকে মুক্ত করেন। সেই পৌরাণিক বিজয় ও মহাশক্তির প্রকাশের মুহূর্তকেই কৌশিকী অমাবস্যা হিসেবে স্মরণ করা হয়।

আধ্যাত্মিক ও তান্ত্রিক গুরুত্ব শাক্ত সাধকদের বিশ্বাস অনুযায়ী, কৌশিকী অমাবস্যার নিশীথ রাত্রি সাধারণ অমাবস্যার চেয়ে আধ্যাত্মিক দিক থেকে বহু গুণ শক্তিশালী। প্রচলিত বিশ্বাস ঊনবিংশ শতকের সিদ্ধ তন্ত্রসাধক শ্রীশ্রী বামাখ্যাপা তারাপীঠের শ্বেতশিমুল বৃক্ষমূলে এই অমাবস্যাতেই কঠোর তপস্যার মধ্য দিয়ে দেবী তারার প্রত্যক্ষ দর্শন ও সিদ্ধি অর্জন করেছিলেন। ফলে তারাপীঠের ইতিহাসে তিথিটি সর্বোচ্চ মর্যাদা পেয়ে আসছে। ‘কোষ’ শব্দটির অন্তর্নিহিত অর্থ আবরণ বা মোহজাল। সাধকদের মতে, এই রাতে যথাযথ মন্ত্রজপ ও একাগ্র আরাধনা মানুষের ভেতরের জড়তা, মোহ ও কুপ্রবৃত্তি নাশ করে চেতনার নতুন আলোকদ্বার উন্মোচন করে।

ভক্ত সমাগম ও লোকবিশ্বাস এই তিথিতে ভক্তরা সারাদিন উপবাস থেকে রাত্রিবেলা দেবী তারার উদ্দেশ্যে রক্তজবা, ধূপ-দীপ ও বিশেষ ভোগ নিবেদন করেন। সাধারণ বিশ্বাস অনুযায়ী, এই পুণ্যলগ্নে ভক্তিভরে প্রার্থনা করলে জীবনের যাবতীয় সংকট, দুরারোগ্য ব্যাধি, অশুভ গ্রহের কুপ্রভাব এবং নেতিবাচক শক্তি দূরীভূত হয়।

মহাশ্মশানের ধোঁয়া, যজ্ঞের সুবাস ও তারামায়ের জয়ধ্বনিতে এই তিথি এক অদ্ভুত গম্ভীর ও ভক্তিঘন রূপ ধারণ করে। সব মিলিয়ে কৌশিকী অমাবস্যা কেবল কোনো তিথিপালন নয়, বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে মহাশক্তির বিজয় এবং অন্ধকার ভেদ করে আলোর অভিমুখে যাত্রার এক চিরন্তন শাক্ত উৎসব।

Loading