সংস্কার আন্দোলন থেকে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক পথচলা, এখনও টিকে আছে একেশ্বরবাদ ও মানবকল্যাণের ভাবনা
সোমালিয়া ওয়েব নিউজ: প্রায় দুই শতাব্দী আগে বাংলার সমাজজীবনে যে প্রশ্নগুলি নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছিল—ঈশ্বরের ধারণা, মূর্তিপূজা, জাতিভেদ, নারীশিক্ষা, সতীদাহ, সামাজিক কুসংস্কার—তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হয়ে উঠেছিল ব্রাহ্মসমাজ। রাজা রামমোহন রায়ের হাত ধরে ১৮২৮ সালে যে আন্দোলনের সূচনা, সময়ের সঙ্গে তার সংগঠন বদলেছে, একাধিক ভাগে বিভক্ত হয়েছে, আবার তার আদর্শের নানা দিক শিক্ষা ও সমাজসংস্কারের ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়েছে। আজও কলকাতায় ব্রাহ্মসমাজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
১৮২৮ সালের ২০ অগস্ট কলকাতায় রামমোহন রায় ও তাঁর সহযোগীদের উদ্যোগে ব্রাহ্মসমাজ আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। ১৮৩০ সালের ২৩ জানুয়ারি প্রথম উপাসনাগৃহ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সেই আন্দোলন সাংগঠনিক রূপ পায়। মূল ভাবনা ছিল—এক সর্বোচ্চ ঈশ্বরের উপাসনা এবং ধর্মীয় জীবনে যুক্তি ও নৈতিকতার গুরুত্ব প্রতিষ্ঠা।
রামমোহনের চিন্তা অবশ্য ১৮২৮-এর অনেক আগে থেকেই তৈরি হচ্ছিল। ১৮১৫ সালে তিনি আত্মীয় সভা প্রতিষ্ঠা করেন। ধর্মীয় সত্য, একেশ্বরবাদ এবং সামাজিক প্রশ্ন নিয়ে সেখানে আলোচনা হত। সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধেও তিনি ধারাবাহিকভাবে জনমত তৈরি করেন।
ব্রাহ্মসমাজের প্রাথমিক কর্মকাণ্ড ধর্মীয় সংস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। নারীশিক্ষা, জাতিভেদবিরোধিতা, সামাজিক কুসংস্কারের বিরোধিতা এবং শিক্ষার প্রসারও এই আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে কেশবচন্দ্র সেনের নেতৃত্বে নারীশিক্ষা ও সামাজিক সংস্কারের কর্মসূচি আরও বিস্তৃত হয়।
১৮৭০ সালে কেশবচন্দ্র সেন ইন্ডিয়ান রিফর্ম অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠা করেন। নারীশিক্ষা, সাধারণ ও কারিগরি শিক্ষা, সস্তায় সাহিত্য প্রকাশ এবং সমাজকল্যাণ ছিল তার কাজের অন্যতম ক্ষেত্র। ১৮৭২ সালের বিবাহ-সংক্রান্ত আইনও ব্রাহ্ম সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে যুক্ত।
রামমোহন রায় ১৮৩০ সালে ইংল্যান্ডে যান এবং ১৮৩৩ সালে সেখানে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর পর ব্রাহ্মসমাজ কিছু সময় দুর্বল হয়ে পড়ে। পরে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর আন্দোলনটিকে নতুন করে সংগঠিত করেন। ১৮৪৩ সালে তিনি ব্রাহ্মসমাজে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেন এবং তত্ত্ববোধিনী সভা ও তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা-র মাধ্যমে ধর্মীয় ও বৌদ্ধিক চর্চাকে নতুন গতি দেন।
এরপর ১৮৫৭ সালে কেশবচন্দ্র সেন ব্রাহ্মসমাজে যোগ দিলে আন্দোলনে নতুন উদ্যম দেখা যায়। কিন্তু সংস্কারের গতি ও ধর্মীয় ভাবনা নিয়ে দেবেন্দ্রনাথ ও কেশবচন্দ্রের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়।
এই মতপার্থক্যের ফলেই ১৮৬৬ সালে কেশবচন্দ্র সেনের নেতৃত্বে ব্রাহ্মসমাজ অব ইন্ডিয়া আলাদা হয়ে যায়। পরে কেশবচন্দ্রের নেতৃত্বাধীন অংশের মধ্যেও মতবিরোধ দেখা দেয়। ১৮৭৮ সালে আনন্দমোহন বসু, শিবচন্দ্র দেব, শিবনাথ শাস্ত্রী ও উমেশচন্দ্র দত্ত-সহ একদল ব্রাহ্ম সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠা করেন।
ফলে আজ “ব্রাহ্মসমাজ” বলতে একটিমাত্র কেন্দ্রীয় সংগঠনকে বোঝানো হয় না। ঐতিহাসিকভাবে আদি ব্রাহ্মসমাজ, ব্রাহ্মসমাজ অব ইন্ডিয়া এবং সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ-সহ বিভিন্ন ধারা তৈরি হয়েছে।
উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে বিশ শতকের গোড়ায় ব্রাহ্ম আন্দোলনের প্রভাব বাংলার বাইরে বিভিন্ন অঞ্চলেও পৌঁছেছিল। ব্রাহ্মসমাজের নিজস্ব ইতিহাসে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯১২ সালের মধ্যে সারা দেশে ২৩২টি ব্রাহ্মসমাজ সক্রিয় ছিল। পরে অবশ্য এই বিস্তার ধীরে ধীরে কমে আসে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গেও ব্রাহ্ম ঐতিহ্যের গভীর সম্পর্ক ছিল। ১৯১১ সালে তিনি আদি ব্রাহ্মসমাজের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং তাঁর চিন্তায় ব্রাহ্ম একেশ্বরবাদ ও মানবতাবাদী ভাবনার প্রভাব দেখা যায়।
সময়ের সঙ্গে ব্রাহ্মসমাজ আর আগের মতো বৃহৎ সামাজিক সংস্কার আন্দোলন নেই। তবে আদর্শ ও প্রতিষ্ঠান—দুই ক্ষেত্রেই এর অস্তিত্ব রয়েছে। বিশেষ করে সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ এখনও ধর্মীয় উপাসনা, শিক্ষা, সমাজকল্যাণ এবং বিভিন্ন জনহিতকর কাজের সঙ্গে যুক্ত। সংগঠনটির নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, তাদের সঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গ্রন্থাগার ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে।
ব্রাহ্ম আন্দোলনের শিক্ষা-সংস্কারের উত্তরাধিকারও উল্লেখযোগ্য। নারীশিক্ষা ও সাধারণ শিক্ষার প্রসারে ব্রাহ্ম নেতারা উনিশ শতকে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ব্রাহ্মসমাজ-সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে কলকাতার ব্রাহ্ম বালিকা শিক্ষালয়-সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম ঐতিহাসিকভাবে উল্লেখযোগ্য।
২০০ বছর পর প্রশ্নটা কোথায়?১৮২৮ সালে যে আন্দোলনের সামনে প্রশ্ন ছিল—সমাজকে কুসংস্কার ও বৈষম্য থেকে কীভাবে বের করে আনা যায়, দুই শতাব্দী পরে সেই প্রশ্নের অনেকটাই বদলে গেছে। ব্রাহ্মসমাজের বর্তমান কর্মকাণ্ড তাই মূলত ঐতিহ্য সংরক্ষণ, ধর্মীয় চর্চা, শিক্ষা ও সমাজসেবাকে ঘিরে।
তবে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব শুধু একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ইতিহাসে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলার নবজাগরণ, নারীশিক্ষা, সামাজিক সংস্কার, জাতিভেদবিরোধী চিন্তা এবং আধুনিক যুক্তিবাদী মননের বিকাশের ইতিহাসে রামমোহন রায় ও ব্রাহ্মসমাজ একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে রয়েছে।
১৮২৮ থেকে ২০২৬—প্রায় দুই শতাব্দীর পথ। সংগঠন বদলেছে, শাখা তৈরি হয়েছে, প্রভাবের পরিধিও কমেছে; কিন্তু একেশ্বরবাদ, যুক্তিবাদ, মানবিকতা ও সমাজসংস্কারের যে প্রশ্নগুলি নিয়ে রামমোহন যাত্রা শুরু করেছিলেন, সেগুলি এখনও ইতিহাসের আলোচনায় প্রাসঙ্গিক।


![]()

More Stories
রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পুনরুদ্ধারে উদ্যোগ সনাতনী স্বাস্থ্য সেনার
দলীয় সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করার নির্দেশ নীতিন নবীনের
গুন্ডাদমন বিল নিয়ে জল্পনা, রাষ্ট্রপতি ফেরত পাঠানোর খবর ভিত্তিহীন: মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী