October 21, 2026

খেলার ছলে শুরু, আজ জগজ্জননী মা দুর্গার আরাধনা! বাজুয়ায় ছোটদের হাতে গড়া পুজোয় ফুটে উঠেছে বিশ্বাস, ভালোবাসা ও বাঙালির সংস্কৃতি

সোমালিয়া ওয়েব নিউজ:  বড় বড় ক্লাবের জাঁকজমকপূর্ণ পুজো, বারোয়ারি পুজোর চোখধাঁধানো আলোকসজ্জা কিংবা বনেদি বাড়ির শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্য—দুর্গাপুজোর এই সমস্ত পরিচিত ছবি তো আমরা দেখেছি। কিন্তু একেবারে ছোট ছোট ছেলেদের নিজেদের হাতে তৈরি মণ্ডপ, নিজের হাতে গড়া প্রতিমা আর মনের গভীরের বিশ্বাসকে সম্বল করে জগজ্জননী মা দুর্গার আরাধনা? এমন দৃশ্য সত্যিই মন ছুঁয়ে যায়। কারণ এখানে পুজোর আয়োজনের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে ছোটদের নিষ্পাপ ভক্তি, নিজেদের সংস্কারের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরে রাখার এক আন্তরিক প্রচেষ্টা।

এমনই এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগের সাক্ষী গোঘাটের রঘুবাটি অঞ্চলের বাজুয়া। সেখানেই রয়েছে ছোটদের দুর্গাপুজো। ‘বাজুয়া কোবরা গ্যাংস্টার ক্লাব’—নামটি হয়তো প্রচলিত ধর্মীয় আয়োজনের সঙ্গে খুব একটা মেলে না। কিন্তু এই নামের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে একদল কচিকাঁচার স্বপ্ন, পরিশ্রম, ভালোবাসা আর মা দুর্গার প্রতি গভীর আস্থা।

প্রায় চার বছর ধরে ১২-১৩ জন খুদে সদস্যকে সঙ্গে নিয়ে এই পুজো করে আসছে তারা। প্রত্যেকেই স্কুলের ছাত্র। পড়াশোনা, স্কুলের কাজ, পরীক্ষার প্রস্তুতি—সবকিছুর মাঝেই একটু একটু করে সময় বের করে তারা। কেউ মণ্ডপ তৈরি করে, কেউ প্রতিমা গড়ে, কেউ পুজোর জোগাড় করে, আবার কেউ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা থেকে শুরু করে ফুল সংগ্রহের দায়িত্ব সামলায়। বড়দের মতো বিপুল অর্থ বা বাহারি আয়োজন তাদের নেই। কিন্তু যা আছে, তা হল নিজেদের হাতে কিছু করে দেখানোর অদম্য ইচ্ছা এবং মায়ের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা।

প্রায় ১০ থেকে ১১ হাজার টাকার সামান্য বাজেটেই তাদের এই পুজোর আয়োজন। নেই কোনও সরকারি অনুদান। প্রতিবেশীরা পাশে দাঁড়ান, সামনের দোকানদারেরাও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। আর সেই সামান্য সহযোগিতার সঙ্গে ছোটদের শ্রম ও আন্তরিকতা মিলিয়েই গড়ে ওঠে তাদের পুজোর জগৎ।

এই পুজোর অন্যতম আকর্ষণ বিশ্বদেব সাঁতরা। নবম শ্রেণির এই ছাত্র ছোটবেলা থেকেই প্রতিমা তৈরির প্রতি আগ্রহী। অন্যের প্রতিমা দেখে দেখে প্রথমে ছোট ছোট মূর্তি তৈরি করত সে। সেই শখই ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে সৃষ্টির আনন্দে। এখন নিজের হাতে আগের তুলনায় বড় প্রতিমা তৈরি করেছে বিশ্বদেব। মাটির স্পর্শে ধীরে ধীরে ফুটিয়ে তুলেছে দেবীর রূপ। যে হাতে বই-খাতা নিয়ে স্কুলে যাওয়ার কথা, সেই হাতেই গড়ে উঠছে মৃন্ময়ী মা দুর্গার প্রতিমা। এই সৃষ্টির মধ্যে রয়েছে তার নিষ্ঠা, ভালোবাসা আর নিজের বিশ্বাসকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার আনন্দ।

একাদশ শ্রেণির ছাত্র আকাশ নাথের কথাতেও ধরা পড়েছে তাদের স্বপ্ন ও সীমাবদ্ধতার ছবি। সে জানিয়েছে, পুজোর জন্য অনুদান পেলে খুব ভালো হয়। কিন্তু তারা সকলেই ছাত্র, বয়সেও ছোট। তাই কীভাবে প্রশাসনের কাছে আবেদন করতে হয়, সেই বিষয়ে অভিজ্ঞতা না থাকায় এখনও সাহায্যের জন্য আবেদন জানাতে পারেনি তারা।

তবে এই ছোট্ট পুজোর সবচেয়ে সুন্দর দিক হল, এখানে প্রত্যেকেরই নির্দিষ্ট দায়িত্ব রয়েছে। অর্ধেন্দু সিংয়ের কাজ বিকেলে জল ছিটিয়ে ঝাঁট দেওয়া, পুজো প্রাঙ্গণ পরিষ্কার রাখা এবং রাতের জোগাড় সামলানো। শুভদীপ সাঁতরা ভোরে উঠে ফুল সংগ্রহ করে, ফলমূল কেটে দেয় এবং পুজোর প্রয়োজনীয় সামগ্রী প্রস্তুত করতে সাহায্য করে। সুব্রত সাঁতরার দায়িত্ব জল তোলা, দোকানবাজার করা, মালা তৈরি করা-সহ নানা কাজ সামলানো। আর তাদের বন্ধুদের মধ্যেই রয়েছে পুরোহিতের দায়িত্ব পালন করার মতো সদস্য, যাঁর প্রতিদিনের দক্ষিণা মাত্র ৫১ টাকা।

বড়দের কাছে এই কাজগুলো হয়তো খুবই সাধারণ। কিন্তু ছোটদের কাছে এগুলোই এক একটি বড় দায়িত্ব। এখানে কেউ শুধু পুজো দেখতে আসে না, প্রত্যেকেই পুজোর অংশীদার। কেউ ফুল তোলে, কেউ প্রতিমা গড়ে, কেউ মণ্ডপ সাজায়—আর এভাবেই নিজেদের অজান্তেই তারা শিখে নিচ্ছে দায়িত্ববোধ, সহযোগিতা, শৃঙ্খলা এবং একে অপরের পাশে থাকার শিক্ষা।

এলাকার বাসিন্দা বিশ্বজিৎ সাঁতরা জানিয়েছেন, প্রথমদিকে এই ছোট ছেলেরা খেলার ছলেই পুজো শুরু করেছিল। সেই ছোট্ট উদ্যোগই ধীরে ধীরে বড় হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের আগ্রহ বেড়েছে, বেড়েছে দায়িত্ববোধও। আজ সেই খেলার ছলে শুরু হওয়া আয়োজনই হয়ে উঠেছে তাদের বিশ্বাস ও ভালোবাসার এক বিশেষ প্রকাশ।

আমাদের সমাজে ছোটদের কালীপুজো কিংবা সরস্বতীপুজোর আয়োজনের ছবি অনেক সময় দেখা যায়। কিন্তু নিজেদের উদ্যোগে দুর্গাপুজো করা, প্রতিমা তৈরি থেকে শুরু করে মণ্ডপ নির্মাণ এবং পুজোর যাবতীয় দায়িত্ব সামলানো—এ এক অন্যরকম প্রচেষ্টা। কারণ দুর্গাপুজো শুধু একটি উৎসব নয়, বাঙালির আবেগ, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক গভীর অনুভূতি।

এই খুদেদের কাছে মা দুর্গা কেবল মাটির তৈরি একটি প্রতিমা নন। তিনি তাদের বিশ্বাসের আশ্রয়, ভালোবাসার প্রতীক, নিজেদের সংস্কারের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার এক মাধ্যম। হয়তো তারা এখনও বড়দের মতো শাস্ত্রের সমস্ত বিধি জানে না, পুজোর সমস্ত রীতিনীতির ব্যাখ্যাও তাদের কাছে স্পষ্ট নয়। কিন্তু মায়ের প্রতি তাদের যে টান, যে শ্রদ্ধা, যে নিষ্পাপ আবেগ—তার কোনও মাপকাঠি হয় না।

আজকের দিনে যখন ছোটদের একটা বড় অংশ মোবাইল ফোন, ভিডিও গেম কিংবা ভার্চুয়াল জগতের মধ্যে সময় কাটায়, তখন বাজুয়ার এই খুদেরা নিজেদের হাতে মণ্ডপ তৈরি করছে, মাটির প্রতিমায় প্রাণের স্পর্শ দেওয়ার চেষ্টা করছে, পুজোর জোগাড় করছে। এর মধ্য দিয়ে তারা নিজেদের শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত থাকছে। পরবর্তী প্রজন্মের কাছে ধর্মীয় বিশ্বাস, পারিবারিক সংস্কার ও সামাজিক ঐতিহ্য কীভাবে ভালোবাসার মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকতে পারে, তারই যেন এক ছোট্ট উদাহরণ এই পুজো।

তবে তাদের এই আন্তরিক উদ্যোগকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে প্রশাসন ও সমাজের সহযোগিতা প্রয়োজন। সামান্য আর্থিক সাহায্য, প্রতিমা ও মণ্ডপ তৈরির উপকরণ কিংবা প্রয়োজনীয় পরামর্শ পেলে তাদের পুজো আরও সুন্দর হয়ে উঠতে পারে। অবশ্যই সেই সহযোগিতার সঙ্গে পড়াশোনার ভারসাম্য বজায় রাখাও জরুরি, যাতে উৎসবের আনন্দ তাদের শিক্ষার পথে বাধা না হয়ে ওঠে।

বাজুয়ার এই ছোটদের পুজো হয়তো জাঁকজমকে বড় বড় ক্লাবের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারবে না। হয়তো থাকবে না লক্ষ লক্ষ টাকার আলোকসজ্জা, বিশাল মণ্ডপ কিংবা তারকাখচিত উদ্বোধন। কিন্তু তাদের হাতে গড়া প্রতিমা, নিজেদের শ্রমে সাজানো মণ্ডপ আর মায়ের প্রতি আন্তরিক প্রার্থনার মধ্যে যে ভালোবাসা রয়েছে, তার মূল্য কোনও অর্থে মাপা যায় না।

কারণ দুর্গাপুজোর আসল সৌন্দর্য শুধু আলোর রোশনাই কিংবা আয়োজনের বিশালতায় নয়, মানুষের মনের বিশ্বাসে, একসঙ্গে পথ চলার আনন্দে এবং নিজের সংস্কৃতিকে ভালোবেসে আগলে রাখার মধ্যে।

বাজুয়ার এই ছোট্ট পুজো তাই কেবল কয়েকজন শিশুর উৎসব নয়। এটি তাদের স্বপ্নের গল্প, নিজেদের ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধার গল্প, বন্ধুত্ব ও দায়িত্ববোধের গল্প। আর সবকিছুর ঊর্ধ্বে, এটি একদল ছোট্ট শিশুর হৃদয়ে জগজ্জননী মা দুর্গার জন্য জমে থাকা অগাধ ভালোবাসার গল্প।

বড়দের জাঁকজমকের ভিড়ে বাজুয়ার এই ছোটদের পুজো যেন মনে করিয়ে দেয়—মায়ের আরাধনায় সবচেয়ে বড় সম্পদ অর্থ নয়, আন্তরিকতা; সবচেয়ে বড় শক্তি আয়োজন নয়, বিশ্বাস; আর সবচেয়ে সুন্দর মণ্ডপ সেইটিই, যা গড়ে ওঠে নিষ্পাপ ভালোবাসা, পরিশ্রম ও নিজেদের সংস্কারের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা দিয়ে।

Loading