সোমালিয়া ওয়েব নিউজ: দীপাবলি মানেই আলোর উৎসব। অমাবস্যার অন্ধকার রাতে ঘরে ঘরে প্রদীপ জ্বালিয়ে দেবী লক্ষ্মীর আরাধনায় মেতে ওঠেন মানুষ। কিন্তু গ্রামবাংলার কিছু অঞ্চলে দীপাবলির রাতে লক্ষ্মীকে বরণ করার পাশাপাশি পালিত হয় আরও এক ব্যতিক্রমী লোকাচার—অলক্ষ্মী বিদায়। কোথাও কুলো বাজিয়ে, কোথাও গাছের পাতা ও ডালপালা পুড়িয়ে, আবার কোথাও গোবর দিয়ে তৈরি অলক্ষ্মীর প্রতীকী মূর্তি বাঁশবাগানে রেখে এসে অশুভকে বিদায় জানানোর রীতি আজও বেঁচে রয়েছে। এই প্রথার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে প্রাচীন লোকবিশ্বাস। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, দেবী লক্ষ্মী সুখ, সমৃদ্ধি, সৌভাগ্য ও ঐশ্বর্যের প্রতীক। অন্যদিকে অলক্ষ্মীকে মনে করা হয় দারিদ্র্য, অশান্তি, কলহ ও দুর্ভাগ্যের প্রতীক। তাই দীপাবলির রাতে সংসার থেকে অলক্ষ্মীকে বিদায় জানিয়ে দেবী লক্ষ্মীকে ঘরে আহ্বান করার রীতি পালন করেন অনেক পরিবার। এই লোকাচারের প্রস্তুতিও বেশ অভিনব, গোঘাটের নবাসন গ্রামের অন্নপূর্ণা চক্রবর্তী ও শিউলি চক্রবর্তী আমাদের জানান চালতপ চাল বেটে সেটা দিয়ে তৈরি করা হয় লক্ষ্মী-নারায়ণ এবং কুবেরের প্রতীকী মূর্তি। কলা গাছের ছাল বা কলাবাস্কের উপর সেই প্রতিটি মূর্তি তৈরি করতে হয়। তাঁদের সামনে পুজোর উপকরণ সাজিয়ে বিশেষ নিয়মে আরাধনা করা হয়। বিশ্বাস, দেবী লক্ষ্মীর কৃপায় সংসারে ধনসম্পদ, শস্য, সুখ ও সমৃদ্ধি বজায় থাকবে। কুবেরকে ধনসম্পদের অধিপতি হিসেবে স্মরণ করে তাঁর কাছেও ঐশ্বর্য ও প্রাচুর্যের প্রার্থনা করা হয়। অন্যদিকে অলক্ষ্মী বিদায়ের আয়োজনেও রয়েছে স্বতন্ত্রতা। গোবর দিয়ে তৈরি করা হয় অলক্ষ্মীর প্রতীকী মূর্তি। পাশে কড়ি দিয়ে,চুল দিয়ে প্রদীপ দিয়ে সেই মূর্তিকে একটি বাঁশের কুলুচিতে বসিয়ে বাড়ি থেকে বের করা হয়। এরপর বাড়ির সদস্যরা কুলো বাজাতে বাজাতে অলক্ষ্মীকে বিদায় জানান। কুলো বাজানোর শব্দের মধ্য দিয়ে অশুভ শক্তিকে বাড়ি থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার প্রতীকী প্রয়াস চলে। শেষপর্যন্ত সেই গোবরের প্রতিমূর্তি বাঁশবাগানে নিয়ে গিয়ে রেখে আসা হয়। কোথাও কোথাও এই রীতির সঙ্গে আরও কিছু আঞ্চলিক নিয়মও যুক্ত রয়েছে।অলক্ষ্মী বিদায়ের পাশাপাশি রয়েছে আরও একটি আকর্ষণীয় প্রথা—‘নাড়া পোড়া’। নবাসন গ্রামের পলাশ মালিক অতি বন্ধুরা আমাদের জানায় বিভিন্ন গাছের পাতা, বিশেষ করে তালপাতা, কলাপাতা এবং নানা গাছের ডালপালা একত্রিত করে আগুন জ্বালানো হয়। ছোট বড় সকলে মিলে এই আয়োজন করে। এই আগুন জ্বালানোর রীতিকে ঘিরেও রয়েছে গ্রামীণ লোকবিশ্বাস। অনেকের ধারণা, আগুনের মাধ্যমে অশুভ ও অমঙ্গলের প্রভাব দূর করে নতুন করে শুভের সূচনা করা হয়। প্রদীপের আলো, পাতার আগুন এবং কুলো বাজানোর সম্মিলিত শব্দে গ্রামবাংলার দীপাবলির রাত পায় এক অন্যরকম রূপ। এই সমস্ত আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে শুধু ধর্মীয় বিশ্বাস নয়, মিশে রয়েছে গ্রামবাংলার নিজস্ব সংস্কৃতি ও জীবনদর্শন। সংসার থেকে দারিদ্র্য, অশান্তি, হিংসা ও দুর্ভাগ্যকে দূরে সরিয়ে সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধিকে বরণ করার এক প্রতীকী বার্তা বহন করে এই লোকাচার। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পরিবারের প্রবীণদের কাছ থেকে ছোটরা শিখে আসছে এই রীতিনীতি। কোথাও এখনও নিষ্ঠার সঙ্গে পালিত হয় প্রতিটি নিয়ম, আবার কোথাও আধুনিকতার প্রভাবে হারিয়ে যেতে বসেছে এই প্রাচীন প্রথা। আজকের দিনে যখন দীপাবলি মানেই আলোর সাজ, আতশবাজি ও উৎসবের আনন্দ, তখন গ্রামবাংলার এই লক্ষ্মী-অলক্ষ্মী আরাধনা আমাদের সামনে তুলে ধরে এক অন্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। কুলো বাজিয়ে অলক্ষ্মীকে বিদায়, গোবরের প্রতিমূর্তি বাঁশবাগানে রেখে আসা, আতপ চাল দিয়ে লক্ষ্মী-নারায়ণ ও কুবের তৈরি এবং নাড়া পোড়ানোর মতো রীতিগুলি যেন বাংলার লোকসংস্কৃতির এক অমূল্য সম্পদ। আসলে দীপাবলির এই প্রাচীন লোকাচারের অন্তর্নিহিত বার্তা একটাই—অমঙ্গলকে দূরে সরিয়ে শুভকে বরণ করা। অন্ধকারের বুক চিরে যেমন প্রদীপের আলো জ্বলে ওঠে, তেমনই মানুষের জীবন থেকেও দূর হোক অশান্তি ও নেতিবাচকতা, ঘরে ঘরে আসুক সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি। প্রতিবেদন তৈরির একটি পরামর্শ: এই বিষয়টির ভিডিও করলে কুলো বাজানোর দৃশ্য, আতপ চাল দিয়ে লক্ষ্মী-নারায়ণ ও কুবের তৈরির দৃশ্য, গোবরের অলক্ষ্মী বাঁশের কুলুচিতে বসানো এবং নাড়া পোড়ানোর দৃশ্য অবশ্যই রাখবেন। এতে প্রতিবেদনটি শুধু তথ্যভিত্তিক নয়, একটি সুন্দর লোকসংস্কৃতির তথ্যচিত্র হয়ে উঠবে।



![]()

More Stories
মাত্র ৬ টাকা চুরি করে শুরু হয়েছিল মা কালীর পুজো! ৫৫-৫৮ বছরের পুরনো বিজলকোনার ঘোষ পরিবারের ‘মেয়ে কালী’কে ঘিরে আজও রয়েছে নানা অলৌকিক কাহিনি!
হাজার বছরের ইতিহাস, ডাকাতদের পুজো থেকে আজও বহমান রহস্যময় প্রথা! গোঘাটের আগাই গ্রামের কালীপুজো ঘিরে নানা অলৌকিক কাহিনি!
বন্দুকের মুখে তোলাবাজির ছক বানচাল, মগরা পুলিশের জালে চার