সোমালিয়া ওয়েব নিউজ: গ্রামবাংলার মাটিতে আজও ছড়িয়ে রয়েছে কত অজানা লোকসংস্কৃতি, কত প্রাচীন ঐতিহ্য! আধুনিকতার দাপটে যখন একের পর এক লোকশিল্প হারিয়ে যেতে বসেছে, তখনও কিছু মানুষ বংশপরম্পরায় আগলে রেখেছেন তাঁদের পূর্বপুরুষদের সংস্কৃতি। তেমনই এক অনন্য ঐতিহ্যের সাক্ষী গোঘাটের ভাদুর অঞ্চলের সূর্যপুর গ্রামের একদল আদিবাসী মহিলা। কালীপুজো ও দীপাবলিকে কেন্দ্র করে দলবদ্ধভাবে গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে ‘সারপা’ গান ও নৃত্যের মাধ্যমে তাঁরা আজও বাঁচিয়ে রেখেছেন সাঁওতাল সমাজের নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়।
মোট ১৮ জন মহিলার এই দল যখন ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সেজে পথে বেরিয়েছেন, তাঁদের সাজসজ্জাতেও ফুটে ওঠে আদিবাসী সংস্কৃতির স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। লালপাড় শাড়ি, মাথায় ময়ূরের পালক, আম্রপল্লব, গলায় ও শরীরে নানা ঐতিহ্যবাহী অলংকার এবং বাহারি আদিবাসী সাজে সজ্জিত হয়ে তাঁরা এক অন্যরকম আবহ তৈরি করেন। তাঁদের সঙ্গে থাকে পরিবারের ছোট ছোট মেয়েরাও। ছোট থেকেই তাদের এই গানের সুর, ছন্দ এবং সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়, যাতে আগামী প্রজন্মের হাত ধরেও বেঁচে থাকে পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্য।
এই নাচ ও গানের অন্যতম আকর্ষণ তাঁদের হাতে থাকা বিশেষ দেশজ বাদ্যযন্ত্, একটি কাঁসার থালা ও বাটি। থালার উপর বাটির আঘাতে তৈরি হয় এক অদ্ভুত ঝংকার ও ছন্দময় শব্দ। দলের প্রত্যেক সদস্য একসঙ্গে সেই ছন্দে তাল মিলিয়ে গান ও নৃত্য পরিবেশন করেন। তাঁদের সম্মিলিত কণ্ঠস্বর, বাদ্যযন্ত্রের ঝংকার এবং পদক্ষেপের ছন্দে মুখরিত হয়ে ওঠে গ্রামের পথঘাট ও গৃহস্থের উঠোন। মূলত কালীপুজো ও দীপাবলির আগে-পরে এই মহিলারা বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে নিজেদের ঐতিহ্যবাহী গান পরিবেশন করেন। এটি শুধু উপার্জন বা বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং নিজেদের সামাজিক বন্ধন, আনন্দ এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় তুলে ধরার এক প্রাচীন লোকাচার। গ্রামবাংলার মানুষের কাছেও তাঁদের এই পরিবেশনা এক বিশেষ আকর্ষণ। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়, এই সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব শুধু বড়দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। দলের সঙ্গে ছোট ছোট মেয়েদের নিয়ে চলার মধ্য দিয়ে তাঁরা পরবর্তী প্রজন্মকে হাতে-কলমে শেখাচ্ছেন নিজেদের গান, নাচ ও বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার। কারণ তাঁদের বিশ্বাস, সংস্কৃতি কেবল বইয়ের পাতায় বেঁচে থাকে না, বেঁচে থাকে মানুষের অভ্যাসে, চর্চায় এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহমান ধারায়। ঝলমলে আলোর উৎসবের আবহে কাঁসার থালা-বাটির সেই অদ্ভুত ঝংকার যেন মনে করিয়ে দেয়, আধুনিকতার ছোঁয়া যতই লাগুক, মাটির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কখনও মুছে যায় না। সূর্যপুরের এই ১৮ জন আদিবাসী মহিলার দল তাই শুধু গান গেয়ে বেড়াচ্ছেন না, তাঁরা নীরবে আগলে রেখেছেন এক প্রজন্মের পর এক প্রজন্মের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। তাঁদের এই উদ্যোগই প্রমাণ করে, ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখতে প্রয়োজন শুধু ভালোবাসা, নিষ্ঠা আর পরবর্তী প্রজন্মের হাতে সেই সংস্কৃতিকে তুলে দেওয়ার আন্তরিক চেষ্টা।

![]()

More Stories
রাজ্যে চলচ্চিত্র বিষয়ে ডিগ্রি কোর্স চালুর ভাবনা, আধুনিকীকরণ করা হবে রূপকলা কেন্দ্রের
শিক্ষা দপ্তরের সব অফিস ও প্রতিষ্ঠানে নেতাজির ছবি রাখা বাধ্যতামূলক
কালীপুজোর পরেই পঞ্চায়েত দফতরে ৭২০০ নিয়োগ, গ্রামীণ উন্নয়নে একাধিক ঘোষণা রাজ্য সরকারের