সোমালিয়া ওয়েব নিউজ: গ্রামবাংলার আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে রয়েছে কত ইতিহাস, কত অজানা কাহিনি! কোথাও প্রাচীন মন্দির, কোথাও আবার বংশপরম্পরায় চলে আসা অদ্ভুত সব ধর্মীয় রীতি। তেমনই এক রহস্যময় ইতিহাসের সাক্ষী হুগলি জেলার আরামবাগ মহকুমার গোঘাটের বেঙ্গাই অঞ্চলের প্রত্যন্ত আগাই গ্রাম।
সবুজ গাছপালায় ঘেরা এই জনপদের তিন দিক জুড়ে রয়েছে প্রায় ৯০ বিঘা জলাশয়। আর সেই প্রাকৃতিক পরিবেশের মাঝেই রয়েছে গোস্বামী পরিবারের প্রাচীন কালীমন্দির। স্থানীয় জনশ্রুতি ও পরিবারের দাবি, প্রায় এক হাজার বছরের পুরনো এই কালীপুজো। যে পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বর্ধমানের রাজবংশ, সাধক সন্ন্যাসী, ডাকাতদের কাহিনি এবং বেশ কিছু রহস্যময় লোকবিশ্বাস।
পরিবারের সদস্য উৎপলকান্তি গোস্বামীর কাছ থেকে জানা যায়, বর্ধমানের রাজবংশের এক বংশধর সাধক সন্ন্যাসী অহরলাল গোস্বামী এই আগাই গ্রামে একটি গড় প্রতিষ্ঠা করে মা কালীর মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। কথিত রয়েছে, তৎকালীন এক রাজা তাঁর বংশধরকে দিয়ে চারটি জলাশয় খনন করিয়ে এই গড় ও দেবীর আরাধনার ব্যবস্থা করেছিলেন।
সেই সময় আগাই গ্রাম ছিল ঘন জঙ্গলে ঘেরা। জনবসতি ছিল খুবই কম। সন্ধ্যা নামলেই জনশূন্য হয়ে পড়ত গ্রামের পথঘাট। চারদিকে ছিল ডাকাতদের আতঙ্ক। সেই সময় গ্রামের ওই গড় টির পাড়ে বিশাল এক নিমগাছের তলায় প্রথমে মা কালীর পুজো হতো। এমনকী ডাকাত দলও ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে ওই নিমগাছের তলায় পুজো দিয়ে যেত বলে প্রচলিত রয়েছে। আশ্চর্যের বিষয়, আজও সেই প্রাচীন পুজোর স্থানটি রয়েছে এবং সেই রীতি মেনেই প্রথমে নিমগাছের তলায় দেবীর আরাধনা করা হয়। তারপর শুরু হয় মূল মন্দিরের পুজো।
কিন্তু এই পুজোর সবচেয়ে রহস্যময় পর্বটি ঘটে গভীর রাতে। নিমগাছের তলায় পুজোর সময় গোটা গ্রাম নিস্তব্ধ হয়ে যায়। কোনও বাড়িতে আলো জ্বলে না। চারদিকে নেমে আসে ঘন অন্ধকার। সেই রহস্যময় পরিবেশেই পুরোহিত দেবীকে আহ্বান করেন।
গোস্বামী পরিবারের প্রায় দশটি পরিবার রয়েছে। তাঁদের অনেকেই বর্তমানে গ্রামের বাইরে থাকেন। কিন্তু বছরের এই বিশেষ দিনে পরিবারের সদস্যরা একত্রিত হন পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্য রক্ষা করতে।
গৃহবধূ সুধা গোস্বামীর কাছ থেকে জানা যায়, প্রথমে মঙ্গলঘট স্থাপন, তারপর দেবীপ্রতিমার চক্ষুদান এবং প্রাচীন রীতি মেনে কালো ছাগ বলির মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলে পুজো। বলির পর ছাগের রক্ত মাটির সরায় সংগ্রহ করে গভীর রাতে নিয়ে যাওয়া হয় পাশের পুকুরপাড়ের ঈশান কোণে অবস্থিত সেই নিমগাছের তলায়। সেখানেই সম্পন্ন হয় পুজোর বিশেষ পর্ব। তবে এখানেই শেষ নয়! এই পুজোকে ঘিরে রয়েছে আরও কিছু রহস্যময় লোকবিশ্বাস। পরিবারের সদস্যদের দাবি, গভীর রাতে ওই গড় বা পুকুরে মাছ ধরতে গেলে অনেকেই নাকি শুনতে পান মায়ের নূপুরের শব্দ! আবার ঈশান কোণে পুজো দেওয়ার সময় বেনা গাছের গুচ্ছে আগুন ধরে যাওয়ার ঘটনাও তাঁদের কাছে এক বিশেষ অভিজ্ঞতা। প্রাচীন প্রথা মেনে আজও গাছের ফুল এবং পুকুরের মাছ চুরি করে এনে মায়ের পুজোয় নিবেদন করা হয়।
সময়ের সঙ্গে বদলেছে গ্রামের পরিবেশ, বদলেছে মানুষের জীবনযাত্রা। কিন্তু এত বছর পরেও গোস্বামী পরিবারের এই কালীপুজোর প্রাচীন রীতিনীতিতে আসেনি বিশেষ পরিবর্তন। আজও নিষ্ঠা ও বিশ্বাসের সঙ্গে বংশপরম্পরায় চলে আসছে মায়ের আরাধনা।
একদিকে ডাকাতদের পুজোর জনশ্রুতি, অন্যদিকে গভীর রাতের রহস্যময় আচার, নূপুরের শব্দ শোনার বিশ্বাস কিংবা বেনা গাছের গুচ্ছে আগুন ধরে যাওয়ার কাহিনি—সব মিলিয়ে আগাই গ্রামের এই কালীপুজো যেন ইতিহাস ও লোকবিশ্বাসের এক আশ্চর্য মেলবন্ধন।
প্রায় এক হাজার বছরের ঐতিহ্যকে বুকে আগলে আজও দাঁড়িয়ে রয়েছে আগাই গ্রামের গোস্বামী পরিবারের এই প্রাচীন কালীমন্দির। কিন্তু সত্যিই কি আজও সেই নিমগাছের তলায় অনুভূত হয় দেবীর উপস্থিতি? কী সেই গভীর রাতের রহস্য? জানতে হলে শুনুন পরিবারের সদস্যদের মুখ থেকেই তাঁদের অভিজ্ঞতা ও অজানা কাহিনি শুনতে দেখুন আমাদের ফেসবুক ও ইউটিউব চ্যানেল।
![]()

More Stories
মাত্র ৬ টাকা চুরি করে শুরু হয়েছিল মা কালীর পুজো! ৫৫-৫৮ বছরের পুরনো বিজলকোনার ঘোষ পরিবারের ‘মেয়ে কালী’কে ঘিরে আজও রয়েছে নানা অলৌকিক কাহিনি!
বন্দুকের মুখে তোলাবাজির ছক বানচাল, মগরা পুলিশের জালে চার
বালিবেলা সরস্বতী শিশু মন্দিরে বর্ণাঢ্য আয়োজনে উদযাপিত হলো ৩২তম বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান