November 6, 2026

মানসিক রোগীদের আরোগ্যভূমি আরামবাগের তিরোলের খ্যাপা কালী মন্দির

সোমালিয়া ওয়েব নিউজ: মানসিক রোগ থেকে। মুক্তির আশায় আজও ছুটে আসেন হাজার হাজার মানুষ! কারও হাতে পরানো হয় দেবীর চরণে স্পর্শ করানো লোহার বালা, আবার কারও বিশ্বাস, মায়ের কৃপায় ফিরে আসবে হারিয়ে যাওয়া স্বাভাবিক জীবন! আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের যুগেও এমনই এক অদ্ভুত বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের সাক্ষী হুগলির আরামবাগের তিরোল গ্রামের খ্যাপা কালী মন্দির।প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ বছরের প্রাচীন এই মন্দিরের দেবী আসলে সিদ্ধেশ্বরী কালী। কিন্তু মানসিক ভারসাম্যহীন ও মৃগী রোগীদের আরোগ্য লাভের দীর্ঘদিনের জনবিশ্বাস থেকেই লোকমুখে তাঁর নাম হয়েছে ‘খ্যাপা কালী’।চক্রবর্তী পরিবারের সেবাইত প্রশান্ত চক্রবর্তী জানান, এক সময় এই স্থানে এক সাধু বাস করতেন। তিনিই দেবীর পূজা করতেন। মৃত্যুর আগে চক্রবর্তী পরিবারের হাতে দেবীর সেবার দায়িত্ব তুলে দিয়ে যান। সেই থেকেই বংশপরম্পরায় চক্রবর্তী পরিবার এই পূজার দায়িত্ব পালন করে আসছে।কিন্তু কী এমন বিশেষত্ব রয়েছে এই মন্দিরে? কেনই বা পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলা, ভিন্‌রাজ্য এমনকি বাংলাদেশ থেকেও মানুষ ছুটে আসেন এখানে?এই মন্দিরের অন্যতম আকর্ষণ দেবীর চরণে স্পর্শ করানো লোহার বালা। মন্দিরের পিছনের পুকুরে স্নান করানোর পর মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের হাতে পরিয়ে দেওয়া হয় এই বালা। স্থানীয় এক কর্মকার পরিবারের তৈরি এই বালাকে ঘিরেই রয়েছে দীর্ঘদিনের বিশ্বাস। ভক্তদের দাবি, এই বালা ধারণ করার পর বহু মানুষ সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছেন।আরেক সেবাইত নবকুমার চক্রবর্তী জানান, তৎকালীন সময়ের সেই সাধু চক্রবর্তী পরিবারের প্রভাবশালী এবং গুণী ব্যক্তি সৃষ্টিধর চক্রবর্তীর হাতে এই দেবীর দায়িত্ব তুলে দেন। এই মন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে রামকৃষ্ণদেবের পরিবারের স্মৃতিও। সেবাইতদের দাবি, শ্রীশ্রী সারদা দেবীর বৌদি এবং তাঁর ভাইঝি রানুর মানসিক অসুস্থতার সময় তাঁদের হাতেও পরানো হয়েছিল খ্যাপা কালীর বালা। পরবর্তীকালে তাঁরা সুস্থ হয়ে ওঠেন বলে প্রচলিত রয়েছে। এমনকি কথাসাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখনীতেও উঠে এসেছে এই মন্দির ও খ্যাপা কালীর বালার প্রসঙ্গ। দেবীর সাজসজ্জাতেও রয়েছে এক বিশেষ ঐতিহ্য। দশঘড়ার জমিদার বংশের বিশ্বাস বাড়ির দুর্গাপুজোয় ব্যবহৃত মুকুটই কালীপুজোর দিন তিরোলের সিদ্ধেশ্বরী মায়ের মাথায় পরানো হয়। সেই মুকুট সারা বছর দেবীর মাথায় শোভা পায়। দীর্ঘদিনের এই প্রথা আজও বহন করে চলেছে দুই পরিবারের ধর্মীয় ঐতিহ্য।সেবাইত নির্মাল্য চক্রবর্তী জানান, এখানে তান্ত্রিক মতে দেবীর পূজা হয়। কার্তিক মাসের দীপান্বিতা অমাবস্যায় অনুষ্ঠিত হয় মূল কালীপুজো। আর সেই সময়ই তিরোলের চক্রবর্তী বাড়িতে বসে বিশাল উৎসবের আসর। এটি কোনও বারোয়ারি পুজো নয়, চক্রবর্তী পরিবারের পারিবারিক পুজো। তবে এই উৎসবে সামিল হন তিরোল গ্রামের সকল মানুষ। আমন্ত্রণ, নিমন্ত্রণ আর আনন্দে মেতে ওঠেন গ্রামবাসীরা।বছরের পর বছর ধরে এই মন্দিরকে ঘিরে গড়ে উঠেছে মানুষের বিশ্বাস, আবেগ আর নানা অলৌকিক কাহিনি। সেবাইতদের দাবি, প্রতি বছর লক্ষাধিক মানুষের সমাগম হয় এই মন্দিরে।বিজ্ঞান ও আধুনিক চিকিৎসার অগ্রগতির মধ্যেও তিরোলের খ্যাপা কালী মন্দিরকে ঘিরে মানুষের এই বিশ্বাস আজও অটুট। ইতিহাস, ঐতিহ্য, তন্ত্রসাধনা আর লোকবিশ্বাসের এক আশ্চর্য মেলবন্ধন—আরামবাগের তিরোলের এই খ্যাপা কালী মন্দির।

Loading