November 30, 2025

কোলাহলের মাঝেই চলছে অখণ্ড হরিনাম— হুগলির বদনগঞ্জের কয়াপাট বাজারের মন্দিরে ৪৬ বছরের ঐতিহ্য

সোমালিয়া ওয়েব নিউজ; হুগলি জেলার গোঘাট থানার অন্তর্গত বদনগঞ্জের কয়াপাট বাজার— চারিদিকে ব্যবসার হাঁকডাক, মানুষের অবিরাম চলাচল, যানবাহনের শব্দ। সেই কোলাহলের মাঝেই এক চিলতে শান্তির ঠিকানা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একচূড়া একটি ছোট্ট মন্দির। উপরে উড়ছে ধ্বজা, আর ভিতরে নিত্যদিন প্রবাহিত হচ্ছে অখণ্ড হরিনাম সংকীর্তন। কখনও বন্ধ হয় না এই নামযজ্ঞ। ভোর থেকে পরদিন ভোর— একই ছন্দে, একই বিশ্বাসে চলতে থাকে ভগবানের নামস্মরণ।

দেবদেবীর নানা রূপে সাজানো মন্দির

মন্দিরটিতে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে জগন্নাথ দেব, রাধা–কৃষ্ণ, পঞ্চতত্ত্ব, গৌর–নিতাই সহ একাধিক মূর্তি। দেয়ালজুড়ে আঁকা কৃষ্ণলীলা, শিব–পার্বতীর পৌরাণিক কাহিনি, এবং নানা দেবদেবীর বর্ণিল চিত্র। প্রধানত রাধা–কৃষ্ণ ও পঞ্চতত্ত্বের নিয়মিত পূজা হয় এখানে। প্রতিদিন তিনবেলা হয় ‘বাল্য ভোগ’।

মন্দির পরিচালনা কমিটির সদস্যদের বক্তব্য, দৈনিক নিত্য পূজার খরচ পড়ে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা। সবটাই আসে সাধারণ দাতাদের সাহায্য ও আশেপাশের গ্রামের মানুষের অনুদান থেকে।

৪৬ বছরের অখণ্ড নামযজ্ঞ— শুরু হয়েছিল মহাবন্যার সময়ে

মন্দিরের প্রবীণ সেবাইত বঙ্কিম পাল জানান, “বাংলার ১৩৮৫ সালের সেই প্রবল বন্যায় গোটা অঞ্চল জলের তলায় চলে গিয়েছিল। তখন এলাকার প্রবীণরা বিশ্বাস করতেন, কলিযুগে হরিনাম সংকীর্তনই পারে দুর্যোগ থেকে মুক্তি দিতে। সেই ভাবনা থেকেই ১৩৮৫ সালের ২৮শে মাঘ এই মন্দিরে শুরু হয় অখণ্ড হরিনাম সংকীর্তন।”

সেই শুরু, আর তা থেমে থাকেনি এক দিনও। টানা ৪৬ বছর ধরে অবিচ্ছিন্ন ভাবে চলছে নামযজ্ঞ। মন্দির কমিটির সদস্যরা পালা করে দিনরাত এই হরিনাম করেন।

২২টি গ্রামের মানুষ মিলে ধরে রেখেছেন ঐতিহ্য

কয়াপাট বাজারকে কেন্দ্র করে পার্শ্ববর্তী ২২টি গ্রামের মানুষ প্রতিদিন এই মন্দিরে আসেন দান–ধ্যান বা নামস্মরণে। মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণ, উৎসবের ব্যয়, দৈনিক ভোগ— সবই চলে তাঁদের সাহায্যে।

স্থানীয়দের কথায়, “এই মন্দির শুধু ধর্মীয় কেন্দ্র নয়, এটি আমাদের গ্রামের মঙ্গল ও ঐতিহ্যের প্রতীক।”

উৎসবের সময় ভিড় উপচে পড়ে

কার্তিক মাসে পাঁচ দিনব্যাপী রামায়ণ পাঠ— মন্দির চত্বরে হাজার হাজার ভক্ত সমাগম হয়।
মাঘী পূর্ণিমা সবচেয়ে বড় উৎসব— ওই দিন ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে বিশেষ পূজা ও মহাপ্রসাদ বিতরণ। প্রায় ১৫–২০ হাজার ভক্তকে প্রসাদ সেবা দেওয়া হয়।

উৎসবের দিন কয়াপাট বাজার পরিণত হয় মেলার মাঠে— দোকান, আলোকসজ্জা, ভক্তদের ভিড়, আর অবিরাম ভগবানের নাম।

কয়াপাটের গৌরব— কোলাহলের মাঝেও অবিচ্ছিন্ন ভক্তিভাব

দিনের বেলায় বাজারের শব্দ উচ্চস্বরে বাজলেও মন্দিরের ভিতরে তার ছিটেফোঁটাও লাগে না— এমনটাই মনে করেন সেবাইতরা। তাঁদের কথায়, হরিনামই তৈরি করে এক আলাদা পরিবেশ, যেখানে মন শান্ত হয়, ভক্তি জন্মায়।

৪৬ বছরের সেই ঐতিহ্য আজও অব্যাহত। আধুনিকতার ভিড়ে যেখানে ধর্মীয় আচার–অনুষ্ঠান অনেক সময়ই ক্ষণস্থায়ী হয়ে পড়ছে, সেখানে কয়াপাট বাজারের এই মন্দিরের অখণ্ড হরিনাম সংকীর্তন আজও মানুষের বিশ্বাসকে বাঁচিয়ে রাখছে দৃঢ়ভাবে।

Loading