November 30, 2025

শ্যামাসঙ্গীতের অলৌকিক কণ্ঠ : পান্নালাল ভট্টাচার্যের জীবনে আলো–অন্ধকারের গল্প

সোমালিয়া ওয়েব নিউজঃ জন্মের কিছুদিনের মধ্যেই পৃথিবী যেন পান্নালালের হাতের মুঠো থেকে ছিনিয়ে নিল সবচেয়ে প্রয়োজনীয় দুটি আশ্রয়—
বাবা-মা।
অথচ তখনো সে জানেই না পরিবার বলতে কী; জানেই না কোলে নেওয়া হাতের উষ্ণতার নামই আদর; জানে না মায়ের গলা চেপে ধরা মানেই নিরাপত্তা।

এক অদ্ভুত নীরবতা তাকে ঘিরে রইল ছোটবেলা থেকেই।
বাড়ির উঠোনে শিশুরা যখন মায়ের পিছুপিছু দৌড়োয়, যখন বাবার আঙুল ধরে হাঁটতে শেখে, তখন পান্নালালের চেনাজানা জগৎ ছিল অন্যরকম—
বড়দের চাপা ফিসফাস, ঘরের ভেতর নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাস, আর রাতের আঁধারে হঠাৎ হঠাৎ কারও কান্না টের পাওয়া।

কিন্তু এই শূন্যতার ভেতর থেকে তাকে তুলে নিল আর এক মানুষ—
দাদা ধনঞ্জয়।

ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য—যিনি পরে বাংলা সঙ্গীতের আকাশে নিজস্ব নক্ষত্র হয়ে ওঠেন—সেই মানুষটি তখন নিঃস্ব অথচ মননে বিশাল। তিনি জানতেন, ছোট ভাইয়ের জন্য তিনিই একমাত্র ছায়া।
এমনভাবে আগলে রাখতেন পান্নালালকে, যেন বুকের ভেতরের কোন অনুচ্চারিত শপথ বলছে—
“এ শিশুটিকে আমি হারাতে দেব না।”

দাদা-বৌদির সংসারে অভাব ছিল, তবু স্নেহ ছিল ভরপুর।
রাতের খাবার কম পড়লে নিজেদের প্লেট সরিয়ে দিয়ে পান্নালালের সামনে রাখতেন তারা।
ছোট ভাইকে নতুন জামা না দিতে পারলে ধনঞ্জয় নিজের পুরোনো ধুতি সযত্নে কেটে তার জন্য পাঞ্জাবি বানাতেন।

ছেলেটা বুঝত না তখন, কিন্তু অনুভব করত—
এ বাড়ির মানুষেরা তাকে ভালোবাসে।

বাবা-মায়ের হারানোর ক্ষত হয়তো গভীরে জমাট বেঁধে ছিল;
হয়তো সেই শূন্যতাই পান্নালালের গলার স্বরে এনে দিয়েছিল এক অদ্ভুত ভাঙন, এক অদ্ভুত আবেদন।
মনে হত—কেউ যেন আকাশের ওপার থেকে তার বুকের ভিতর দিয়ে গান গাইছে।

একদিন দাদা তাকে নিয়ে গেলেন পণ্ডিত জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের কাছে।
গুরু প্রথমদিনই বলেছিলেন—
“এই ছেলেটার কণ্ঠে ব্যথা আছে… আর ব্যথাই শিল্পীকে জন্ম দেয়।”

সেদিনই বোধহয় তার ভিতর জন্ম নিল সেই সুর, যাকে আমরা আজ শ্যামাসঙ্গীত বলে চিনি।
সে যখন গাইত—ঘর থমকে যেত।
মনে হত, যেন চোখ বুজলেই একটি ছোট্ট অনাথ ছেলে দূর অতীতের অন্ধকার থেকে হাত বাড়িয়ে বলছে—
“মা, কোথায় তুমি?”

যত বড় হল, তত বাড়ল আকাশের দিকে আকুলতা

বাবা-মা না থাকার কষ্ট কেউ শেখায় না।
কেউ বোঝাতে পারে না।
তবু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই কষ্টের কাঁটা বুকের কোথাও যেন শক্ত হয়ে চেপে বসেছিল।

তার গান যত উঁচুতে উঠেছে, মানুষ যত হাততালি দিয়েছে—
ততই মনে হয়েছে, যেন কোথাও কেউ নেই তাকে দেখে বলার মতো—
“বাহ, আমার ছেলে এত সুন্দর গাইছে।”

মায়ের কোলে না বড় হওয়া শিশুরা নাকি রাতের আকাশকে অন্য চোখে দেখে।
পান্নালালও তাই দেখত—
মা নেই, কিন্তু এক আকাশভরা কালী তাকে যেন ডেকে যায় প্রতিদিন।

তাই তো সে বলত—
“আমি তো ঈশ্বরের গান গাইলাম সারা জীবন।
আমার ঈশ্বর আমাকে দেখা দেবেন না কেন?”

ছেলেবেলা থেকেই ফুটবল ছিল তার প্রাণ। বারেন্দ্রপাড়ার মাঠে দৌড়তে দৌড়তে, ঘাসের গন্ধ মেখে, আকাশের নিচে ছুটে বেড়ানোই যেন ছিল মুক্তির একমাত্র পথ। সেই ছেলেটিই একদিন সজোরে বলের আঘাতে চোখে গুরুতর চোট পেল।
স্থানীয় হাসপাতালে কোনও লাভ হয়নি। তড়িঘড়ি তাকে নিয়ে যাওয়া হল কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে। দেড় মাসের লড়াই। ডাক্তারদের ভয়—দুটি চোখই হয়তো হারাতে হবে।
শেষপর্যন্ত দৃষ্টিশক্তি ফিরল বটে, কিন্তু এক চোখের মণি চিরতরে সরে গেল।

কিন্তু ফুটবলপ্রেম এতটুকু কমল না। চোখ বাঁচল কি বাঁচল না—তার নয়, মাঠে মোহনবাগান খেলছে কিনা—তাতেই যেন বাঁচা-মরা।

এই সময়েই ধীরে ধীরে জীবনে ঢুকে পড়ল সুর। দাদা ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য—যিনি তার সব, তার অভিভাবক, তার আশ্রয়—তাকে নিয়ে গেলেন পণ্ডিত জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের কাছে।
সেখানেই শুরু হল কঠোর তালিম।
গাইতে গাইতে আসর যেন অন্ধকার ভেদ করে আলো হয়ে উঠত।
যেন তার ভিতরের সমস্ত বেদনা সুর হয়ে বেরিয়ে আসত।

ধনঞ্জয়বাবু জানতেন—পঞ্চাশের পর ভক্তিগীতি এক গভীর ভাটার মুখে।
আর সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে পারে একমাত্র তার ভাই—পানু, পান্নালাল।
তাই তিনি নিজে ছবি-পিছু ছবি হিট গান গাইতে পারলেও, ভক্তিগীতির ক্ষেত্র পুরোটা ছেড়ে দিলেন পান্নাকে।
বলতেন,
“ওটা পানুর জায়গা। আমার নয়।”
এভাবেই সিনেমার গান আর গাওয়া হল না পান্নালালের।

একবার প্রোগ্রাম শেষে শিল্পীরা ফিরছেন ট্রেনে। বালি স্টেশনে নামার আগেই হঠাৎ পান্নালাল চুপ করে গেল। মুখ লাল, চোখ লাল, গলা শুকনো।
বন্ধুরা জিজ্ঞেস করতেই সে ধীরে বলল—
“মাকে কেন তুঁতে রঙের বেনারসিটা পরালো?”সবাই হাসল। কে না জানে, পান্না তো ট্রেনে!
কিন্তু পান্না ছটফট করে উঠল—
“না বিশ্বাস হলে এখনই নামো। চলো দক্ষিণেশ্বর। ট্যাক্সির ভাড়া আমি দেব।”

সবাই গেলেও, মনে মনে ভাবছিল—এ তো পাগলামি।
কিন্তু গিয়ে দেখা গেল—
সত্যিই ভবতারিণীকে সেদিন তুঁতে রঙের বেনারসিই পরানো হয়েছে।
সেদিন সবাই প্রথমবার নিঃশব্দে অনুভব করেছিল—পান্নালালের ভিতরে কিছু আছে, যা চোখে দেখা যায় না।

শেষদিকে প্রায়ই তাকে দেখা যেত শ্মশানে গিয়ে একা বসে থাকতে।
কেওড়াতলা, সিরিটি, কিংবা তার নিজের বারেন্দ্রপাড়ার শ্মশানঘাট—সব জায়গাতেই সে বসত নির্জন কোণে।
চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ত, সে বিড়বিড় করে বলত—
“আমি তো চিরকাল ঈশ্বরের গান গাইলাম। আমার ঈশ্বর আমাকে দেখা দেবেন না কেন?
কেন আমায় দেখা দিবি না মাগো?”

গঙ্গার ধারে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাঁদতেন তিনি।
ভক্তির উন্মাদনা আর ঈশ্বরদর্শনের অতৃপ্ত সাধ তাকে গ্রাস করছিল ধীরে ধীরে।
মনে হত—তার গান যেন আকাশ ছুঁয়ে ফেলছে, কিন্তু তার ঈশ্বর তাঁকে ছুঁতে আসছেন না।

ও পার আমায় হাতছানি দিয়ে ডাকে’—
এই গানটাই ছিল তাঁর জীবনের শেষ গান।
শব্দে শব্দে যেন তাঁর নিজের অন্তর্দহন, নিজের ডাকে পাওয়া সাড়া।

১৯৬৬ সাল। মাত্র ৩৬ বছর বয়সে একটি দেবকণ্ঠ, একটি ক্ষতবিক্ষত হৃদয়, একটি অপেক্ষামৃত মানুষ এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেল,পান্নালাল আত্মহত্যা করেন।
তার শেষ অভিমান, শেষ আকুতি যেন গানের সুরেই রয়ে গেল—

“আমার সাধ না মিটিল, আশা না পুরিলো,
সকলি ফুরায়ে যায় মা…”

পান্নালালের আত্মহত্যা কোনও আকস্মিক ঘটনার ফল নয়—বরং দীর্ঘদিনের মানসিক যাতনা, আত্মিক অস্থিরতা এবং ঈশ্বরদর্শনের অতৃপ্ত সাধের পরিণতি।

শেষ কিছু বছর ধরে তিনি প্রচণ্ড আবেগজনিত চাপে ভুগছিলেন।
গান গাইতেন, উপার্জন করতেন, সাফল্য পেতেন—তবুও ভিতরে ভিতরে যেন এক অজানা শূন্যতা তাকে গ্রাস করছিল।

.

তিনি বারবার বলতেন—
“আমি তো সারা জীবন মা-র গানই গাইলাম, মা আমাকে দেখা দেবেন না?”
ঈশ্বরদর্শনের অদম্য আকাঙ্ক্ষা ,এই আকুলতা ধীরে ধীরে রূপ নেয় এক ধরনের আধ্যাত্মিক পাগলামিতে।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা শ্মশানে বসে থাকা, গঙ্গার ধারে কান্না—সবই সেই মানসিক অবস্থার প্রতিফলন।

পান্নালাল খুব অল্প বয়সেই বিয়ে করেছিলেন। পান্নালালবাবুর মৃত্যুর সময়ে তাঁর তিন মেয়ে এবং স্ত্রী জীবিত ছিলেন। পরে স্ত্রী মঞ্জুশ্রী মারা যান। বড় মেয়ে কাজরী বিবাহিতা। মেজো ও ছোট মেয়ে কাকলি এবং শর্বরী দীর্ঘদিন মুম্বইয়ে ছিলেন। কয়েক বছর আগে কাকলির মৃত্যু হয়। এখন শর্বরীদেবী কলকাতায় থাকেন। পান্নালালবাবু সে ভাবে এখনো কোনো সরকারি সন্মান পাননি।

পরিবারের দায়িত্ব, আর্থিক চাপ, সম্পর্কের টানাপোড়েন—সব মিলিয়ে তিনি আরও ভেঙে পড়েছিলেন।

অনেক বিবরণে উল্লেখ আছে—
যেদিন তিনি আত্মহত্যা করেন, সেদিনও তিনি গান গেয়েছিলেন।
তারপর একসময় নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে দেন।
সেই রাতেই তাঁর জীবন শেষ হয়ে যায়।

ঘরে পড়ে ছিল তাঁর অসাধারণ কণ্ঠের শেষ অনুরণন—
“ও পার আমায় হাতছানি দিয়ে ডাকে…”

মনে হয়, তিনি যেন সত্যিই ওপারের কোনো আহ্বান শুনতে পেয়েছিলেন।

এ যেন তার নিজের জীবনেরই ভাষান্তর।
যেন ওপার থেকে মা ডাকছেন—যার জন্য তিনি শৈশব থেকে অপেক্ষা করে আছেন।

Loading