সোমালিয়া ওয়েব নিউজঃ পশ্চিমবঙ্গে বর্তমানে ভোটার তালিকার বিশেষ সংক্ষিপ্ত পুনর্বিবেচনা (SIR) চলছে। সেই কারণে স্কুলশিক্ষক, গ্রামীন কর্মী, অন্যান্য সরকারি কর্মীদের বিপুল সংখ্যককে Booth Level Officer (BLO)–র দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। ভোটার তালিকা হালনাগাদ গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার মূল অবকাঠামো হওয়ায় এই দায়িত্ব নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কাজের চাপ থাকা একদম স্বাভাবিক। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সোশ্যাল মিডিয়া ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এই চাপকে কেন্দ্র করে মৃত্যুর খবরকেই কেন্দ্রে তুলে ধরা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে—এই আলোচনাগুলো কি বাস্তব সমস্যাকে সমাধানের পথে এগোতে সাহায্য করছে, নাকি দায়িত্ববোধকে আরও দুর্বল করে দিচ্ছে?
সোশ্যাল মিডিয়ায় বারবার দেখা যাচ্ছে—
“চাপ সামলাতে না পেরে BLO–র মৃত্যু”,
“অতিরিক্ত দায়িত্বে ভেঙে পড়লেন শিক্ষক” ইত্যাদি।
প্রতিটি মৃত্যু নিঃসন্দেহে বেদনাদায়ক। কিন্তু কোনো মৃত্যুকে সঙ্গে সঙ্গে কাজের চাপে যুক্ত করে দেওয়ার এই অভ্যাস দুটি সমস্যার জন্ম দেয়—
- মেডিক্যাল বা ব্যক্তিগত কারণসহ অন্যান্য সম্ভাবনা আলোচনার বাইরে চলে যায়।
- BLO–দের অসহায়তার একটি মনস্তাত্ত্বিক চিত্র তৈরি হয়, যা আরও আতঙ্ক বাড়ায়।
চাপ থাকাটা অস্বীকার করা যায় না, কিন্তু “চাপ = মৃত্যু”—এমন সরলীকরণ সঠিক নয়, এবং পাবলিক সার্ভিসের বাস্তব মানসিকতা তৈরির পক্ষে ক্ষতিকর।
মনে আছে করোনা পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যকর্মীদের,আম্বুলেন্সে চালকদের, পুলিশের, রেশন ডিলারদের অভিজ্ঞতা— দায়িত্ববোধের কঠিনতম পরীক্ষা
করোনার প্রথম ঢেউ ও দ্বিতীয় ঢেউয়ে ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টরা যে পরিস্থিতি সামলেছেন, তা অসামান্য কঠোর। PPE পরে ৪০–৪৫ ডিগ্রি তাপমাত্রায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ, রোগীর স্যাম্পল সংগ্রহ, নিশ্ছিদ্র ভয়, সংক্রমণ, মৃত্যুভয়, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা—সবই ছিল প্রতিদিনের বাস্তবতা। রাস্তায় ভিড়ের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে পুলিশ নাগরিকদের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রেখেছে।
অ্যাম্বুলেন্স চালকরা জানতেন, প্রতিটি রোগী বহনের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে মৃত্যুর সম্ভাবনা—তবুও তাঁরা পিছিয়ে আসেননি, ছুটে গিয়েছেন এক হাসপাতাল থেকে আরেকটিতে।
রেশন ডিলাররাও প্রতিদিন মানুষের দরজায় দরজায় খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দিয়েছেন। সংক্রমণের ঝুঁকি ছিল সর্বোচ্চ, তবুও তাঁরা থেমে যাননি—কারণ তাঁদের শ্রমে সাধারণ মানুষের মুখে হাসি ফিরেছে, ক্ষুধা মিটেছে হাজারো পরিবারে।
করোনা–কালে ক্ষতি হয়েছে সবারই—জীবনহানি, আর্থিক ক্ষতি, মানসিক অবসাদ, অসহায়তা। কিন্তু এই মানুষগুলো কখনো দায়িত্ব থেকে সরে যাননি, কখনো আত্মহত্যার পথ বেছে নেননি।
বরং তারা সংকটের মাঝেই ধরে রেখেছেন সমাজের ভরসার স্তম্ভগুলো।
আজ সেই সময়ের দিকে ফিরে তাকালে বোঝা যায়—
মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শক্তিটাই সত্যিকারের মানসিক দৃঢ়তা।
এই দৃঢ়তাই সমাজকে বাঁচিয়েছে, আবার পথ দেখিয়েছে।
তবুও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই—
- তাঁরা দায়িত্ব ছাড়েননি
- চাপকে আত্মক্ষয়ের কারণ বানাননি
- দায়িত্বকে বোঝা নয়, বরং কর্তব্য হিসেবে নিয়েছিলেন
এর মানে এই নয়, চাপ ছিল না। বরং চাপ ছিল বহুগুণ বেশি। কিন্তু দায়িত্ববোধ তাদের পেশার কেন্দ্রে ছিল বলেই তাঁরা টিকে ছিলেন।
এই তুলনা কোনও পেশাকে ছোট বা বড় করে দেখার জন্য নয়—বরং বোঝানোর জন্য যে দায়িত্ব মানে দায়িত্বই। শিক্ষক, পুলিশ,রেশন ডিলার, স্বাস্থ্যকর্মী,—সকল ক্ষেত্রেই দায়িত্ব পালনে শৃঙ্খলা প্রয়োজন।
কিন্তু বাস্তবের সমস্যাও অস্বীকার করা যায় না—
এখানে অন্য দিকটাও আছে, যা গুরুত্ব পায় না—
- BLO–দের অনেকেই প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক। একই সময়ে স্কুলের পরীক্ষা, খাতা দেখা, দায়িত্ব পালন—তার সঙ্গে বাড়তি ফিল্ডওয়ার্ক সত্যিই চাপ বাড়ায়।
- প্রযুক্তিগত অনভিজ্ঞতা, অনলাইন আপলোডে সমস্যা, সার্ভার জট—এসব কারণে সময় নষ্ট হয়, মানসিক চাপ বাড়ে।
- অনেক BLO–র বয়স ৫০–এর কাছাকাছি বা বেশি; দীর্ঘক্ষণ বাড়ি-বাড়ি যাওয়া তাঁদের জন্য সহজ নয়।
অতএব, সমস্যার বাস্তব কারণ আছে এবং সেগুলো নিয়ে দাবি, সংস্কার, পুনর্বিন্যাস অত্যন্ত জরুরি।
সমস্যা সমাধানে দাবি ওঠা উচিত—কিন্তু দায় এড়ানোর সংস্কৃতি নয়
যে কোনও পেশায় চাপ থাকতেই পারে। সরকারি দায়িত্বে তা কখনও কখনও বাড়তি মাত্রায়ও আসতে পারে। কিন্তু—
- “চাপকে ঢাল বানিয়ে দায়িত্ব পালনে অনীহা”
- “দায়িত্বকে বোঝা হিসাবে উপস্থাপন”
এসব প্রবণতা সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ একবার দায়িত্বের জায়গা দুর্বল হয়ে গেলে, পুরো প্রশাসনিক কাঠামোই অস্থির হয়ে পড়ে।
তাই প্রয়োজন দুটি জিনিস—
(১) বাস্তব সমস্যার সমাধানের দাবি
- BLO সমস্যা নিয়ে আরো ভালো প্রশিক্ষণ
- প্রযুক্তিগত সহায়তা
- কাজের সময় ও দায়িত্বের পুনর্বিন্যাস
- প্রয়োজন হলে BLO–র সংখ্যা বৃদ্ধি
- শিক্ষকদের উপর নির্ভরতা কমিয়ে অন্যান্য কর্মী নিয়োগ
(২) দায়িত্ববোধের সংস্কৃতি শক্তিশালী করা
- দায়িত্ব মানে শুধু ডিউটি নয়—এটা সমাজকে টিকিয়ে রাখার শৃঙ্খলার অংশ
- সব পেশাই চাপের মধ্যেই চলে
- সম্মান সবার জন্য, কিন্তু দায়িত্বও সবার
- এক পেশার চাপকে অন্য পেশার তুলনায় বাড়িয়ে বা কমিয়ে দেখানো ঠিক নয়
সমাজ হিসেবে আমরা কোথায় দাঁড়াচ্ছি? কি তথ্য ভিত্তিক আলোচনা হচ্ছে? নাকি সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘সেন্সেশনাল’ কনটেন্টই আলোচনার কেন্দ্র? মৃত্যুকে দায়িত্ব এড়ানোর যুক্তিতে পরিণত করলে প্রশাসনিক সংস্কৃতির ক্ষতি হয় না কি? এই প্রশ্নগুলো জরুরি—কারণ গণতন্ত্র কাজ করে দায়িত্ববোধের ওপর, আবেগ বা আতঙ্কের ওপর নয়।
SIR–এ BLO–দের চাপ বাস্তব, দাবি-দাওয়া যুক্তিযুক্ত। কিন্তু সেই চাপকে কেন্দ্র করে বারবার “চাপের মৃত্যু” তত্ত্ব প্রচার করা দায়িত্ববোধকে ক্ষুণ্ণ করে। করোনাকালে স্বাস্থ্যকর্মীদের,আম্বুলেন্সে চালকদের, পুলিশের, রেশন ডিলারদের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে—জনগণের দায়িত্বের জায়গায় দাঁড়ালে চাপের মধ্যেও কাজ করা যায়।
সম্মান সবার, সমস্যা সবার, কিন্তু দায়িত্বও সবার।
এবং দায়িত্ব মানেই—তার যথাযথ পালন।

![]()

More Stories
পাঁচ লক্ষ কণ্ঠে গীতা পাঠের ডাক ব্রিগেডে, রাজ্যপালকে আমন্ত্রণ সনাতন সংস্কৃতি সংসদের
বিধানসভা নির্বাচনের আগে ইভিএম–ভিভিপ্যাটের এফএলসি শুরু রাজ্যে, চলবে ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত
হাতুড়ে ডাক্তারি বনাম পাশ করা ডাক্তার—অরাজকতার জঞ্জালে বাংলার স্বাস্থ্যব্যবস্থা